গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে শপথ নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মন্ত্রিসভা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি শপথ নিয়েছিলেন পাঁচ মন্ত্রী— দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পাল, নিশীথ প্রামাণিক, অশোক কীর্তনিয়া এবং ক্ষুদিরাম টুডু। সোমবার মন্ত্রিসভার প্রথম সম্প্রসারণে অন্তর্ভুক্ত হলেন আরও ৩৫ জন। তাঁদের মধ্যে ১৩ জন পূর্ণমন্ত্রী। ৩ জন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী। এর ফলে বিজেপি মন্ত্রিসভার মোট সদস্যের সংখ্যা হল ৪১।
পূর্ণমন্ত্রী হলেন ১৩
১. তাপস রায় (মানিকতলা)— আশির দশকের শেষ পর্বে ছাত্র পরিষদের রাজনীতি থেকে উত্থান। কংগ্রেস থেকে তৃণমূল হয়ে বিজেপিতে। অতীতে তৃণমূল মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন এই প্রবীণ এবং অভিজ্ঞ নেতা। উত্তর কলকাতা থেকে একমাত্র পূর্ণমন্ত্রী তিনি।
২. মনোজ ওরাওঁ (কুমারগ্রাম)— দু’বারের বিধায়ক। উত্তরবঙ্গের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তরুণ নেতা।
৩. অর্জুন সিংহ (নোয়াপাড়া)— দলের প্রথম সারির অবাঙালি মুখ। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল-সহ কলকাতা ও লাগোয়া এলাকার হিন্দিভাষীদের মধ্যে প্রভাবশালী। ২০১৯-এ তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়ে সাংসদ হয়েছিলেন। পরে তৃণমূলে যোগ দিলেও ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের আগে বিজেপিতে প্রত্যাবর্তন হয়েছিল অর্জুনের।
৪. গৌরীশঙ্কর ঘোষ (মুর্শিদাবাদ)— ‘আদি বিজেপি’ এবং দু’বারের বিধায়ক। মুর্শিদাবাদ জেলা বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি।
৫. দীপক বর্মণ (ফালাকাটা)— দলের অন্দরে ‘আদি বিজেপি’ হিসাবে পরিচিতি। দলের প্রাক্তন রাজ্য সাধারণ সম্পাদক তথা বর্তমানে সহ-সভাপতি। দু’বারের বিধায়ক। সঙ্ঘের পছন্দের নেতা।
৬. শারদ্বত মুখোপাধ্যায় (বিধাননগর)— বিশিষ্ট চিকিৎসক। বিধাননগরের মতো উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত বহুল এলাকা থেকে জয়ী। দলে অপেক্ষাকৃত নতুন। তবে দ্রুত পার্টি লাইনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পেরেছেন।
৭. অরূপকুমার দাস (কাঁথি দক্ষিণ)— মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর নিজের জেলা পূর্ব মেদিনীপুর থেকে একমাত্র পূর্ণমন্ত্রী। ওই জেলা থেকে আরও তিন জন সোমবার প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। তাঁদের মাঝে একমাত্র ব্যতিক্রম অরূপ। শুভেন্দুর বাড়ি যে কাঁথি দক্ষিণে, অরূপ সেখানকারই দু’বারের বিজেপি বিধায়ক। অধিকারী পরিবারের অনুগত হিসাবেই পরিচিত।
৮. স্বপন দাশগুপ্ত (রাসবিহারী)— দলের ‘সুশীল মুখ’ এই প্রাক্তন সাংবাদিক। ব্যবসায়ী মহলে এবং উচ্চবিত্ত শ্রেণিতে জনপ্রিয়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘ সুসম্পর্ক। সঙ্ঘেরও পছন্দের। রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য ছিলেন। শুভেন্দুকে বাদ দিলে দক্ষিণ কলকাতা থেকে জয়ী বিজেপি বিধায়কদের মধ্যে একমাত্র পূর্ণমন্ত্রী।
৯. জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় (সিউড়ি)— আরএসএসের ‘তৃতীয় বর্ষ প্রশিক্ষিত স্বয়ংসেবক’। ২০২১ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ। পর পর দু’টি নির্বাচনে নিজের শহর সিউড়িতে দলের প্রার্থী। গতবার হারলেও এ বার জয়ী। দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক পদ সামলেছেন। বর্তমানে রাজ্য সহ-সভাপতি।
১০. কল্যাণ চক্রবর্তী (খড়দহ)— কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষক। দীর্ঘ দিন ধরে সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। দলের ‘সুশীল মুখ’ হিসাবে পরিচিত এই নেতাও সঙ্ঘেরও পছন্দের। অনেকের মতে তিনি, ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে বাঙালি-অবাঙালি ভারসাম্যের প্রতীক। অবাঙালি পূর্ণমন্ত্রী অর্জুন। তাই ওই অঞ্চল থেকে এক ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত বাঙালি মুখকেও পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে।
১১. শঙ্কর ঘোষ (শিলিগুড়ি)— অন্যান্য দল থেকে যাঁরা বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, মন্ত্রিসভায় তাঁদের প্রতিনিধিত্বও যে গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রমাণ। দু’বারের বিধায়ক। বিধানসভা এবং নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র, দু’জায়গাতেই সক্রিয়তার নিরিখে প্রথম সারিতে সিপিএমের প্রাক্তন এই যুবনেতা।
১২. অজয় পোদ্দার (কুলটি)— পশ্চিম বর্ধমানের অবাঙালি সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছেন। দু’বারের এই বিধায়ক।
১৩. দুধকুমার মণ্ডল (ময়ূরেশ্বর)— মন্ত্রিসভার ‘আদি বিজেপির’ তালিকায় ‘আদিতম’। রামমন্দির আন্দোলনের সূচনা লগ্নে অযোধ্যায় গিয়ে কারসেবায় যোগ দিয়েছিলেন। ফেরার পথে বর্ধমান স্টেশনে সিপিএমের হাতে মার খেয়েছিলেন। বীরভূমের মতো কঠিন জেলায় রাজনীতি করেছেন। বিভিন্ন সময় দলের সঙ্গে সম্পর্কের চড়াই-উৎরাই-পর্বও গিয়েছে।
‘স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত’ ৩ প্রতিমন্ত্রী
১. মালতি রাভা রায় (তুফানগঞ্জ)— ‘আদি বিজেপি’ এবং দলের কোচবিহার জেলা কমিটির প্রাক্তন সভানেত্রী। লড়াকু ভাবমূর্তির রাজবংশী সম্প্রদায়ের এই নেত্রী দু’বারের বিধায়ক।
২. রাজেশ মাহাতো (গোপীবল্লভপুর)— কুড়মি সমাজের প্রভাবশালী নেতা। কুড়মি জনগোষ্ঠীর সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলনে অন্যতম মুখ ছিলেন।
৩. ইন্দ্রনীল খাঁ (বেহালা পশ্চিম)— তরুণ চিকিৎসক-নেতা। দলের অন্যতম উচ্চশিক্ষিত মুখও। যুবমোর্চার রাজ্য সভাপতি। শুভেন্দু মন্ত্রিসভায় যুব সমাজের প্রতিনিধি হিসাবে চিহ্নিত।
১৯ প্রতিমন্ত্রীর পরিচয়
১. অশোক দিন্ডা (ময়না)— ভারতীয় জাতীয় দলের প্রাক্তন ক্রিকেটার। ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়ে প্রথম বার বিধায়ক হয়েছিলেন। এ বার বেড়েছে জয়ের ব্যবধান। শুভেন্দুর ঘনিষ্ঠ হিসাবে জেলা রাজনীতিতে পরিচিত।
২. কৌশিক চৌধুরী (রায়গঞ্জ)— প্রথম বারের এই বিধায়ক ‘আরএসএস-এর পছন্দের’ বলেই পরিচিত।
৩. জুয়েল মুর্মু (হবিবপুর)— তিন বারের বিধায়ক (এক বার উপনির্বাচন-সহ)। একদা রাজ্য বিজেপির জনজাতি মোর্চার সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন এই আদিবাসী নেতা।
৪. হরেকৃষ্ণ বেরা (তমলুক)— পেশায় চিকিৎসক। ২০২১ সালের তমলুকে বিজেপির প্রার্থী হয়ে পরাস্ত হয়েছিলেন। এ বার জিতেছেন।
৫. শান্তনু প্রামাণিক (ভগবানপুর)— পেশায় শিক্ষক। ২০২১ সালে খেজুরি বিধানসভায় বিজেপি প্রার্থী হিসাবে জিতেছিলেন। এ বার আসন বদলেও জয় পেয়েছেন।
৬. মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্র (বর্ধমান দক্ষিণ)— রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনী পেশায় আইনজীবী। প্রথম বারের বিধায়ক।
৭. উমেশ রাই (হাওড়া উত্তর)— হাওড়ার হিন্দিভাষী জনগোষ্ঠীর নেতা। আদি বিজেপি। ২০২১-এ পরাস্ত হয়েছিলেন। এ বার জয়ী হওয়ার পরে পেলেন মন্ত্রিত্ব।
৮. পূর্ণিমা চক্রবর্তী (শ্যামপুকুর)— অবাঙালি পরিবারের কন্যা। বাঙালি পরিবারের বধূ। এ বার বার ভোটে দাঁড়িয়েই হারিয়েছেন প্রভাবশালী মন্ত্রী শশী পাঁজাকে।
৯. ভাস্কর ভট্টাচার্য (শ্রীরামপুর)— আদি বিজেপির এই নেতা পেশায় আইনজীবী। দলের জেলা সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। এ বারই প্রথম বিধায়ক হয়েছেন।
১০. দিবাকর ঘরামি (সোনামুখী)— বাঁকুড়া জেলার ওই কেন্দ্র থেকে পর পর দু’বার জয়ী বিজেপি বিধায়ক।
১১. নদিয়ারচাঁদ বাউড়ি (পারা)— আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নেতা। পর পর দু’বার জয়ী বিধায়ক।
১২. গার্গী দাস ঘোষ (কান্দি)— প্রভাবশালী তৃণমূল প্রতিদ্বন্দ্বী অপূর্ব সরকারকে হারিয়ে প্রথম বার বিধায়ক হয়েছে। তাঁর মা প্রয়াত ছায়া ঘোষ মুর্শিদাবাদ জেলার প্রথম সারির ফরওয়ার্জ ব্লকে নেত্রী এবং দীর্ঘ দিন বামফ্রন্টের মন্ত্রী ছিলেন।
১৩. অমিয় কিস্কু (নয়াগ্রাম)— এ বারই প্রথম প্রার্থী হয়েছিলেন এই আদিবাসী নেতা। প্রথম বার বিধায়ক হয়েই পেলেন মন্ত্রিত্ব।
১৪. কলিতা মাজি (আউশগ্রাম)— দলিত সমাজের মুখ। পেশায় গৃহ পরিচারিকা। পর পর দু’টি নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী। গতবার হারলেও এ বার জিতেছেন। তফসিলি মহিলা সমাজের মুখ হিসাবে মন্ত্রিসভায় আনা হয়েছে।
১৫. বিরাজ বিশ্বাস (করণদিঘি)— রাজ্যের কনিষ্ঠতম বিধায়ক এবং শুভেন্দু মন্ত্রিসভার কনিষ্ঠতম সদস্য। সঙ্ঘের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি থেকে উত্থান। পেশায় আইনজীবী।
১৬. সুমনা সরকার (বলাগড়)— তৃণমূলের টিকিটে ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে জেলা পরিষদের সদস্যা হয়েছিলেন। ২০১৮-২১ ছিলেন জেলা পরিষদের সহ-সভাধিপতি। সে বছরই মুকুল রায়ের হাত ধরে বিজেপিতে যোগদান করেন।
১৭. আনন্দময় বর্মণ (মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি)— রাজবংশী এই নেতা গত দু’বারের বিধায়ক। এ বার ফলতার পুনর্নির্বাচনের ফলাফল বাদ রাখলে আনন্দময় দু’বারই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটে জয়ী!
১৮. বিশাল লামা (কালচিনি)— আলিপুরদুয়ার জেলা বিজেপির প্রথম সারির নেতা তথা দু’বারের বিধায়ক। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এই নেতা ডুয়ার্স অঞ্চলে সবচেয়ে সক্রিয় বিধায়কদের অন্যতম।
১৯. দীপঙ্কর জানা (কাকদ্বীপ)— ‘তৃণমূলের দুর্গ’ হিসাবে পরিচিত দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় বিজেপির অন্যতম মুখ। ২০২১-এ হারলেও এ বার জয়ী হয়েছেন।
সোমবার শপথ নেওয়া মন্ত্রীদের শুভেচ্ছা জানিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে মন্ত্রিপদের শপথ গ্রহণকারী সকল মন্ত্রীগণকে আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। আমার পূর্ণ বিশ্বাস, আপনারা সকলেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী মোদীজির দিকনির্দেশনা এবং শ্রী শুভেন্দু অধিকারী মহাশয়ের নেতৃত্বে গঠিত ডাবল ইঞ্জিন সরকারের অংশ হিসেবে নিষ্ঠা, সমর্পণ ও জনসেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করবেন ও ‘সোনার বাংলা’ গড়ার সংকল্প বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।’’