সদিচ্ছা থাকলে যে জঞ্জাল থেকে তুলে আনা আঙুলও জোড়া লাগানো যায়, তা করে দেখিয়েছেন পুরুলিয়া সদর হাসপাতালের চিকিৎসক পবন মণ্ডল। এ বার দেখালেন আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালের শল্য চিকিৎসক অনিন্দ্য সাহা। তাঁর দক্ষতায় অঙ্গহানির হাত থেকে রেহাই পেল সাত বছরের একটি শিশু। তবে, এ ক্ষেত্রে তাঁকে সাহায্য করেছে ওই শিশুটির পরিবারের সচেতনতাও।
ছাগলের জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে হাতের কড়ে আঙুল খোয়া গিয়েছিল আলিপুরদুয়ার ২ ব্লকের চণ্ডীর ঝাড় গ্রামের সাত বছরের বিশাল বর্মনের। বাড়ির লোকেরা তাকে দ্রুত আলিপুরদুয়ার জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে, বুদ্ধি করে বিশালের মা কাজলি কাটা আঙুলটি কাগজে মুড়ে সঙ্গে নিয়েছিলেন। ওই কাটা আঙুল পেয়েই দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন অনিন্দ্যবাবু। সেই অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে বলে মঙ্গলবার দাবি করলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
কেন তিন দিন পরে জানানো হল?
কর্তৃপক্ষ জানান, এ দিন সকালেই শিশুটির আঙুলের ওই অংশে রক্ত চলাচল শুরু হয়। সে আস্তে আস্তে আঙুল নাড়াতে পারে। অস্ত্রোপচার সফল কি না, তা বোঝার জন্য এগুলি জানা জরুরি। শনিবার হাসপাতালে পৌঁছনোর পরে চিকিৎসকেরা প্রথমে বিশালকে উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে রেফার করেন। কিন্তু বাড়ির লোকজন জানিয়ে দেন, সেই সামর্থ্য তাঁদের নেই। চিকিৎসক অনিন্দ্যবাবু বলেন, ‘‘বুঝেছিলাম, যদি কিছু করতে হয়, তা হলে তখনই করতে হবে। নয় তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।’’ স্যালাইন জলে আঙুলটি ভিজিয়ে তার পরে ‘কম্পোজিট গ্রাফটিং’ অর্থাৎ জোড়া লাগানোর অস্ত্রোপচার করেন তিনি।
শিশুটির ঠাকুমা বিজন্তি বর্মন বলেন, “আমাদের শিলিগুড়ি যাওয়ার ক্ষমতা ছিল না। আলিপুরদুয়ার হাসপাতালে বিনা খরচে নাতিকে সুস্থ করলেন ডাক্তারবাবুরা।’’ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত সুপার রেজাউল মিনাজ জানালেন, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া অংশ জোড়া দেওয়ার অস্ত্রোপচার জেলা হাসপাতালগুলিতে বিরল। ক’দিন আগে পুরুলিয়ায় এমন একটি অস্ত্রোপচার হয়েছিল। এ বার এখানে হল। হাসপাতালগুলি যে রোগীদের পরিষেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, এই সব ঘটনাই তার প্রমাণ।’’
ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া কাটা আঙুল জোড়া দিয়ে অগস্টে পুরুলিয়ার বাসিন্দা মুক্তারাম দত্তকে নতুন জীবন দিয়েছিলেন পুরুলিয়ার দেবেন মাহাতো সদর হাসপাতালের চিকিৎসক। তখনও পরিকাঠামোর থেকে বড় হয়ে উঠেছিল চিকিৎসকের সদিচ্ছা। যদিও সেই সৌভাগ্য হয়নি জুলাইয়ে বালুরঘাট হাসপাতালের এক সদ্যোজাত শিশুকন্যার। নার্সের গাফিলতিতে কাটা গিয়েছিল তার বুড়ো আঙুল। ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে শিশুটিকে নিয়ে যাওয়া হয় এসএসকেএম-এ। কিন্তু শিশুটির আঙুল আর জোড়া লাগেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কত দ্রুত কাটা অঙ্গ নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছনো হচ্ছে এবং সেখানে কত দ্রুত অস্ত্রোপচার শুরু করা হচ্ছে, সেটাই সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এসএসকেএম হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক অরিন্দম সরকারের কথায়, ‘‘এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সদিচ্ছা এবং দক্ষতা। এ ক্ষেত্রে ওই দু’টিই ছিল বলে শিশুটি স্বাভাবিক জীবন পেল। আর বাড়ির লোকের ভূমিকাও খুবই প্রশংসনীয়। ওই অবস্থাতেও তাঁরা আঙুলটি সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন।’’
কী করা উচিত এই সব ক্ষেত্রে? অরিন্দমবাবু জানান, কাটা অংশে যদি ধুলোবালি লেগে থাকে তা হলে পরিষ্কার জলে ধুয়ে সেটি প্লাস্টিকে মুড়ে নেওয়া উচিত। তার পর সেই প্লাস্টিক বরফের মধ্যে রেখে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে পৌঁছনো জরুরি। কোনওভাবেই সরাসরি বরফের মধ্যে কাটা অংশটি যেন না রাখা হয়। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে।
দুর্ঘটনার কত ক্ষণের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছলে ভাল হয়? তিনি জানান, ছ’থেকে আট ঘন্টার মধ্যে হলে সব চেয়ে ভাল। ১২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে অস্ত্রোপচার সফল হওয়ার আশা কমতে থাকে।