Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৬ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

আন্তর্জাতিক

বধির অবস্থাতেও তৈরি করতেন সুর, বহু প্রেমিকা ও গণিকালয়ের পরেও বেঠোভেন ছিলেন একাকিত্বের উপাসক

নিজস্ব প্রতিবেদন
১৭ ডিসেম্বর ২০২০ ১২:৩০
‘জিনিয়াস’ বিশেষণ অপেক্ষা করে থাকে তাঁর মতো বিস্ময় প্রতিভার জন্যই। তিনি সুরের জাদুতে মুগ্ধ করে গিয়েছেন বিশ্বকে। অথচ তিনি নিজেই জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় ছিলেন বধির। লুডউইগ ভ্যান বেঠোভেনের জীবনের প্রতি বাঁকের নোটেশন আজও অধরা।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সঙ্গীত প্রবাহিত ছিল বেঠোভেন পরিবারের ধমনীতে। অষ্টাদশ শতকে অস্ট্রিয়ার মেকেলেন থেকে জার্মানির বন শহরে এসে থাকতে শুরু করেন ২১ বছরের মিউজিশিয়ান লুডউইগ ভ্যান বেঠোভেন। তাঁর ছেলে জোহান ভ্যান বেঠোভেনের পেশাও ছিল সঙ্গীত। কিন্তু সঙ্গীতকার জোহান ছিলেন হদ্দ মাতাল।
Advertisement
জোহান এবং মারিয়ার ছন্নছাড়া সংসারে এক এক করে এসেছিল মোট ৭ জন সন্তান। তাদের মধ্যে মেজো এবং ছোট দু’টি ছেলে ছাড়া বাকি ৪ জনেরই মৃত্যু হয়েছিল শৈশবে। মেজো ছেলের নামকরণ করা হয়েছিল ঠাকুরদার নাম ‘লুডউইগ ভ্যান বেঠোভেন’ অনুসারেই।

তাঁর জন্মের তারিখ স্পষ্ট করে জানা যায় না। শুধু স্থানীয় গির্জার নথি বলে, বেঠোভেন পরিবারের মধ্যম পুত্রটিকে ব্যাপ্টাইজ করা হয়েছিল ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ডিসেম্বর। সেখানে সে সময় প্রচলিত রীতি ছিল জন্মের পরের দিনই নবজাতককে ব্যাপ্টাইজ করা। সে দিক থেকে ধরে নেওয়া হয় শিশুর জন্মের তারিখ ছিল ১৬ ডিসেম্বর, ১৭৭০। তবে এই তথ্যেরও কোনও প্রামাণ্য নথি নেই।
Advertisement
নিতান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারটি তখন স্বপ্নেও ভাবেনি এক দিন এই পদবি অমর হয়ে থাকবে তাঁদের দ্বিতীয় পুত্রের সুরসৃষ্টির জাদুতে। এতটা বুঝতে না পারলেও মেজো ছেলেটির যে গানবাজনায় হাত আছে, বুঝেছিলেন মাতাল জোহান। তিনি নিজেই তাকে শেখাতেন পিয়ানো বাজানো।

বাবার কাছেই সঙ্গীতশিক্ষার হাতেখড়ি বেঠোভেনের। কিন্তু শৈশবে এই শিক্ষণ পর্ব তাঁর কাছে ছিল যন্ত্রণাবিদ্ধ। সুর তুলতে সামান্য ভুল করলেই রগচটা বাবার হাতে জুটত বেদম মার। কয়েক বছর যেতে না যেতেই বেঠোভেনের স্কুল যাওয়া বন্ধ করিয়ে দিলেন তাঁর বাবা। পরিবর্তে তাঁকে ব্যবহার করতে লাগলেন উপার্জনের কাজে।

৫ বছর বয়স থেকে বেঠোভেনের সঙ্গীতশিক্ষার পর্ব পৌঁছল বাড়ির বাইরেও। তাঁর প্রথম সঙ্গীতশিক্ষক ছিলেন অর্গ্যানবাদক গিল ভ্যান ডেন ইডেন। পারিবারিক বন্ধু টোবিয়াস ফ্রেডরিখ ফেইফারের কাছে শিখতেন কি বোর্ড বাজানো। এ ছাড়া আরও ২ জনের কাছে চলত বেহালাবাদন শিক্ষা।

এঁদের মধ্যে শিক্ষক ফেইফারের ইনসমনিয়া ছিল। তিনি গভীর রাতে এসে ছোট্ট বেঠোভেনকে ঘুম থেকে তুলে শেখাতে শুরু করতেন। কারণ বেঠোভেনের বাবা পণ করেছিলেন তাঁর ছেলেকেও লিওপোল্ড মোজার্টের মতো বিস্ময়প্রতিভা হিসেবে প্রমাণ করবেন।

মোজার্ট এবং বেঠোভেনের বয়সের ব্যবধান ৫৩ বছর। বেঠোভেনের ১৫ বছর বয়সে মৃত্যু হয় মোজার্টের। তাঁর কীর্তিকে ছাপিয়ে যাবে বেঠোভেন— এটাই ছিল জোহানের স্বপ্ন। বাবার স্বপ্নপূরণের কারিগর হতে গিয়ে বেঠোভেনকে হারাতে হয়েছিল স্বাভাবিক শৈশব।

পরবর্তীতে বিখ্যাত জার্মান সুরকার ক্রিস্টিয়ান গোটলব নেফের কাছে সুরসাধনা করেছিলেন তিনি। জীবনের প্রথম চাকরিও শিক্ষক নেফের কাছেই। প্রথমে বিনা পারিশ্রমিকে, তার পর বেতন-সহ।

১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে প্রয়াত হন বেঠোভেনের মা। তার ২ বছর পরে অতিরিক্ত নেশার জন্য চাকরি হারান তাঁর বাবা। সাংসারিক অস্থিরতায় বিক্ষিপ্ত জীবন ভাল লাগছিল না বেঠোভেনের। মাকে হারানোর ৫ বছর পরে বন ছেড়ে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় চলে যান বেঠোভেন। ফিরে যান পারিবারিক শিকড়ের দেশেই। নতুন জায়গায় পৌঁছনর কয়েক দিন পরে বাবার মৃত্যুসংবাদ পান।

সুরকার হিসেবে কাজ করার দিকে প্রথমে আগ্রহী ছিলেন না বেঠোভেন। বরং তাঁর মন ছিল শিখে যাওয়ায়। সেই যে শৈশবে কঠোর অনুশীলন পর্ব শুরু হয়েছিল, সেই শৃঙ্খলেই ডুবে ছিলেন বহু দিন। তত দিনে তাঁকে মোজার্টের উত্তরসূরি ভাবা শুরু হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মধ্যে মোজার্টের প্রভাবও ছিল গভীর।

১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম নিজের অনুষ্ঠানে আত্মপ্রকাশ করেন বেঠোভেন। তার পর একের পর এক মূর্ছনার জন্ম দিতে থাকেন তিনি। তবে স্বাভাবিক নিয়মেই স্রষ্টার জীবন একই খাতে প্রবাহিত হয়নি। মাঝে মাঝেই ভাটা পড়েছে সৃষ্টিসুখের উল্লাসে। আবার কখনও কখনও সুরের অমৃতবারি ছিল অবারিত।

প্রথম জীবনে তিনি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের গুণমুগ্ধ ছিলেন। ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করার পরে তাঁর উদ্দেশে ‘সিম্ফনি থ্রি’ রচনা করেছিলেন বেঠোফেন। কিন্তু পরে মোহভঙ্গ হওয়ায় তিনি সিম্ফনির নামকরণ করেন ‘এরোইকা’।

তিনি নিজে কোনও দিন বিয়ে করেননি। ছোট ভাই কাসপারের ছেলে কার্ল-কে নিজের উত্তরসূরি বলে মনে করতেন। কাসপারের মৃত্যুর পরে ভাইপোকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু তীব্র বাধা দেন কাসপারের স্ত্রী জোহান্না। দুই পক্ষের আইনি বিবাদ ছিল তীব্র।

শেষ অবধি আইনি লড়াইয়ে যুগ্ম ভাবে জয়ী হন দুই পক্ষ। কার্লের যৌথ অভিভাবক হন তাঁর মা এবং জেঠু। বেঠোভেন নিজে স্কুলজীবন পাননি। তাই ভাইপোর পড়াশোনা নিয়ে প্রথম থেকেই সচেষ্ট ছিলেন। কোনওদিন সঙ্গীতশিক্ষণ চাপিয়ে দেননি তাঁর উপর।

কিন্তু পরবর্তীতে কার্লের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন বেঠোভেন। মনোমালিন্যের পরে অবশ্য মত দিয়েছিলেন। জেঠুর মৃত্যুসংবাদও কার্ল পেয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থাতেই। এবং তার পর জানতে পারেন নিজের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি সব তাঁকেই দিয়ে গিয়েছেন বিশ্বখ্যাত সুরস্রষ্টা।

বেঠোভেন ছিলেন একাকিত্বের উপাসক। কিন্তু প্রেম তাঁকে ছেড়ে যায়নি। বার বার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন। কিন্তু কারও সঙ্গেই নিজের সম্পর্ককে কোনও সংজ্ঞা দিতে চাননি। বেঠোভেনের প্রেম ও প্রেয়সীদের নিয়ে জানতে জীবনীকার ও গবেষকদের ভরসা তাঁর লেখা চিঠি। কিন্তু স্কুলজীবন অকালমৃত হওয়ার কারণে তাঁর হাতের লেখা ছিল দুর্বোধ্য। অনেক সময় তাঁর স্বাক্ষর বুঝতেই নাকাল হয়ে গিয়েছেন ইতিহাসবিদরা।

১৮১২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ১০ পৃষ্ঠার প্রেমপত্র লিখেছিলেন তাঁর ‘শাশ্বত প্রেয়সী’-র উদ্দেশে। কিন্তু কোনও দিন সেই চিঠি প্রেরকের কাছে পৌঁছয়নি। কে ছিলেন তাঁর সেই ‘ইমমর্টাল বিলাভেড’? ভেসে ওঠে অনেক অভিজাত সুন্দরীর নাম। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন অ্যান্টোনি ব্রেন্টানো, জুলি গুইকিয়ার্ডি, থেরেস ম্যালফাট্টি এবং জোসেফিন ব্রুন্সভিক।

এঁরা নানা সময়ে এসেছেন বেঠোভেনের জীবনে। তাঁদের মধ্যে গুইকিয়ার্ডির সঙ্গে বেঠোভেনের চটুল ফ্লার্টের সম্পর্ক অজানা নয়। তার বেশি এগোয়নি সেই সম্পর্ক। পরে গুইকিয়ার্ডি বিয়ে করেন আর এক সুরকার ভন গ্যালেনবার্গকে। জীবনীকারকে বেঠোভেন বলেছিলেন, তিনি নিজেই প্রত্যাখ্যান করেছিলেন গুইকিয়ার্ডির প্রণয়।

অনেক গবেষকের মত বেঠোভেনের সেই অজ্ঞাতপরিচয় প্রেমিকা ছিলেন অভিজাত ব্রুন্সভিক পরিবারের কন্যা জোসেফিন। সামাজিক পরিচয়ে বিস্তর বৈষম্যের জন্য তাঁদের বিয়ে হয়নি। জোসেফিন পরে বিয়ে করেছিলেন কাউন্ট পরিবারে। স্বামীর মৃত্যুর পরে আরও ২ বার ভিন্ন প্রেমিকের সঙ্গে (বেঠোফেন নন) সম্পর্কে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। বিয়ে এবং বিয়ের বাইরে দু’টি সম্পর্ক থেকে মোট ৮ জন সন্তানের মা হয়েছিলেন তিনি।

তবে জোসেফিনের জীবনের শেষ দিন অবধি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বেঠোফেনের। প্রসঙ্গত বেঠোফেন ছিলেন তাঁর কিশোরজীবনের পিয়ানো শিক্ষক। পরবর্তীতেও শিক্ষকদের প্রতি অনুরক্ত হন জোসেফিন।

ব্যক্তিগত চিকিৎসকের ভাইঝি মালফাট্টির প্রেমে যখন পড়েছিলেন তখন বেঠোফেনের বয়স ৪০ বছর। উল্টো দিকে মালফাট্টি ১৯ বছরের কিশোরী। তিনি অবশ্য পত্রপাঠ প্রত্যাখ্যান করেছিলে স্রষ্টার প্রেমের প্রস্তাব।

অ্যান্টনি ব্রেন্টানোর সঙ্গে যখন বেঠোফেনের আলাপ হয়েছিল, তখন অ্যান্টনি ফ্রানজ ব্রেন্টানোর স্ত্রী। কিন্তু তাতে বেঠোফেনের সঙ্গে তাঁর প্রেম বাধা পায়নি। ১৮১১ থেকে ১৮১২ অবধি তিনিই ছিলেন স্রষ্টার ঘনিষ্ঠতম, এ কথা স্বীকার করেছেন বহু গবেষকই। এর পর স্বামীর সঙ্গে ভিয়েনা ছেড়ে চলে যান অ্যান্টনি। আর কোনও দিন দেখা করেননি বেঠোভেনের সঙ্গে। তবে পরে বার বার তাঁর স্মৃতিকথায় ফিরে এসেছেন বেঠোভেন।

১৮১২ খ্রিস্টাব্দের পর বেঠোভেনের জীবনবৃত্তে কোনও নারীর নাম পাওয়া যায় না। তবে তাঁর সৃষ্টিতে প্রভাব ফেলেছেন প্রেয়সীরা। তাঁদের উদ্দেশেও তিনি সুরসৃষ্টি করেছেন। জীবনের মধ্য পর্বে তিনি গণিকালয়ে মাঝে মাঝে পা রাখতেন, সে তথ্যও পেয়েছেন বেঠোফেন-গবেষকরা।

১৮২৬ থেকে ক্রমে তাঁর শরীর ভাঙতে থাকে। বছর খানেক শয্যাশায়ী থাকার পরে প্রয়াত হন ১৮২৭ এর ২৬ মার্চ। মৃত্যুর সময় পাশে ছিলেন শুধু ঘনিষ্ঠ বন্ধু আনসেল্ম হাটেনব্রেনার। পরে তিনি বলেছিলেন, বিকেল ৫টার সময় বাইরে এক বার বাজ পড়ার শব্দে চোখ খুলেছিলেন বেঠোভেন। ক্ষণিকের জন্য উপরে উঠেছিল ডান হাত। কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পরে চোখ বন্ধ করে ফেলেন। আর সেই চোখের পাতা খোলেনি।

ময়নাতদন্তের রিপোর্ট থেকে জানা গিয়েছিল, বেঠোফেনের মৃত্যুর কারণ ছিল সিরোসিস অব লিভার। অতিরিক্ত সুরাপান তাঁকে তিল তিল করে এগিয়ে দিয়েছিল মৃত্যুর কাছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনও ধোয়াঁশা রয়েছে। মৃত্যুর ৩৬ বছর পরে সমাধি থেকে তাঁর দেহাবশেষ তুলে পরীক্ষা করা হয়। আধুনিক গবেষকদের মতে, সিরোসিস অব লিভারের পাশাপাশি তিনি সিফিলিসেরও শিকার ছিলেন।

তাঁর জীবনের বেশির ভাগ দিকই উন্মোচিত হয়েছে মৃত্যুর পরে। সেগুলির মধ্যে অন্যতম একটি দিক হল তাঁর বধিরতা। ৩০ বছর বয়সের আগে থেকেই শ্রবণক্ষমতা হারাতে থাকেন তিনি। তাঁর নিজের কথায়, এক পিয়োনাবাদকের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার জেরে তিনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন।

তার পর থেকেই একটু একটু করে বধির হয়ে যান তিনি। ‘টিনাইটাস’ রোগের শিকার হন তিনি। অর্থাৎ কানের কাছে ক্রমাগত ঝিঁঝিঁপোকার বাদ্য শুনতে পেতেন । চেষ্টা সত্ত্বেও এই রোগের প্রতিকার হয়নি। বধির অবস্থাতেই শাশ্বত সুরের মূর্ছনা উপহার দিয়ে গিয়েছেন তিনি।

নিজের তৈরি স্বর্গীয় সুরের বড় অংশ পৌঁছয়নি তাঁর কাছেই। কিন্তু সেই সিম্ফনি মধুবর্ষণ করে চলেছে বিশ্ববাসীর কানে। জিনিয়াসের জন্মের ২৫০ বছর পরেও।   (ছবি: আই স্টক, শাটারস্টক, আর্কাইভ, সোশ্যাল মিডিয়া)