সরকার-বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ইরান। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েক বার ক্ষোভ-বিক্ষোভের মুখে পড়েছে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের সরকার। কিন্তু এ বারে রাজধানী তেহরানের সীমা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষোভের আঁচ। রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার মানুষ। এ দিন ইসফাহান শহরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং’ (আইআরআইবি) ভবনে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর শহর বান্দার আব্বাসের রাস্তায় নামেন হাজার হাজার মানুষ। বিদ্রোহ দমনে খামতি রাখছে না সরকারও। এখনও পর্যন্ত যা তথ্য মিলেছে, তাতে অন্তত ৪২ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বাচ্চাও রয়েছে। ২২৭০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলি জানিয়েছে, এই সংখ্যা আরও অনেক বাড়বে এবং সরকার সেই তথ্য কিছুতেই বাইরে আসতে দেবে না।
আন্দোলনের আঁচ বাড়তেই রাতারাতি দেশজুড়ে ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউট করে দিয়েছে প্রশাসন। দেশের বাইরে টেলিফোন-যোগাযোগও বন্ধ। যে গতিতে সরকার এই কাজ করেছে, তাতে স্পষ্ট দুশ্চিন্তায় সরকারও। রাস্তায় সেনাবাহিনী নামিয়ে দেওয়ার পরেও সাধারণ মানুষ ভীত নন। প্রতিবাদ জারি রয়েছে। ৮৬ বছর বয়সি ইরানের সর্বোচ্চ শাসক খামেনেই এ দিন টেলিভিশন-বার্তায় বলেন, ‘‘সকলের জানা উচিত, কয়েকশো হাজার মানুষের রক্তের বিনিময়ে এই ইসলামিক রিপাবলিক গঠিত হয়েছে। কিছু বিশ্বাসঘাতকের জন্য এই দেশ ভাঙবে না।’’ তিনি আরও জানান, কিছু মানুষ বিদেশি শক্তির ভাড়াটে গুন্ডার মতো কাজ করছেন। তাঁদের বরদাস্ত করা হবে না। নাম না করে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে আঙুল তুলেছেন তিনি। খামেনেই বলেন, ‘‘কিছু মানুষ নিজের দেশের রাস্তা ভেঙে অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে খুশি করছেন।’’ তাঁর খোঁচাতে স্পষ্ট, এই প্রেসিডেন্ট আর কেউ নন, ট্রাম্প। দর্শকদের উদ্দেশে তিনি বলেন— ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’।
এই আন্দোলনের শুরু গত বছর ২৮ ডিসেম্বর। ইরানি মুদ্রার দাম ব্যাপক ভাবে কমে যাওয়া, মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিক্ষোভ দেখানো শুরু করেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু ধীরে ধীরে এতে রাজনীতির রঙ মিশেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, শাসনক্ষমতায় পরিবর্তন। তাঁরা ইসলামিক রিপাবলিক ব্যবস্থার শেষ চান। অঞ্চল-জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ দেশের অন্তত ১০০ শহরে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। স্লোগান উঠেছে বেকারত্ব ও জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে। কড়া হাতে বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ রয়েছে বাহিনীর কাছে। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে জায়গায় জায়গায় কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হচ্ছে। গুলি, গণহারে গ্রেফতারি কিছুই বাদ রাখছে না তারা।
পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলি জানাচ্ছে, ইরান সরকার ইন্টারনেট ব্ল্যাক আউট করে দেওয়ায় বিদ্রোহ কিংবা তা নিষ্ঠুর ভাবে দমনের ছবি-ভিডিয়ো বাইরের দুনিয়ার সামনে আসছে না। এটাই একমাত্র হাতিয়ার, যা সরকারের হাতে রয়েছে। এর পাশাপাশি মানুষকে শান্ত করতে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছে। তবে তাতে সামগ্রিক ক্ষোভ মেটার নয়।
ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, তারা ইরানের পরিস্থিতির উপরে নজর রাখছে। ইরানে বসবাসকারী ভারতীয়দের সাবধানে থাকতে বলা হয়েছে। তবে এখনই চিন্তা করার মতো কিছু হয়নি বলে মনে করছে দিল্লি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)