Advertisement
১৯ জুলাই ২০২৪

ইদের চাঁদ আর ঢাকের শব্দেই আমাদের শরৎকাল

খেয়াঘাটের মাঝি বারুয়াকাকুর জন্য মা দিয়ে দিতেন সেমাই-জরদা। আনোয়ার ভাই পায়ে ঘুঙুর বেঁধে দুর্গাঠাকুরের নৌকোয় উঠে নাচতেন। সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে পাত্তা না দিয়ে বাঙালির উৎসব এই ভাবেই অম্লান। ইদের উৎসবের পরেই পেতাম দুর্গাপূজার উৎসব। এই সময়ে আমাদের বিশেষ আনন্দ ছিল শিউলিফুল কুড়োনো। নদীর ধারে ছিল গোঁসাইদের আখড়া। সেই আখড়ার বিশাল আঙিনার দেওয়াল ঘেঁষে ছিল বড় বড় দু’-তিনটে বকুলগাছ।

ছবি: সুব্রত চৌধুরী

ছবি: সুব্রত চৌধুরী

সেলিনা হোসেন
শেষ আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ০১:৩১
Share: Save:

ছোটবেলার ইদ এবং পূজার আনন্দ আমার স্মৃতির সঞ্চয়। জীবনের সত্তর বছরের অধিক সময়ে কত স্মৃতি হারিয়ে গেছে, কিন্তু হারায়নি উৎসবের আনন্দের স্মৃতি। এখনও তীব্র আলোয় জেগে ওঠে সেই স্মৃতির অনির্বাণ শিখা।

মনে আছে, এক বার ইদ এবং দুর্গাপূজা খুব কাছাকাছি সময়ে হয়েছিল। রোজার পরে ইদের চাঁদ ওঠা দেখার জন্য আমরা ছোটরা মাঠের ধারে বসে থাকতাম। সূর্য ডুবে যেত। অন্ধকার নেমে আসত। আমরা বাটি ভরে মুড়ি-ছোলা-পেঁয়াজু-জিলাপি নিয়ে এসেছি। আজান হলে ইফতারি খাব আর চাঁদের অপেক্ষায় থাকব। আকাশে চাঁদ দেখা গেলে আনন্দ-উল্লাসে ঘরে ফিরতাম। বলতাম, চাঁদ, তুমি কি আমাদের সঙ্গে ইদগাহে যাবে? সেমাই খাবে? হইহই-রইরই তোমার সেমাই আমরা খাই...। চাঁদমামা হাজার সালাম।

শৈশবের সেই সব দিনে বাবার সঙ্গে ইদগাহে যেতাম। বড়রা নামাজে দাঁড়ালে আমরা ছুটোছুটি করে প্রজাপতি-ফড়িং ধরতাম। ঘাসফুল ছিঁড়তাম। বুনোফুল খুঁজে গন্ধ শুঁকতাম। বাসায় ফেরার পথে কলাপাতা ছিঁড়ে টুকরো করে নিয়ে এসে মা’কে বলতাম, মা সেমাই-জরদা হয়েছে? মা বলতেন, কলাপাতা ধুয়ে আনো। মা জানতেন, আমরা কার জন্যে সেমাই, জরদা চাচ্ছি।

কলপাতা ধুয়ে আনলে মা সেমাই-জরদা দিতেন। আমরা দৌড়তে দৌড়তে নিয়ে যেতাম বারুয়াকাকুর কাছে। তিনি করতোয়া নদীর খেয়াঘাটের মাঝি ছিলেন। নিম্নবর্গের হিন্দু। গরিব মানুষ। ইদের দিনে আমাদের কাছ থেকে সেমাই-জরদার অপেক্ষায় থাকতেন। আমরা দৌড়তে দৌড়তে তাঁর কাছে যেতাম। বলতাম, কাকু, ইদের সেমাই। তিনি দু’হাত বাড়িয়ে বলতেন, দে, দে সোনামণিরা। তাঁর উজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে আমরা অভিভূত হয়ে যেতাম। এই বয়স পর্যন্ত তাঁর উজ্জ্বল মুখ আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমি সে স্মৃতি স্মরণ করে উৎসবের আনন্দ পাই। বুঝি উৎসব এমনই হওয়া উচিত। মানুষের আনন্দে যেন জোয়ার থাকে।

ইদের উৎসবের পরেই পেতাম দুর্গাপূজার উৎসব। এই সময়ে আমাদের বিশেষ আনন্দ ছিল শিউলিফুল কুড়োনো। নদীর ধারে ছিল গোঁসাইদের আখড়া। সেই আখড়ার বিশাল আঙিনার দেওয়াল ঘেঁষে ছিল বড় বড় দু’-তিনটে বকুলগাছ। সেই সব গাছের পাশে ছিল শিউলিফুলের গাছ। স্কুল ছুটির দিন সবাই মিলে ফুল কুড়োতে ছুটতাম। কোঁচড় ভরে ফুল নিয়ে ছুটতে ছুটতে সবাই মিলে চেঁচিয়ে বলতাম, আশ্বিন মাস, আশ্বিন মাস, সামনে পূজা! চাঁদ এবং শিউলিফুলের উৎসব ছিল আমাদের শৈশব-কৈশোর।

এই বয়সে মনে হয়, প্রকৃতির সান্নিধ্যে উৎসবের আনন্দ আমাদের জীবনের ভিন্ন মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আমরা ধর্ম বুঝেছিলাম। মানুষ বুঝেছিলাম। আমরা চাঁদ দেখার অপেক্ষায় থাকার পাশাপাশি ঢাকের শব্দ শোনার অপেক্ষায় থাকতাম। সে যে কী প্রবল আগ্রহ ছিল! ধর্মীয় উৎসবই ছিল আমাদের কাছে সর্বজনীন উৎসব। আমরা এই হৃদয়-চেতনার ভিতর দিয়ে শৈশব-কৈশোর পার করেছি। বুঝেছি মানব সত্য। এ দুই উৎসব ছাড়া এমন জাঁকজমকের আর কোনও উৎসব ছিল না।

বাবার চাকরিসূত্রে শৈশব-কৈশোরে বগুড়ার করতোয়া নদীর পাড়ে যে গ্রামে থাকতাম সেখানে কোনও ধরনের নাচগানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পাইনি। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া বাউল-শিল্পীদের গান শুনেছি। কখনও পল্লিগীতি শুনেছি। উৎসব বলতে আমাদের সামনে ছিল ইদ আর পূজা। এই দুই উৎসবে থাকত অনেক খাবার, থাকত নতুন পোশাক পাওয়ার মজা। কোনও ছেলেমেয়েদের নতুন কাপড় না পাওয়ার চোখের জলও দেখেছি।

তার পরও কান্নাহাসিতে উৎসবের ঘাটতি ছিল না। ঢাক-ঢোলের শব্দ শুনতে পেলেই আমরা ছুটতে থাকতাম যেখানে প্রতিমা বানানো হচ্ছে সেখানে। গিয়ে দেখতাম প্রতিমা বানানোর কত আয়োজন। আস্তে আস্তে গড়ে উঠত দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশের অবয়ব। অসুর তৈরি হওয়ার সময় আমরা সেটাও মজা করে দেখতাম। মনে হত, দানবকে এ ভাবে মেরে ফেলা দরকার। তখন আমাদের ধর্মের আধ্যাত্মিক বিষয় বোঝার বয়স ছিল না। ধর্মের নামে হানাহানিও আমরা বুঝতে শিখিনি। আমাদের সামনে ছিল উৎসব। কখনও মনে হয়নি দুর্গাপূজা ধর্মীয় উৎসব। শুধু মনে হয়েছে, এমন উৎসব আছে বলেই আমরা এক জায়গায় জড়ো হই। আনন্দ করি।

প্রতিমার গায়ে যখন রং লাগানো হত, যখন নানা গয়নায় ভরিয়ে তোলা হত, তখন যে আশ্চর্য সুন্দর এক অপরূপ চেহারা ভেসে উঠত, সেটা দেখার জন্য আমরা একটানা দাঁড়িয়ে থাকতাম। মনে হত এমন ভাবে দেবী মা’কে সাজানো দেখাটা আর এক উৎসব। কী অপূর্ব করে টানা হচ্ছে বড় বড় চোখ! মনে হত, অমন সুন্দর চোখ দিয়ে দেবী আমাদের দেখছেন। শিউলি ফোটার দিনে দেবীর চোখ থেকে শিউলিফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। আমরা হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম। দেখতাম হাতে পরানো হচ্ছে শাঁখা, মাথায় মুকুট দেওয়া হচ্ছে। সিঁথিতে সিঁদুর। সঙ্গে একটি টিকলি। প্রতিমা-শিল্পীরা যে এমন সুন্দর করে সব বানাতে পারেন তা আমাদের মুগ্ধ করে রাখত। আমি কিছুতেই ভাবতে পারতাম না যে এই সুন্দর দেবীকে নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। কষ্টে বুক ভেঙে যেত। এ ভাবে ভালবাসার রঙে রাঙিয়ে মা’কে কেন ভাসানো হবে? দু’হাতে চোখের পানি মুছতাম।

তার পর এক দিন শেষ হত প্রতিমা বানানোর আয়োজন। মণ্ডপে শুরু হত পূজা। আরতির ঘণ্টা বাজানো শুনলে আবার যেতাম পূজামণ্ডপে। দেখতাম, কলকি আকারের মাটির পাত্রে ধূপ ও নারকেলের ছোবড়া দিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে সকাল-বিকাল নারী-পুরুষ আরতি করতেন। হিন্দু-মুসলিম সম্মিলিত ভাবে দেবীর সঙ্গে নৌকায় উঠতেন। মনে আছে আনোয়ারভাইয়ের কথা। তিনি পায়ে ঘুঙুর বেঁধে অন্যদের সঙ্গে নৌকোয় নাচতেন। বলতেন, এটা শুধু ধর্মীয় উৎসব না। আমাদের সবার উৎসব। বাঙালির উৎসব।

শৈশবে শোনা এমন কথার সবটা গুছিয়ে লিখতে পারিনি। শুধু শিখেছিলাম ধর্মের ঊর্ধ্বে মানুষের মিলনের বার্তা। প্রবীণ বয়সের সময় থেকে শেষ করতে চাই এই লেখা। গত কয়েক বছর ধরে ঢাকার বনানীতে আয়োজিত হয় সর্বজনীন দুর্গাপূজা। তাঁরা প্রকাশ করেন ‘বোধন’ নামে একটি সংকলন। এই সংকলনে আমাদের অভিনয়শিল্পী ফেরদৌস চমৎকার স্মৃতিচারণ করেছেন। উদ্ধৃতি: ‘আমার এলাকা ছিল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। নারায়ণগঞ্জে বেড়ে ওঠার সময় থেকেই পূজায় প্রচুর আনন্দ করতাম। ইদ আর পূজা আমাদের জন্য তখন সমার্থক ছিল। প্রতিমা তৈরি, বিশাল আয়োজন, ঢাকের বাদ্য, সব কিছু কী যে ভাল লাগত। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল প্রসাদ দেওয়ার সময়টা। তবে কলকাতায় গিয়ে বুঝেছি, পূজা কি ও কত প্রকার।... তারকা হওয়ার সুবাদে ওখানে প্রায় প্রতিবছরই একগাদা পূজামণ্ডপ আমাকে উদ্বোধন করতে হয়। প্রথম বারের কথা মনে পড়ে খুব। সেবার আমি আর ঋতুপর্ণা গিয়েছিলাম শিলিগুড়ির সবচেয়ে বড় পূজামণ্ডপ উদ্বোধন করতে। আমি সেখানে গিয়ে খুব দ্বিধায় পড়ে গেলাম। অন্যধর্মের হয়ে আমি কিনা মণ্ডপ উদ্বোধন করব! এটা কি ঠিক হবে? স্থানীয় মানুষরা যদি প্রতিক্রিয়া দেখায়? খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। ঋতুপর্ণা সহ সবার সাহসে যখন ফিতা কাটলাম সবার যে কি হাততালি আর চিৎকার!! তখনই বুঝতে পারলাম মানুষগুলো কতটা বড় মনের, কতটা অসাম্প্রদায়িক। তাদের কাছে আমি তারকা, আমাকে তারা পছন্দ করে। ধর্ম এখানে কোন ব্যাপার নয়। শুধু আমি নই, স্থানীয় মুসলমানরাও দেখলাম চলে এসেছে পূজামণ্ডপে।... আমার এক প্রযোজকের অনুরোধে এবারের পূজায় বারাসাতে যেতে হতে পারে। কমপক্ষে ১০টা মণ্ডপ তো উদ্বোধন করতেই হবে। আর আমার খুব ভাগ্য ভাল যে— আমরা যারা এ ক্ষেত্রে কাজ করি, তারা ধর্মবিভেদ নিয়ে খুব একটা চিন্তাভাবনা করি না। আমাদের মধ্যে কে হিন্দু, কে মুসলমান সেটা বড় কথা নয়। উৎসবটাই আসল।’

গত কয়েক বছর ধরে আমার স্বামী আনোয়ার ইদ-উল-আজহা’র সময়ে তাঁর গ্রামের বাড়িতে কোরবানি দেওয়ার ব্যবস্থা করে। বলে, ঢাকা শহরে কোরবানি না দিয়ে গ্রামে দিলে গরিব মানুষেরা এক দিনের জন্য মাংস খেতে পারবে। ঢাকায় তো কমবেশি সবাই কোরবানি দেয়। গরিব মানুষেরা মাংস পায়। কেউ বাদ যায় না। আমি তাঁকে সমর্থন করি। ইদের আগে টাকা পাঠানো হয় খাসি কিংবা ভেড়া কেনার জন্য। যে মাংস হিন্দু-মুসলিম উভয়ে খাবেন। এ বছরে একটি খ্রিস্টান পরিবারের এক জন এসেছিলেন মাংসের জন্য।

আমাদের খুব কাছের মানুষ নেপালচন্দ্র কুণ্ডু, মিলন মিত্র। এ বছর মিলন আমাদের জানাল, ও মাংস বাড়িতে নিয়ে গেলে আশেপাশের আত্মীয়স্বজন ওর বাড়িতে চলে আসে। সব মাংস রান্না হয়। প্রত্যেকে ভাত-মাংস খায়। মানুষের সংখ্যা বেশি হলে যদি এক টুকরোও পায় তাও সবাই খুশি থাকে। ওরা বলে, ‘‘এটা তো আমাদের কাছে কোরবানির পবিত্র মাংস।’’ ইদের উৎসব এ ভাবে মানুষের মিলন-উৎসব হয়। অন্য ধর্মকে শ্রদ্ধা করার জায়গা তৈরি হয়।

আমাদের বাংলাদেশে ধর্মের সত্য নিয়ে মানুষের মর্যাদা অমলিন থাকবে। এই বিশ্বাস নিয়ে জীবনের শেষ দিন আমার সমাপ্ত হবে।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE