E-Paper

তালিবানি হামলা থেকে বেঁচে ফিরে এভারেস্ট জয় আফগানি ‘রিভার’-এর

দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানের গজনি জেলার বাসিন্দা জাকিয়া ওরফে রিভারের পাহাড়-প্রেম মেয়েবেলা থেকেই। বাড়িতে বাবা-মা, পাঁচ বোন, দুই ভাই। স্কুল যেতে দু’ঘণ্টা পাহাড় চড়তে হত। বাড়ি থেকে পালিয়ে অনেক সময় পাহাড়ই ছিল শান্তির জায়গা। সে সময়েই প্রথম শোনা এভারেস্টের নাম।

স্বাতী মল্লিক

শেষ আপডেট: ৩০ মে ২০২৬ ০৭:৫২
রিভার আহমেদ।

রিভার আহমেদ।

কাবুলগামী বাসে উঠেই গুলি চালাতে শুরু করেছিল তালিবান। বাসে সে দিন ১৫-১৬ জন যাত্রী। তাঁদের মধ্যে একজনই মাত্র মেয়ে— বছর আঠারোর জ়াকিয়া আহমেদ ওরফে রিভার। সাংবাদিকতা নিয়ে পড়তে চেয়ে বাসে চেপে বসেছেন সে দিন। চোখের সামনে তখন সাক্ষাৎ মৃত্যু। বলছেন, ‘‘দ্রুত চিন্তা করি, কী করলে নিজেকে বাঁচাতে পারব। সে দিন ঋতুস্রাবের কারণে বেশি রক্তপাত হচ্ছিল। সেই রক্তই আমার প্রাণ বাঁচিয়ে দেয়।’’ নিজের শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া সেই রক্ত মুখে-গায়ে মেখে নিয়েই মড়ার মতো পড়েছিলেন তিনি। বন্দুকধারী এক তালিবান কাছে এসে তাঁকে মৃত ভেবে চলে গিয়েছিল। সেই হামলায় মৃত্যু হয় ১২ জনের। বেঁচে গিয়েছিলেন ওই তরুণী-সহতিন জন।

২০১৪ সালের সেই ঘটনা বদলে দিয়েছে রিভার আহমেদের জীবন-পথ। মেয়েদের কথা বলার ‘অপরাধে’ তালিবানি হুমকির মুখে পড়ে দেশান্তরী হতে হয়েছে তাঁকে। নতুন দেশে নতুন ভাবে বাঁচতে বদলেছেন নিজের নামও। কিন্তু হাল ছাড়েননি। লড়াইয়ের ময়দান হিসেবে বেছে নিয়েছেন পাহাড়কে। এ বছর ২১ মে প্রথম আফগানি মহিলা হিসেবে বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের শীর্ষে পৌঁছে ইতিহাস তৈরি করেছেন বছর তিরিশের রিভার। যে দেশকে পিছনে ফেলে এসেছেন তিনি, সেই আফগানিস্তানের মেয়েদের শিক্ষার অধিকারের দাবি বুকে নিয়েই এভারেস্টের শীর্ষ ছুঁয়েছেন। ‘‘শৃঙ্গের পথে জনজট দেখে ভয় পেয়েছিলাম। তবে শৃঙ্গে পৌঁছে মনে হয়েছিল, আমি তো পাহাড়েরই মেয়ে। তাই আমার যদি এভারেস্টে চড়ার ক্ষমতা থাকে, তা হলে আমার দেশের মেয়েদেরও এই অন্ধকার সময় দাঁতে দাঁত চেপে কাটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। আজ আমার দেশে মেয়েদের শিক্ষার অধিকার নেই, চাকরি করার অধিকার নেই, একা রাস্তায় বেরনোর অধিকারটুকুও নেই। তবু তাঁদের বলতে চাই যে, হাল ছেড়ো না। এক দিন একসঙ্গে আমরা এই অন্ধকার সময় কাটিয়ে উঠব। কী ভাবে জানা নেই, কিন্তু একটা পথখুঁজে নেবই।’’ প্রত্যয়ী শোনায় রিভারের গলা।

