বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র খুনের ঘটনায় শাসকদলের যে ছাত্রনেতার নাম বারবার উঠে আসছিল, ঘটনার ২১ দিন পর তাকে অবশেষে গ্রেফতার করল পুলিশ। ধৃত জিয়াউল শেখ বোলপুর কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। শনিবার বোলপুর আদালতে হাজির করা হলে পুলিশ তাকে ১৪ দিনের জন্য হেফাজতে চায়। আদালত ৯ দিন পুলিশ হেফাজত মঞ্জুর করেন।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, শাসকদলের ছাত্র নেতা জিয়াউল স্থানীয় বিভিন্ন হস্টেল এবং মেসে ‘দাদাগিরি’ চালাত। ছাত্র সংগঠনের পাশাপাশি পাড়ার ছেলেদের একটি দল নিয়ে দাপট দেখিয়ে বেড়াত সে। সূত্রের খবর, বোলপুরের তৃণমূল কার্যালয়েও নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার। দলের বিভিন্ন কর্মসূচীতেও সামনের সারিতে দেখা গিয়েছে এই ছাত্র নেতাকে।
প্রসঙ্গত, চলতি গত মাসের ২০ তারিখ, ভোর রাতে বোলপুর ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কে বা কারা স্থানীয় একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র পটনার বাসিন্দা নিশান্ত কিরণের দেহ ফেলে রেখে যায়। চিকিৎসকরা জানান, স্বাস্থকেন্দ্রে নিয়ে আসার আগেই মৃত্যু হয়েছিল নিশান্তের। ঘটনার কথা জানাজানি হতে এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়ায়। নিশান্ত বোলপুরের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের জামবুনি এলাকার বড় ক্যানেল পাড় এলাকার একটি মেসে থাকত। তদন্তে নেমে পুলিশ ওই মেস এবং মাদ্রাসা পাড়ার একটি মেসের আবাসিকদের মধ্যে ঝামেলার কথা জানতে পারে। অভিযোগ ওঠে, ঘটনার দিন মাদ্রাসা পাড়ার মেসের ছাত্ররা ক্যানেলপাড়ের মেসে হামলা করেছিল। এবং সেই হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিল জিয়ারুল।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, স্থানীয় জামবুনি এলাকার ক্যানাল পাড়ার একটি মেসে আরও ৪ ছাত্রের সঙ্গে থাকতেন নিশান্ত। লাগোয়া মাদ্রাসাপাড়ার একটি মেসের আবাসিকদের সঙ্গে ওই মেসের আবাসিকদের দীর্ঘ দিন ধরেই বিরোধ ছিল। মাদ্রাসা পাড়ার মেসে নিয়মিত যাতায়াত ছিল জিয়াউলের। ঘটনার রাতে দু’টি মেসেই ফিস্ট হচ্ছিল। বসেছিল মদ্যপানের আসরও। পুলিশের একটি সূত্র জানাচ্ছে, জিয়াউলকে জেরা করে, মাদ্রাসাপাড়ার আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া গিয়েছে। তাঁদের অবশ্য খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের অনুমান, জিয়াউল আরও কিছু তথ্য দিতে পারে। সেই জন্য পুলিশ, তাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। এরপর অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে তাকে মুখোমুখি বসিয়ে একসঙ্গে জেরা করা হবে।
পুলিশ প্রথমে নিশান্তের দুই রুমমেটকে গ্রেফতার করে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের জেরা করতে জিয়াউলের নামও উঠে আসে। কিন্তু অভিযুক্ত শাসক দলের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তাকে ধরা হচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। বোলপুরের এসডিপিও অম্লানকুসুম ঘোষ অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, জেরায় জিয়াউলের নাম উঠে আসার পরেই তার খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়ে গিয়েছিল। জিয়াউলের খোঁজে বিহারেও পাঠানো হয়েছিল পুলিশের একটি দলকে। জেলার এক পুলিশ কর্তা জানান, তদন্তে জানা গিয়েছে ওই রাতে নিশান্ত কিরণের সঙ্গে অভিষেক কুন্দন এবং চন্দন কুমার নামে বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজটির আরও দুই ছাত্র ছিলেন। তাঁরা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বা অন্য কোনও ভাবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। অবশেষে শুক্রবার দুপুরে স্থানীয় শিবতলার কাছ থেকে গ্রেফতার করা হয় তাকে।
ঘটনা হল, জিয়াউলের গ্রেফতারে অস্বস্তি বেড়েছে শাসকদলের। দলীয় কার্যালয়ে এই ছাত্রনেতার ঘন ঘন যাতায়াত প্রসঙ্গে তৃণমূলের ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি সুরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই আমাদের সংগঠনের কর্মী-সমর্থক। সেই হিসাবে নানা কারণে দলীয় কার্যালয়েও তাদের যাতায়াত থাকতেই পারে।’’ কিন্তু তাঁরা এ ধরণের ঘটনাকে প্রশ্রয় দেন না দাবি করে সুরঞ্জনবাবু বলেন, এক্ষেত্রে আইন আইনের পথেই চলবে।
সরকারি আইনজীবী শ্যামসুন্দর কোনার জানান, মৃত ছাত্রের বাবা অশোক শর্মা কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করেনি। পুলিশ তদন্ত করে প্রথমে দু’জনকে ধরে। তাদের জেরা করে জিয়াউলের নাম পায়। জিয়াউলকে এ দিন কোর্টে হাজির করানোর পর পুলিশ তাদের ১৪ দিন নিজেদের হেফাজতে চায়। কিন্তু আদালত ৯ দিন পুলিশি হেফাজত মঞ্জুর করেছেন।