দাবি উঠেছিল করমুক্ত করার। উদ্দেশ্য ছিল, গ্রামের মেয়েদের কাছে সস্তায় স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি ন্যাপকিন পৌঁছে দেওয়া। দেশ জুড়ে এই আওয়াজ তীব্র হওয়ায় নরেন্দ্র মোদী সরকার স্যানিটারি ন্যাপকিনের উপর থেকে জিএসটি তুলে নিয়েছে। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয়েছে। কর কমার পরেও ন্যাপকিনের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন গ্রামগঞ্জ, ছোট শহরের প্যাড উৎপাদকদের একাংশ।

কেন?

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট ছোট সমবায়, স্বরোজগার দল, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা করমুক্ত ন্যাপকিন বিক্রি করতে গিয়ে কাঁচামালের উপরে ‘ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট’ পাচ্ছেন না। ফলে কম পুঁজি নিয়ে প্যাডের কারবারে নামা ছোট ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস উঠছে বলে রাজ্যের অর্থ দফতরে অভিযোগ আসছে।

এমন অবস্থা হল কেন?

অর্থ দফতরের একাংশ জানাচ্ছেন, ন্যাপকিন করমুক্ত হওয়ায় বাজারে এর দাম কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে বড় ব্র্যান্ডের তৈরি ন্যাপকিনের দাম কার্যত একই রয়েছে। উল্টে চাপে পড়ে গিয়েছেন ছো়ট উৎপাদকেরা। জিএসটি-কর্তাদের একাংশ জানান, প্যাড তৈরির জন্য কাঁচামাল হিসেবে কিনতে হয় তুলো, বিশেষ ধরনের কাপড়, প্লাস্টিক, ইলাস্টিক ইত্যাদি। কাঁচামাল কেনার সময় পাঁচ থেকে ১৮% হারে জিএসটি দিতে হচ্ছে উৎপাদকদের। কিন্তু সেই কর তাঁরা ‘ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট’ হিসেবে সরকারের কাছ থেকে দাবি করতে পারছেন না। কারণ, উৎপাদিত সামগ্রী ন্যাপকিন এখন করমুক্ত। করমুক্ত কোনও পণ্যের উপরে আগের স্তরে দেওয়া জিএসটি দাবি করা যায় না। ফলে কাঁচামালের উপরে জিএসটি-র বোঝা চাপায় ছোট ছোট ব্যবসায়ীর পুঁজিতে টান পড়তে শুরু করেছে। গ্রামে গ্রামে যে-প্যাড আন্দোলন শুরু হয়েছে, এর পরিণামে তা ধাক্কা খেতে পারে বলে মনে করছেন অর্থ দফতরেরই একাংশ।

পুরুলিয়ার জয়পুর সমবায় সমিতির অধীনে শতাধিক স্বরোজগার দল স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি করে। মাসে প্রায় ২৫ হাজার প্যাড তৈরি হয়। সমিতির ম্যানেজার সুবীর হাজরা বলেন, ‘‘বাজারে বড় ব্র্যান্ডের প্রতিটি ন্যাপকিনের দাম পড়ে ১৮-২০ টাকা। আমরা ছ’টির প্যাকেট বিক্রি করি ১৮ টাকায়। প্রতিটি প্যাডের উৎপাদন খরচ এখন ২.২০ টাকা। ৩০-৪০ পয়সা লাভে তা বিক্রি করা হয়। এখন কাঁচামালের উপরে আর জিএসটি পাওয়া যাবে না। ফলে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।’’

দক্ষিণ দিনাজপুরে আলো, প্রগতি এবং কুশমন্ডি সমবায় সমিতিও গড়ে ৩০ হাজার করে প্যাড মাসে তৈরি করে। সমবায় দফতরের তরফেই তার তদারক করা হয়। জেলার সমবায় উন্নয়ন আধিকারিক শুভাশিস গুহ জানান, এখনও পুরনো প্যাড মজুত রয়েছে। তাই দাম বাড়াতে হয়নি। কাঁচামালের দাম বাড়লে পণ্যের দামও বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ‘‘স্বরোজগার দলের তৈরি প্যাডের গুণমান বেশ ভাল। ফলে দাম বাড়ালেও বিক্রি কমবে না বলেই আশা।’’ ন্যাপকিন তৈরির ছোট সংস্থা রয়েছে প্রিয়াঙ্কা জৈনের। তাঁর কথায়, ‘‘পণ্যের করছাড় চলে গিয়ে আসল লোকসান হল গ্রাহকদেরই। তা-ও আবার প্রান্তিক স্তরের গ্রামের মহিলাদের উপরে এই চাপ বাড়ল।’’ পুরনো মজুত শেষ হলে তাঁদেরও দাম বাড়াতে হবে বলে জানান প্রিয়াঙ্কা।

গ্রামে প্যাডের ব্যবহার বাড়াতে কর ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে করের বোঝা চাপছে গ্রামের মহিলাদের উপরেই। ‘‘এটাই আমাদের দেশের নীতি-প্রণেতাদের দূরদৃষ্টি,’’ এক জিএসটি-কর্তার আক্ষেপের মধ্যেও কটাক্ষের কাঁটা!