কেন খুন হলেন নিশান্ত কিরণ, এখনও আঁধারে বীরভূম পুলিশ।
টুকরো কিছু সূত্র জোড়া লাগিয়েই বোলপুরের ওই ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রের মৃত্যু-রহস্য উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। তবে, খুনের ‘মোটিভ’ সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত জোরদার কিছু বের করতে পারেননি তদন্তকারীরা। ঘটনার পরে গা ঢাকা দিয়ে ধন্দ আরও বাড়িয়েছেন নিহত ছাত্রের মেসের অন্য আবাসিকেরা। তবে পালানোর আগে এই খুনের পিছনে এলাকার বাসিন্দা তথা বোলপুর পুরসভার এক প্রভাবশালী তৃণমূল কাউন্সিলরের ঘনিষ্ঠ বোলপুর কলেজের এক টিএমসিপি নেতার দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন তাঁরা।
তদন্তে উঠে এসেছে কাছেই থাকা অন্য একটি মেসের আবাসিকদের সঙ্গে নিশান্তদের বিরোধের কথাও। এলাকায় দেখা মিলছে না ওই ছাত্রনেতার, পাততাড়ি গুটিয়েছেন অন্য মেসের আবাসিকেরাও। তাঁদের খোঁজ শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই উধাও নিশান্ত এবং তাঁর মেসের বন্ধুদের মোবাইলগুলিও।
রবিবার ভোররাতে কিছু যুবক বোলপুর ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একুশ বছরের নিশান্তের দেহ ফেলে রেখে পালান। ইলামবাজারের এক বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নিশান্তের বাবা সোমবার অজ্ঞাতপরিচয়দের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ দায়ের করেছেন। আর তার পরেই কলেজের পাঁচ ছাত্রকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। দুপুরে তদন্তে যায় নিহত ছাত্রের মেসেও। এ দিন যোগাযোগ করা যায়নি নিশান্তের মেসের বন্ধু সৌরভকুমার সিংহ, বরুণ কুমারদের সঙ্গেও। পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে পৃথক তদন্ত শুরু করেছেন কলেজ কর্তৃপক্ষও। কলেজের রেজিস্ট্রার অমিতাভ চৌধুরী জানান, এ বার থেকে পড়ুয়াদের কলেজের হস্টেলে থাকা বাধ্যতামূলক করার কথাও ভাবতে শুরু করেছেন তাঁরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, জামবুনির বড় ক্যানাল পাড়া ও মাদ্রাসা পাড়ায় ওই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রদের দু’টি মেস রয়েছে। দুই মেসের ছেলেদের মধ্যে ঝামেলা হতো। নিশান্ত ছিলেন বড় ক্যানালপাড়ার মেসটির আবাসিক। বৃহস্পতিবার পঞ্চম সেমেস্টারের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। শনিবার রাতে দু’টি মেসেই পিকনিক হয়। ছিল মদ্যপানের আসরও। পুলিশ জেনেছে, ওই রাতেই বড় গণ্ডগোল বাধে দুই মেসের আবাসিকদের মধ্যে। তখনই কোনও ভাবে নিশান্তের মৃত্যু হয়।
পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, বিহার থেকে পড়তে আসা ওই ছাত্রের সঙ্গে স্থানীয় কিছু যুবকের মেলামেশা বেড়েছিল। নিশান্ত ওই যুবকদের কাছ থেকে ধার করে মোটরবাইক কিনেছিলেন। ধার শোধ না করায় ওই যুবকেরা সম্প্রতি রাস্তাঘাটে নিশান্তকে চেপে ধরত। কয়েক বার তাঁরা মেসেও তাগাদায় গিয়েছিল। জেলা পুলিশের এক কর্তার বক্তব্য, ‘‘প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছি, টাকার জন্য যুবকেরা বোলপুর কলেজের ওই ছাত্রনেতার শরণ নিয়েছিল। সম্ভবত, ঘটনার রাতে সেই টাকা আদায় করতে মাদ্রাসাপাড়ার মেসের ছেলেদের নিয়ে নিশান্তদের মেসে হানা দিয়েছিল ওই ছাত্রনেতা। দরজা ভেঙে নিশান্তের ঘরে ঢোকে।’’ ওই হামলাতেই চোট পেয়ে নিশান্ত মারা যান বলে তাঁর দাবি। ওই ছাত্রনেতাও পলাতক। দ্বিতীয় মেসটির আবাসিকদের নাম-ঠিকানা জোগাড় করে প্রয়োজনে বিহারে যাওয়ার কথাও ভাবছে।
এ দিন ভোরে ছেলের মরদেহ নিয়ে পটনায় বাড়ি ফেরার আগে নিশান্তের বাবা বলেন, ‘‘ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার করব বলে এত দূরে পাঠিয়েছিলাম। এখন ওর দেহ নিয়ে ফিরছি। ওর মা, দিদি-বোনকে কী জবাব দেব!’’