কলেজের পিকনিক ছিল রবিবার। সেই জন্য সারাদিন হই-হুলোড় করে ক্লান্ত ছিলাম। পিকনিক থেকে ফিরে আমরা তাড়াতা়ড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ‘আমরা’ মানে, মণিপুরের চারজন ছাত্রী। এই কলেজেই তিনজন থার্ড ইয়ারে আর একজন ফাস্ট ইয়ারে পড়ি। সবাই কলেজের হোস্টেলেই থাকি। একই রুমে, পাশাপাশি বেড। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ মনে হল, আমাদের বিছানাগুলো কেউ জোরে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে দেখি, পড়ার টেবিলের বই, জলের বোতল— সব নড়ছে। ঘরের সিলিং ফ্যানটা জোর দুলছে!
আমি বুঝে গেলাম ভূমিকম্প হচ্ছে। নিচে নেমে যাব কিনা ভাবছি, এমন সময় দেখি আমার রুমমেটদেরও ঘুম ভেঙে গিয়েছে। ভয়ে, আতঙ্কে সবাই নিচে নামতে যাব, সে সময় মনে হল নড়াটা যেন বন্ধ হল। আর ঠিক সেই সময়ই আমার সহপাঠী কাম রুমমেট থিয়াং প্রিয়ার মেবাইলটা বাজতে শুরু করল। ও গিয়ে দেখল, ওর বাড়ি ইম্ফল থেকে দিদি ফোন করেছে। ওর বাড়ি থেকে আসা ফোনেই জনলাম মণিপুরেই ভূমিকম্প হয়েছে!
দিদির সঙ্গে প্রিয়া ফোনে কথা বলতে বলতেই বসে পড়ল। ফোন রেখে, শুকনো মুখে জানাল, মণিপুরই ভূমিকম্পের উৎস স্থল। ওদের বাড়ির টিভি ভেঙে গিয়েছে!
এই খবর পেয়েই বাড়ির জন্য আমার আর আমার আরেক রুমমেট ফাস্ট ইয়ারের পুষ্পারাণী খিয়াসাম দুজনেরই বাড়ির জন্য খুবই চিন্তা হতে লাগল। কে জানে কেমন আছে বাবা-মা। প্রায় সব আত্মীয়-স্বজন ওখানেই থাকে। প্রথমে কেউই ফোনের লাইন পাচ্ছিলাম না। পরে মোবাইলে এক-একটা কল রিং হয়ে হয়ে যতো কেটে যাচ্ছে ভয়ে-আতঙ্কে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। দু’জনেই মোবাইল থেকে বাড়ির লোকেদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতে লাগলাম। একসময় দিশেহারার মতো লাগছিল!
পুষ্পা প্রথমে লাইনটা পেল। ওই প্রথম বাড়ির সঙ্গে কথা বলতে পারল। পরে, আমি। ওর কাছ থেকে জানলাম, ওদের বাড়ির মেন গেটের দেওয়ালে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। রান্না ঘরের তাক থেকে কাঁচের বাসন পড়ে গিয়ে ভেঙে গিয়েছে। এ ছাড়া আর সে রকম কোনও ক্ষতি হয়নি ওদের বাড়িতে। পুষ্পা যখন ওর বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলছিল, ঠিক তখনই আমিও বাড়ির ফোনে লাইন পেয়ে গেলাম। ওদিক থেকে বাড়ির লোকেরা ফোন ধরে প্রথমেই জানতে চাইল, আমি কেমন আছি। ‘ভালো আছি’ জেনে ওরা নিশ্চিত হল।
পরে ওরা জানাল ওদের অভিজ্ঞতা। বাড়ির লোকেরা বলছিল বাড়িটাকে কেউ যেন জোরে জোরে ধাক্কা মেরে দোলা ছিল কেউ। বিছানা, সিলিং ফ্যান, আলমারি, খাবার টেবিল-সব খুব জোরে জোরে দুলছিল। খুব ভয় পেয়েই বাড়ির লোকেরা বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। দুলুনি কমতেই আমার জন্য বাড়ির লোকেদের চিন্তা শুরু হয়। ওরাও ওদিক থেকে আমাকে ফোনে ধরার চেষ্টা করছিল। কিন্তু লাইন পাচ্ছিল না। পরে আমার ফোনে ওদের উদ্বেগ, চিন্তা খানিকটা কমে।
ভাবছি বাড়ি যাব। বাড়ির লোকেদের ছাড়াও পাড়ার লোকেদের, ওখানকার বন্ধুদের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে। সবাই কেমন আছে, চোখে না দেখলে স্বস্তি হচ্ছে না। ওখানকার আরোও একজন আমার সহপাঠী কাম রুমমেট। সে বাড়ি গিয়েছে। এখনও পর্যন্ত ওকেও ফোনে পাইনি। জানিনা ও ওর বাড়ির লোকেরা সবাই কেমন আছে। ভোর থেকই ওর জন্যও খুব চিন্তা হচ্ছে! কিন্তু সামনেই পরীক্ষা। পরীক্ষা ফেলে বাড়িও যেতে পারছি না। ওখানকার সঙ্গে আমাদের যোগাগোগের ভরসা বলতে এখন মোবাইল আর টিভি!
(বিবেকানন্দ হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী)