হিন্দু মহাসভা দলের বীরভুম জেলা সমিতির উদ্যোগে জেলার সদর শহর সিউড়িতে ১৯৪৭ সালের ২৪ ও ২৫ (৯ ও ১০ জৈষ্ঠ্য, শনি ও রবিবার) অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘বীরভূম জেলা হিন্দু সম্মেলন’। সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন উপস্থিত হয়েছিলেন হিন্দু মহাসভার অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং বাংলা প্রদেশের হিন্দু প্রধান অঞ্চলগুলি নিয়ে বাংলা প্রদেশ গঠনের অন্যতম প্রবক্তা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
সে সময়ে এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পরে এ দেশ ভারত বা হিন্দুস্তান ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে বিভক্ত হবে। তবে বাংলা প্রদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তখন সামনে ছিল তিনটি পথ খোলা ছিল— ১) অখণ্ড বাংলা প্রদেশ গঠন করা এবং তা ভারত বা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়া, ২) হিন্দু ও মুসলমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাংলা প্রদেশকে দ্বিখণ্ডিত করা এবং হিন্দু সংখ্যাগুরু প্রদেশকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করান এবং ৩) অখণ্ড বাংলা প্রদেশকে নিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গঠন করা। মুসলিম লিগ ছিল প্রথম মতের, ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা ছিল দ্বিতীয় মতের এবং শরৎচন্দ্র বসু, সোহরাওয়ার্দি, কিরণশঙ্কর রায়, আবুল হাসিম প্রমুখ ছিলেন তৃতীয় মতের প্রবক্তা ও সমর্থক।
এ পরিস্থিতিতে তিন পক্ষই বাংলার বিভিন্ন স্থানে সভা আয়োজন করে নিজেদের মতের স্বপক্ষে সমর্থন বৃদ্ধিতে প্রয়াসী হয়েছিল। এ রকম একটি সভা বীরভূম জেলার সদর শহর সিউড়িতে আয়োজন করেছিল হিন্দু মহাসভা দলের বীরভূম জেলা সমিতি। জেলা সমিতি থেকে জানানো হয়েছিল, ‘পৃথক হিন্দু বঙ্গ’ আদায়ের আন্দোলনকে আরও ‘তীব্র’ করার জন্য এই ‘বীরভূম জেলা হিন্দু সম্মেলন’ আয়োজন করা হয়েছে এবং তারা ‘বীরভূমের প্রত্যেক হিন্দুকে, প্রত্যেক কংগ্রেসী, মহাসভাপন্থী এবং সাধারণ নাগরিককে দলে দলে এই সম্মেলনে যোগ’ দেওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছিল।
সম্মেলনের সভাপতি ও উদ্বোধক ছিলেন যথাক্রমে নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও কাশিমবাজারের মহারাজা শ্রীশচন্দ্র নন্দী। সম্মেলনে কলকাতা থেকে উপস্থিত হয়েছিলেন হিন্দু মহাসভার সাধারণ সম্পাদক দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, সম্পাদক মাখনলাল বিশ্বাস, পণ্ডিত নরেন্দ্রনাথ দাস, হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ ও চারণকবি মনুজচন্দ্র সর্বাধিকারী প্রমুখ মহাসভার নেতারা এবং জেলার দুই পণ্ডিত ব্যক্তি— হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিদ্যাসাগর কলেজের উত্তর দিকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা মাঠে ‘বীরভূম জেলা হিন্দু সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এখানে ২০ হাজার ব্যক্তির জন্য মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছিল। এই মণ্ডপে মহিলাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
শ্যামাপ্রসাদ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন উপস্থিত হন। শরৎচন্দ্র বসুদের স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলা রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনাকে ‘ঘৃণিত পরিকল্পনা’ হিসেবে চিহ্নিত করে শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ভাষণ শুরু করেন। তিনি সার্বভৌম বাংলা, সমাজতান্ত্রিক বাংলা অথবা স্বাধীন বঙ্গ রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনাকে ‘ভণ্ডামি’ বলে চিহ্নিত করেন।
সে সভায় শ্যামাপ্রসাদ, স্পষ্ট ভাবে জানান যে, তাঁদের প্রথম দাবি বঙ্গ বিভাগ। তাঁর দ্বিতীয় দাবি ছিল তৎকালীন মুসলিম লিগ পরিচালিত ‘সাম্প্রদায়িক’ সরকারকে ভেঙে দিয়ে একটি আঞ্চলিক মন্ত্রিসভা গঠন। শান্তিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য এই ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মত ব্যক্ত করেছিলেন। এই সম্মেলনের পরে বীরভূম জেলায় হিন্দু মহাসভা দলের প্রভাব ও বঙ্গ বিভাগের সমর্থকদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে ইতিহাস জানায়। এ সভাটি তাই ইতিহাসের পাতায় গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজে ইতিহাসের শিক্ষক
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)