×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৭ জুন ২০২১ ই-পেপার

পাঁচ মিনিটেই ফিরছি বলে সটান পিজি-তে

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা ২১ নভেম্বর ২০১৪ ০৩:২৮

বেসরকারি হাসপাতালের ঠান্ডা ঘরে হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে তিনি ঘনিষ্ঠদের বললেন, “আমি পাঁচ মিনিটের জন্য আসছি! তোরা বোস।”

ঘরে যাঁরা ছিলেন, হাঁ হাঁ করে উঠলেন। “আপনি কেন উঠবেন? আমরাই বেরোচ্ছি।” ইশারায় সকলকে থামিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি— মদন মিত্র। ঘণ্টাখানেক বাদে তাঁর ওষুধপত্র থেকে প্রসাধনী যাবতীয় ঝোলাঝুলি সরিয়ে নিয়ে চলে যাওয়া হল এসএসকেএম হাসপাতালে।

কারণ, বৃহস্পতিবার দুপুর তিনটে নাগাদ সেই ‘পাঁচ মিনিটের জন্য’ বেরিয়ে মিন্টো পার্কের ওই বেসরকারি হাসপাতালে আর ফেরেননি পরিবহণমন্ত্রী। ভর্তি হয়ে গিয়েছেন এসএসকেএমে। সেই এসএসকেএম, যার কর্মী ইউনিয়নের সঙ্গে মদন কয়েক দশক ধরে জড়িত। যে হাসপাতালের নাড়িনক্ষত্র তাঁর চেনা।

Advertisement

কাকপক্ষী টের পেয়েছিল কি না জানা নেই, কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালে মদনের জন্য সদ্যগঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকেরা আকাশ থেকে পড়ে জানালেন, এই অন্তর্ধান রহস্যের কিচ্ছুটি তাঁরা জানতেন না!

অথচ ২৪ ঘণ্টা আগে তো ওই হাসপাতালের রোগশয্যায় শুয়েই জেরার জন্য সাদরে সিবিআই-কে নেমন্তন্ন করেছিলেন মদন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি থেকে ফোন করার পর রাতারাতি অনেকটা চাঙ্গা দেখিয়েছিল তাঁকে। তা হলে হঠাৎ সরকারি হাসপাতালে কেন? এমনকী এ-ও শোনা যাচ্ছে, বেসরকারি হাসপাতাল ডিসচার্জ সার্টিফিকেট দেওয়ার আগেই মদন নাকি এসএসকেএমে ঢুকে পড়েছেন।

হলটা কী মদনের?

মন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছেন, বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসায় দেরি হচ্ছিল। কোনও চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শের দরকার পড়লে সহজে তাঁর দেখা মিলছিল না। অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। কিন্তু এসএসকেএমে সব রকমের চিকিৎসককে সহজেই পাওয়া যায়। তাঁর বক্তব্য, “চিকিৎসার জন্য ডাক্তারদের বোর্ড তৈরি করা প্রয়োজন। সেটা পিজিতেই ভাল ভাবে হবে। তাই চলে এলাম।” তা হলে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কেন? মদনের উত্তর, “ওটাই ভুল হয়েছিল।” যদিও ঘটনা হল, মদন ওই বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়ার মোটামুটি আধ ঘণ্টা আগে তাঁর জন্য মেডিক্যাল বোর্ড গড়া হয়েছিল চিকিৎসক সুকুমার মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে। যিনি বললেন, “সিবিআই-টিবিআইয়ের ব্যাপার! হয়তো বেসরকারি হাসপাতাল ঝুঁকি নিতে চায়নি। কিংবা উপরের স্তর থেকে কোনও নির্দেশ এসেছে কি না জানি না। তাই মদনবাবু এসএসকেএমে গিয়েছেন।”



