বুধবারের বিকেল। বাস থেকে নামলেন রাজারহাট ডিরোজিও কলেজের এক ছাত্রী। কাঁধে ব্যাগ। কামদুনি মোড়ে চায়ের দোকানের সামনে ছোট্ট জটলা। সামনে দাঁড়ালেন কিছুক্ষণ। মিনিট দশেকের মধ্যে সাইকেল নিয়ে এলেন তাঁর বাবা। ভাঙাচোরা রাস্তা গিয়ে সাইকেলের পিছনে বসে পাঁচিলঘেরা পরিত্যক্ত এলাকাটির পাশ দিয়ে সোজা বেরিয়ে গেলেন বাবা-মেয়ে।
এখনও এত ভয়!
আড়াই বছরে এ তল্লাট কিছুটা বদলেছে। যাত্রী পরিবহণের জন্য ছোট গাড়ি চলছে। রাস্তার কিছু জায়গায় আলো বসেছে। কম দামে চাল দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ ও র্যাফের আনাগোনায় কোনটা বন্দুক আর কোনটা কালাশনিকভ, সহজেই চিনে ফেলে এখানকার কচিকাঁচারাও।
তবু ভয় যায়নি।
আড়াই বছর আগে, ২০১৩ সালের ৭ জুন যে নৃশংসতা দেখে শিউরে উঠেছিল গোটা কামদুনি, গোটা রাজ্য— সেই ভয় বোধহয় কাটার নয়। সে দিন টানা বৃষ্টিতে অন্ধকার নেমেছিল বিকেলেই। এ দিনের মতোই ডিরোজিও কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রী পরীক্ষা সেরে বাস থেকে নেমেছিলেন। নিজের বাড়ির এলাকাতেও যে তিনি নিরাপদ নন, ভাবতে পারেননি। ছাতা মাথায় হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে টেনেছিঁচড়ে পাঁচিলঘেরা জায়গাটিতে টেনে নিয়ে গণধর্ষণ করা হয়েছিল তাঁকে। অনেক রাতে ৫০০ মিটার দূরে তরুণীর ব্যাগ আর ছিন্নভিন্ন দেহ মেলে। তখন থেকেই আতঙ্কের প্রহর গোনে কামদুনি।
সেই আতঙ্ক আজ, বৃহস্পতিবার কি কিছুটা কমবে? সেই উত্তর জানার জন্যই আজ গোটা কামদুনি হয়তো সকাল থেকেই বসে পড়বে টিভির সামনে। কেননা, ওই ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় আজ রায় ঘোষণা করবে বিচার ভবন। ধৃত আনসার আলি-সহ ৮ জনেরই সর্বোচ্চ সাজা চায় কামদুনি। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা নাগাদ তাদের আদালতে পেশ করা হয়।
নিহতের বাড়িটি এখন হতশ্রী। তাঁর পরিবারকে সরকার সাহায্য করেছে। কিন্তু মেয়ের দুঃখ ভুলতে পরিবারটি কামদুনি ছেড়েছে। এখন ভাড়া নিয়ে তাঁরা থাকেন উত্তর বহিরায়। আজ, মেয়ের হত্যা-মামলার রায়ের কথা শুনে ছলছল করে ওঠে নিহতের বাবার চোখ। নিজের বুকটা দেখিয়ে অন্ধ হতে বসা মানুষটি বলে ওঠেন, ‘‘এখানে খুব, খুব কষ্ট।’’ নিহতের ভাই বলেন, ‘‘দোষীদের সর্বোচ্চ সাজা না হলে আমরা উচ্চ আদালতে যাব।’’
শুধু কি পরিবার? নিহতের সহপাঠী টুম্পা কয়ালও বলেন, ‘‘দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। আদালতে গিয়ে নিজের কানে সেই শাস্তি শুনব। আর কোনও মহিলা যেন মানুষের বর্বরতার শিকার হতে না পারে। আমার বন্ধুকে ওরা যে নৃশংস ভাবে মেরেছে, তাতে যেন কেউ আর ওই কাজ করার সাহস না পায়।’’ কামদুনি-আন্দোলনে টুম্পার সঙ্গেই ছিলেন ওই গ্রামের বধূ মৌসুমী কয়াল। তিনিও বলেন, ‘‘আমিও আদালতে যাব। এই দিনটার জন্যই তো অপেক্ষা করে আছি।’’ এ দিনই দু’জনে এলাকায় পুলিশ ক্যাম্পটিকে স্থায়ী ভাবে রেখে দেওয়ার দাবিতে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারের কাছে স্মারকলিপি জমা দেন।
আড়াই বছর আগে ভেড়ির মাছ আর খেতের ফসল নিয়ে একেবারেই নিজেদের জগতে থাকতেন কামদুনির গরিবগুরবো মানুষেরা। রাজ্যের ক’জনই বা জানতেন এ তল্লাটের নাম! ওই তরুণীকে ধর্ষণ-খুনের পরেই রাজ্য জানল নারী নির্যাতনের প্রতিবাদের আর এক নামও ‘কামদুনি’। সেই সময় ঘটনাস্থলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আসার দাবিতে উত্তাল হয়েছিল গোটা এলাকা। দিন দশেক পরে মুখ্যমন্ত্রী আসেন। তাঁর কাছে দোষীদের শাস্তি আর এলাকায় নিরাপত্তার দাবি জানাতে গিয়েছিল কামদুনি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন টুম্পা। তাঁকে ‘মাওবাদী’ ও ‘সিপিএম’ তকমাও দেওয়া হয়। মৌসুমীকেও সহ্য করতে হয়েছে নানা চাপ। তবু আন্দোলন থেকে তাঁরা সরেননি।
মুখ্যমন্ত্রী নিহত তরুণীর বাড়িতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘‘এক মাসের মধ্যে সাজা পাবে দোষীরা।’’ তার পরে পেরিয়ে গিয়েছে আড়াই বছর। আজ কী হবে, এই প্রশ্নে কিন্তু নানা সন্দেহ প্রকাশ করেছে চার বাম মহিলা সংগঠন। গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির রাজ্য সম্পাদক মিনতি ঘোষ বলেন, ‘‘পার্ক স্ট্রিট-কাণ্ডে যেমন সরকারি আইনজীবী অভিযুক্তদের ন্যূনতম শাস্তি চেয়েছিলেন, এ ক্ষেত্রে যেন তা না হয়।’’ আর তা যদি হয়? রাজ্য জুড়ে মহিলারা আন্দোলনে নামবেন বলে জানিয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী রেখা গোস্বামী।
একই অঙ্গীকার মৌসুমী-টুম্পাদেরও।