Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৯ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

আন্তর্জাতিক

Afghanistan Crisis: নাজিবুল্লাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল ল্যাম্পপোস্টে, পালিয়ে প্রাণে বাঁচলেন আশরফ গনি

নিজস্ব প্রতিবেদন
১৭ অগস্ট ২০২১ ১১:৩২
তালিবানের হাতে চার কোটি মানুষকে রেখে দেশ ছেড়েছেন আশরফ গনি। কিন্তু সেই সুযোগ হয়নি আফগানিস্তানের আর এক প্রেসিডেন্ট মহম্মদ নাজিবুল্লার। ঠিক তিন দশক আগে যখন কাবুল ঘিরে ধরেছিল মুজাহিদিন, সেই সময় প্রাণ বাঁচাতে দেশত্যাগের পরিকল্পনা করেছিলেন নাজিবুল্লাও। কিন্তু যাঁদের উপর বিশ্বাস করে জীবন বাজি রেখেছিলেন, তারাই বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁর সঙ্গে। শেষে সুসজ্জিত প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহ।

১৯৪৭ সালে পাকতিয়া প্রদেশের গারদেজ শহরে পাশতুন পরিবারে জন্ম নাজিবুল্লার। ছাত্রজীবনে জম্মু-কাশ্মীরের বারামুল্লার সেন্ট জোসেফ স্কুলেও বেশ কয়েক বছর কাটে তাঁর। মেধাবী নাজিবুল্লা পরে কাবুলে ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে কাবুল ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিবিএস পাশ করেন। সেই সময়ই আফগানিস্তান রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তার জন্য ছাত্রাবস্থাতেই দু’বার জেলও খাটেন।
Advertisement
পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব আফগানিস্তান (পিডিপিএ)-এর হাত ধরে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় নাজিবুল্লার। ১৯৭৮ সালে পিডিপিএ আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করলে, সরকারেও ঠাঁই পান নাজিবুল্লা। কিন্তু পরবর্তী কালে তাদের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয় তাঁর। দলের ছত্রছায়াতেই আলাদা শাখাও গঠন করেন তিনি। কিন্তু ইরানে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রদূত পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে। তার পর ইউরোপে নির্বাসনে চলে যান নাজিবুল্লা। ১৯৭৯ সালে সাবেক সোভিয়েত রাশিয়া আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিলে, প্রত্যাবর্তন ঘটে তাঁর।

সাবেক সোভিয়েত জমানায় আফগানিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা খাদানত-ই-এতলা’ত দৌলতি (খাদ)-এর প্রধান নিযুক্ত হন নাজিবুল্লা, যার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে। সেই সময় মার্ক্সবাদী এবং আফগান জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেন নাজিবুল্লা। ১৯৮৭ সালে তাঁকে আফগান মসনদে বসায় রাশিয়া। কিন্তু তাদের উপর নির্ভর করে যে সরকার চালানো যাবে না, তা বুঝে যান নাজিবুল্লা। তাই ক্ষমতায় এসেই দেশকে কমিউনিস্ট পূর্ববর্তী ‘রিপাবলিক অব আফগানিস্তান’ নাম ফিরিয়ে দেন। ইসলামকে প্রধান ধর্ম ঘোষণা করেন।
Advertisement
শুরুতে মুজাহিদিনকে পাশে পাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন নাজিবুল্লা। কিন্তু রাশিয়া এবং তাদের সমর্থিত প্রেসিডেন্ট নাজিবুল্লাকে উৎখাত করতে ১৯৯২ সালে কাবুল দখল করে মুজাহিদিন। সেই সময় কাবুল থেকে নাজিবুল্লাকে উদ্ধার করার চেষ্টা চালায় ভারত। তার জন্য আফগানিস্তানে তৎকালীন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের গাড়িতে তুলে, গোপনে নাজিবুল্লাকে দিল্লি নিয়ে আসার পরিকল্পনা ছিল দিল্লির। সেই মতো গাড়িতে উঠেও পড়েন নাজিবুল্লা। কিন্তু আফগান সেনার মার্শাল, ‘যুদ্ধবাজ’ হিসেবে পরিচিত যে আবদুল রশিদ দোস্তুমকে বিশ্বাস করেছিলেন নাজিবুল্লা, শেষ মুহূর্তে বিশ্বাসঘাতকতা করেন তিনি।

শোনা যায়, দোস্তুমকে টাকা জোগাতেন নাজিবুল্লা। কিন্তু ১৯৯১ সালে সাবেক সোভিয়েতের বিভাজনের পরে ভাঁড়ার খালি হয়ে আসে তাঁর। ওদিকে টাকার জোগান আটকে যাওয়ায় মুজাহিদিনের সঙ্গে তলে তলে যোগাযোগ শুরু করে দেন দোস্তুম। যে কারণে বিমানে চেপে ভারতে পালিয়ে আসার পরিকল্পনা থাকলেও, বিমানবন্দরে ঢোকার মুখে তাঁর গাড়ি আটকে দেন দোস্তুমের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিরাপত্তাকর্মীরা। বিমানবন্দরের রানওয়ে-তে তখন বিমান দাঁড়িয়ে। ভিতরে ভারত সরকারের প্রতিনিধি এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিনিধি দল তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন।

কিন্তু বিমানবন্দরে ঢুকতেই পারেননি নাজিবুল্লা। আবার প্রেসিডেন্ট ভবনেও ফিরে যাওয়ার উপায় ছিল না, কারণ সেটি তখন মুজাহিদিনের দখলে। অগত্যা গাড়ি ঘুরিয়ে কাবুলে রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন তিনি। সেখানেই পরবর্তী সাড়ে চার বছর স্বেচ্ছায় নির্বাসন কাটান তিনি। আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ এবং পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর মদতে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে মুজাহিদিনকে হারিয়ে কাবুলের দখল নেয় তালিবান। তাতে  রাষ্ট্রপুঞ্জের দফতরে আশ্রয় নেওয়া নাজিবুল্লা, তাঁর ভাই এবং তাঁদের দুই সহযোগী নতুন করে বিপাকে পড়েন।

সেই সময় মুজাহিদিন নেতা তথা তৎকালীন আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আহমদ শাহ মাসুদ এগিয়ে আসেন। নাজিবুল্লা এবং তাঁর সঙ্গীদের উত্তর দিক থেকে নিরাপদে করিডর তৈরি করে বার করে নিয়ে যেতে উদ্যোগী হন তিনি। কিন্তু তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন নাজিবুল্লা। তাঁর যুক্তি ছিল, পাশতুনরা তালিবানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এমন সময় পাশতুনদের সঙ্গে আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক যে তাজিক গোষ্ঠীর, তার সদস্য মাসুদের সাহায্য নিলে পরিস্থিতি অন্য দিকে মোড় নিতে পারে।

তাই নাজিবুল্লা, তাঁর ভাইকে ফেলেই সরে পড়ে মুজাহিদিন। দফতর খালি করে দেন রাষ্ট্রপুঞ্জের আধিকারিকরাও। এর পরেই ওই দফতরের দখল নেয় তালিবান। কূটনীতিবিদদের দাবি, তালিবান যোদ্ধারা যখন ওই দফতরে ঢুকছেন, সেই সময় এক আইএসআই আধিকারিকও সেখানে নাজিবুল্লার ভাগ্য নির্ধারণে যোগ দেন। কারণ মুজাহিদিনের সঙ্গে মিলে তাঁর সরকার ফেলতে পাকিস্তানের বড় ভূমিকা ছিল বলে বরাবরই অভিযোগ তুলে এসেছিলেন নাজিবুল্লা।

এর পরই, ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে কাবুলে প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে বিদ্যুতের খুঁটিতে বাঁধা অবস্থায় নাজিবুল্লার ক্ষতবিক্ষত দেহ ঝুলতে দেখা যায়। শোনা যায়, নাজিবুল্লা এবং তাঁর ভাইকে বেধড়ক মারধর করা হয়। জিপের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে ঘোরানো হয় শহরে। তার পর প্রথমে লিঙ্গচ্ছেদ করা হয় তাঁদের। শেষে গুলি করে মেরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

নাজিবুল্লার হত্যার মাধ্যমেই সেই প্রথম তালিবান নৃশংসতার সাক্ষী হয় গোটা বিশ্ব। এমনকি সৌদি আরব, যারা কি না তালিবানের মিত্র বলে পরিচিত, তারাও নাজিবুল্লা হত্যার তীব্র নিন্দা করে। তালিবানের আচরণ ইসলামবিরোধী বলেও মন্তব্য করে তারা।

২০১৬ সালে নাজিবুল্লার ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সরাসরি তাঁর মৃত্যুর জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে আফগান রিসার্চ সেন্টার। পাকিস্তানই আসলে নাজিবুল্লাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে বলে অভিযোগ তোলে তারা। ২০২০ সলের ১ জুন গারদেজ-এ নাজিবুল্লার সমাধিস্থলে গিয়ে প্রাক্তন প্রেসিডেন্টকে শ্রদ্ধা জানান আফগানিস্তানের সদ্য প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হামিদুল্লা মোহিব। নাজিবুল্লার নামে সৌধ গড়ার প্রস্তাব দেন তিনি।

কিন্তু নাজিবুল্লার স্ত্রী ফতানা নাজিব ও পরিবারের লোকজন সাফ জানিয়ে দেন, আগে নাজিবুল্লার হত্যার তদন্ত করুক সরকার। দোষীদের খুঁজে বার করুক। তার পর সৌধ নির্মাণ হবে। তার এক বছর কাটার আগেই তালিবানের পুনরুত্থান শুরু হয়ে যায় আফগানিস্তানে। আশরফ গনির মতো হামিদুল্লা নিজেও আফগানিস্তান ছেড়ে পালিয়েছেন।