এসএসকেএম হাসপাতালের বাইরে মদন মিত্রের স্ত্রী এবং পুত্রবধূ। ছবি: সুমন বল্লভ।

এবং তৃণমূল সূত্রেও ইঙ্গিত, অসুস্থতার কথা বলে দিনের পর দিন সিবিআইয়ের জেরা ঠেকিয়ে রাখতে বেসরকারির তুলনায় সরকারি হাসপাতালকেই ঢের নিরাপদ বলে মনে করছেন পরিবহণমন্ত্রী। এবং তাই এই অকস্মাৎ ঠাঁইবদল। দলের শীর্ষ স্তরে ও আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করেই তিনি নাকি যা করার তা-ই করেছেন। এমনকী দলের শীর্ষ স্তর থেকে জানা যাচ্ছে, খোদ মুখ্যমন্ত্রীই এই পরিস্থিতিতে মদনকে সরকারি হাসপাতালে যেতে বলেছেন। অথচ এই বেসরকারি হাসপাতালটিতেই দরকারে হামেশাই ভর্তি হয়ে থাকেন মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীরা। মদনও একাধিক বার ভর্তি হয়েছেন। মমতা, মদন ছাড়াও অমিত মিত্র, সুব্রত মুখোপাধ্যায় বা তাপস পালও সেখানেই বারবার চিকিৎসাধীন থেকেছেন। এমন স্বাচ্ছন্দ্যের হাসপাতাল হঠাৎ কী দোষ করল, চিকিৎসক মহলের কাছেও তা স্পষ্ট নয়।

বেসরকারি হাসপাতালটির সিইও প্রদীপ টন্ডন যদিও বলছেন, “এখান থেকে বেরোনোর সময়ে মন্ত্রী বলেন, চললাম। এসএসকেএমে ভর্তি হব। ওঁর সিদ্ধান্ত। আমাদের কিছু বলার নেই।” টন্ডনের এ-ও দাবি, মেডিক্যাল বোর্ড গড়ার কথা মদনকে জানানো হয়েছিল। তা হলে মদন কেন বললেন, মেডিক্যাল বোর্ড গড়া দরকার বলেই তিনি এসএসকেএমে গিয়েছেন? ধোঁয়াশা কাটেনি।

বেসরকারি হাসপাতাল সূত্রের খবর, বিকেল তিনটে নাগাদ মদন যখন সবে স্নান সেরে চুল আঁচড়েছেন, তখনই কেবিনে ঢোকেন তাঁর ছোট ছেলে, আইনজীবী এবং এসএসকেএম হাসপাতালে সক্রিয় মদনের এক অনুচর। আইনজীবী মদনের কানের কাছে মুখ রেখে কিছু বলেন। তখনই মদন টানটান হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, তিনি ‘পাঁচ মিনিটের জন্য’ আসছেন। বাড়ি থেকে পাঠানো খাবারের ঢাকনিটাও তখন খোলা হয়নি। এমনকী মন্ত্রীর নিরাপত্তারক্ষীদের কেউ কেউ পর্যন্ত নাকি টের পাননি, মদন এসএসকেএমে যাচ্ছেন।

এমন ধোঁয়াশা আরও রয়েছে।

বেসরকারি হাসপাতালে মদন ভর্তি হয়েছিলেন পিঠের টিউমারের চিকিৎসার জন্য। কিন্তু এসএসকেএমে তিনি ভর্তি হয়েছেন বক্ষ চিকিৎসক ঋতব্রত মিত্রের অধীনে! এই গরমিলেরও সদুত্তর নেই। এসএসকেএম সূত্রের খবর, উডবার্ন ওয়াডের্র ২০ নম্বর বেডে রয়েছেন মদন। এসএসকেএমের মেডিক্যাল বোর্ডে ঋতব্রতবাবু ছাড়াও রয়েছেন শল্যচিকিৎসা বিভাগের বিতান চট্টোপাধ্যায়, এন্ডোক্রিনোলজির শুভঙ্কর চৌধুরী, কার্ডিওলজির শিবানন্দ দত্ত, মেডিসিন-এর নির্মলেন্দু সরকার, চেস্ট-এর সোমনাথ কুণ্ডু এবং সাইকিয়াট্রির প্রদীপ সাহা। সেখানকার অধ্যক্ষ প্রদীপ মিত্র আবার বলছেন, “মদন মিত্র যে ডাক্তারদের দেখান, তাঁদের মধ্যে দীপ্তেন্দ্র সরকার, অরুণাভ সরকার, শুভঙ্কর চৌধুরীর মতো অনেকে এখানে জড়িত। তাই এই হাসপাতালে ভর্তি হলে মদনবাবুর সুবিধেই হওয়ার কথা।”

মজার কথা, দীপ্তেন্দ্রবাবু কিন্তু ঘুণাক্ষরেও বেসরকারি হাসপাতাল থেকে তাঁর রোগীর চলে যাওয়ার কথা জানতে পারেননি। প্রায় এক ঘণ্টা পরে সব শুনে তাঁর প্রতিক্রিয়া, “উনি কেন গেলেন আমাকে প্রশ্ন করে লাভ নেই। আমাকে যাবেন বলে আগে থেকে কিচ্ছু জানাননি।” তবে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, দীপ্তেন্দ্রবাবু জানিয়ে দিয়েছিলেন, অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত তাঁর পক্ষে একা নেওয়া সম্ভব নয়। আরও কয়েক জন শল্য চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। এটা জানার পরেই কিছুটা নিরাশ হন মদনবাবু।

তৃণমূলের এক প্রথম সারির নেতার কথায়, “হয়তো বেসরকারি হাসপাতালের ডাক্তারেরা সিবিআইয়ের অফিসারদের ভয়ে তাঁকে ছেড়ে দিতে পারতেন। এমনটা আশঙ্কা করেছিলেন মদনবাবু। এবং নেত্রীর পরামর্শ চেয়েছিলেন। তখনই মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে এসএসকেএমে যাওয়ার পরামর্শ দেন।” এর আগে মদনের ঘনিষ্ঠদের সিবিআই তলব করার পরেও বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে ভর্তি হন মদনবাবু। তখনও অনেকের আশঙ্কা ছিল, শীঘ্রই জেরার তলব আসবে। সে-যাত্রা কিন্তু বেশি দিন হাসপাতাল-বাস সম্ভব হয়নি মন্ত্রীর পক্ষে। কিছুটা তড়িঘড়ি মদনকে ছেড়ে দেন বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ বারও তেমন কিছু ঘটতে পারে আশঙ্কা করেই হয়তো তিনি ওই হাসপাতালে থাকার ঝুঁকি নেননি বলে মনে করছে তৃণমূলের একটি অংশ।

আর এক নেতার কথায়, “হয়তো মদনের আশঙ্কা, সারদা-কাণ্ডে সিবিআই তাঁকে ‘হেনস্থা’ করতে পারে। গ্রেফতার করতে পারে। সরকারি হাসপাতালে থাকলে রক্ষা পাওয়া যাবে।” কিন্তু কী ভাবে সেটা সম্ভব? ওই নেতার বক্তব্য, “পুরোপুরি (সিবিআইকে) এড়ানো যাবে না। কিন্তু কিছুটা বাড়তি সময় হয়তো মিলবে।” ওই নেতার ব্যাখ্যা, এসএসকেএমে সংবাদমাধ্যমের রাশও মদনদের হাতে থাকবে। যা বেসরকারি হাসপাতালে সম্ভব নয়। আর এই সময়ে দলনেত্রীও মদনের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের যোগাযোগ পছন্দ করছেন না। এসএসকেএমের এক কর্তাও বলছেন, “এই হাসপাতাল মদনবাবুর খাসতালুক। এখানে অনেক কিছুই ওঁর নিয়ন্ত্রণে। বেসরকারি হাসপাতালে হয়তো সব কিছু নিজের মনের মতো করতে পারবেন না।”

হয়তো তাই। হয়তো এত কিছু ভেবেই হয়তো ‘পাঁচ মিনিটে’ ভ্যানিশ হলেন মদন মিত্র!

Advertisement