ভোটের আগে শেষ বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী তাঁদের জন্য কোনও সুখবর রাখবেন, এমনটাই আশা করেছিলেন রাজ্য সরকারি কর্মীরা। কিন্তু শুক্রবার বিধানসভায় অমিত মিত্রের বাজেট দেখে ওঁদের একাংশ হতাশ। এই মহলের আক্ষেপ, বাজেট প্রণয়ন করার সময়ে সরকারি কর্মীদের বেতনবৃদ্ধির ব্যাপারটা মাথাতেই রাখা হয়নি!
পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিজেদের কর্মীদের জন্য ইতিমধ্যে বেতন কমিশন গড়েছে। সেই কারণে এ বারের বাজেটে বেতন ও পেনশনে অন্তত ৩০% বৃদ্ধির সংস্থান রাখা হবে বলে অনেকে আশা করেছিলেন। একান্তই তা না-হলে ভোটের আগে অন্তত এক কিস্তি মহার্ঘভাতা (ডিএ) বা অন্তর্বর্তী বেতনবৃদ্ধির সংস্থানের দিকেও তাকিয়ে ছিলেন অনেকে। বাস্তবে সে সব কিছুই হয়নি।
এ দিন বিধানসভায় অর্থমন্ত্রী অমিতবাবুর পেশ করা হিসেব বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে রাজ্য সরকারি কর্মীদের বেতন-পেনশন দিতে খরচ হয়েছে ৪৬১৯৭.৫৬ কোটি টাকা। আগামী অর্থবর্ষে এই খাতে বরাদ্দ ৫০১৬৬.৮২ কোটি। মানে ৮.৫% বেশি। তার পরেও বেতন-পেনশনের পরিমাণ বাড়ছে না কেন?
অর্থ-সূত্রের যুক্তি: সাধারণত ফি বছর জুলাইয়ে কর্মীদের ৩% হারে বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) হয়। পাশাপাশি সরকার ইতিমধ্যে ঠিকা ও চুক্তিভিত্তিক তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের বেতনবৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেছে। উপরন্তু নতুন করে ৬০ হাজার চতুর্থ শ্রেণির কর্মী নেওয়া হবে। ‘‘বাড়তি যতটুকু বরাদ্দ, তা তো এ সবেই খরচ হয়ে যাবে!’’— বলছেন এক কর্তা।
তাই কর্মীদের সার্বিক বেতনক্রমে পরিবর্তন কিংবা বকেয়া ডিএ’র বড় অংশ মেটানোর কোনও সুযোগ থাকছে না বলে ওঁদের দাবি। যদিও প্রশাসনের অন্য অংশ কিছুটা আশাবাদী। তাদের বক্তব্য, বাজেটে বরাদ্দ যা-ই থাক না কেন, সংশোধিত বাজেটে সব সময়ে তা বাড়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রেও রাজ্যের পরবর্তী সরকারের সামনে সেই সুযোগ বিলক্ষণ থাকছে।
একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার রাজ্যে ১০ লক্ষ চাকরি দেওয়ার যে দাবি করছে, বাজেট-পরিসংখ্যানের প্রেক্ষাপটে তার সারবত্তা সম্পর্কেও সন্দিহান হয়ে পড়েছে কর্মীদের বড় অংশ।
যাদের মতে, দশ লাখ নতুন চাকরি সত্যি হয়ে থাকলে বেতন বাবদ বরাদ্দ অনেক বেশি রাখতে হতো। ‘‘সেটা হয়নি কেন?’’— প্রশ্ন ওঁদের।
যার জবাবে প্রশাসনের একাংশ বলছে, চলতি অর্থবর্ষে সরকারি কর্মীদের অবসরের বিষয়টি মাথায় রাখলে সন্দেহের অবকাশ থাকবে না। কী রকম?
প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট মহলের যুক্তি: অবসরের সময়ে এক সরকারি কর্মীর যা বেতন হয়, নতুন কর্মী নিযুক্ত হন তার অনেক কমে। ফলে খরচে ভারসাম্য থাকে। কর্মীদের অনেকে অবশ্য তা মানেন না। ওঁদের বক্তব্য: দশ লক্ষ নতুন নিয়োগ হলে বাজেট বরাদ্দে তার ছাপ কিছুতেই এড়ানো যেত না। কারণ, বছরে গড়ে তিন শতাংশের বেশি কর্মী অবসর নেন না, সংখ্যার হিসেবে যা বড়জোর ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার। ‘‘ওঁদের বেতনের টাকায় দশ লাখ নতুন লোক নেওয়া সম্ভব নয়, তা মাইনে যত কমই হোক না কেন।’’— মন্তব্য একাধিক কর্মচারীর।
ফলে ‘ভারসাম্যের’ যুক্তি ওঁদের কাছে ধোপে টিকছে না। তোপ দাগছে বিরোধীপক্ষও। তাদের এ-ও অভিযোগ, এই সরকার কর্মীদের জন্য বরাদ্দ টাকাই খরচ করে উঠতে পারেনি! যেমন আইএনটিইউসি’র কর্মী সংগঠন ‘কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ’-এর নেতা মলয় মুখোপাধ্যায়ের হিসেবে, ‘‘গত বাজেটে অর্থমন্ত্রী শুধু সরকারি কর্মীদের বেতন (পেনশন নয়) খাতে ৩৩৬৯৩.১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিলেন। কিন্তু ১০% ডিএ দিয়েও খরচ হয়েছে তার চেয়ে কম— ৩২৯১১.০৪ কোটি!’’
অর্থাৎ, এই বাবদ আরও খরচের সুযোগ থাকলেও করা হয়নি বলে অভিযোগ মলয়বাবুর। আর সিপিএম প্রভাবিত সরকারি কর্মী সংগঠন কো-অর্ডিনেশন কমিটির নেতা মনোজ গুহের পর্যবেক্ষণ, ‘‘বাজেট প্রস্তাবেই প্রমাণ হয়ে গেল যে, এই সরকার স্রেফ ভোটের বৈতরণী পার হতে লোক দেখানো একটা বেতন কমিশন বানিয়েছে।’’