দক্ষিণ-পূর্ব আফগানিস্তানের গজনি জেলার বাসিন্দা জাকিয়া ওরফে রিভারের পাহাড়-প্রেম মেয়েবেলা থেকেই। বাড়িতে বাবা-মা, পাঁচ বোন, দুই ভাই। স্কুল যেতে দু’ঘণ্টা পাহাড় চড়তে হত। বাড়ি থেকে পালিয়ে অনেক সময় পাহাড়ই ছিল শান্তির জায়গা। সে সময়েই প্রথম শোনা এভারেস্টের নাম। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য কাবুল যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা তো আফগানি মেয়েদের বিয়ের বয়স! বাবা প্রথমে কিছুতেই রাজি ছিলেন না। ফলে রোজ রাতে কাঁদতেন। এক সময়ে দাঁতের ডাক্তারি পড়ার শর্তে মেয়েকে কাবুলগামী বাসের টিকিট কেটে দেন বাবা। যদিও রিভার মনে মনে জানতেন, কাবুল পৌঁছে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়বেন তিনি।

কাঠমান্ডু থেকে ফোনে রিভার বলছেন, ‘‘সে দিনের ওই হামলার ঘটনার পরে বাবা আমার জন্য গর্বিত ছিলেন। তার পরে আর আটকাননি। কাবুলে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ে ছদ্মনামে মেয়েদের কথা লিখতে শুরু করি। রেডিয়ো সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তবু পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়। তালিবানি হুমকি পেতে শুরু করি, ২০১৯ সালে সপরিবার দেশ ছেড়ে দিল্লি আসতে বাধ্য হই।’’ টানা তিন বছর দিল্লিতে থাকার পরে ২০২২ সালে সপরিবার অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দেন তাঁরা। তত দিনে আফগানিস্তান থেকে সরে গিয়েছে আমেরিকান সেনা, ফের শুরু হয়ে গিয়েছে তালিবান রাজত্ব।

নতুন দেশে, নতুন সংস্কৃতিকে আপন করতে কিছুটা সময় লেগেছে তাঁদের। নতুন ভাবে শুরু করতে চেয়ে জ়াকিয়া থেকে হয়ে ওঠেন ‘রিভার’। শেখেন ইংরেজি। ইতিমধ্যে তাঁর এক ভাই আত্মহত্যা করেন। যদিও সে নিয়ে এখন আর বেশি কথা বলতে চান না রিভার। লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলবোর্নের একটি রেডিয়ো স্টেশনেও আংশিক সময়ের কাজ করেন। ফলে পরিবার শহরতলিতে থাকলেও মেলবোর্ন শহরে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে থাকেন ওই তরুণী।

গত বছর জুলাইয়ে বন্ধুবান্ধব ও বোনেদের সঙ্গে সিডনি হারবার ব্রিজে ঘুরতে গিয়ে তাঁর মনে হয়, এভারেস্ট আরোহণের এটাই প্রশস্ত সময়। পরের দিনই অস্ট্রেলিয়ার একটি পর্বতারোহণ সংস্থাকে খুঁজে বার করে এভারেস্ট অভিযানের পরিকল্পনা শুরু করেন। আংশিক সময়ের কাজ করে, ক্রাউড ফান্ডিং করে, সংস্থার থেকে ঋণ করে এই অভিযানের অর্থ সংগ্রহ করে চলেছেন। আয়োজক সংস্থাকে এখনও অর্ধেক অর্থ দেওয়া বাকি। তবে প্রাথমিক বাধা ছিলই। অদম্য রিভার বলছেন, “এভারেস্ট সম্পর্কে মায়ের ধারণা নেই। তাই প্রথমে শুনে বলেছিলেন, ‘ওকে, যাও।’ পরে ভাই-বোনেরা মাকে বুঝিয়ে বললে মা-বাবা দু’জনেই আপত্তি করেন। কিন্তু বেসক্যাম্প যখন পৌঁছে গেলাম, তখন বুঝেছেন আমাকে থামানো যাবে না। শৃঙ্গ ছোঁয়ার খবরে তাঁরা খুব খুশি।”

তবে এখানেই থামতে চান না রিভার। পরবর্তী লক্ষ্য ১৪টি ৮ হাজারি শৃঙ্গে অভিযান। বলছেন, ‘‘ছেলেবেলায় পড়াশোনার জন্য পাহাড় চড়তাম। আজ দেশের মেয়েদের লেখাপড়ার দাবিতেপাহাড়ে চড়তে চাই। দেশের মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করতে তাঁদের বলতে চাই, এই পথে আমিও অনেক বাধা পাচ্ছি, বিপদেপড়ছি। কিন্তু হাল ছেড়ে দিচ্ছি না। তাই তাঁরাও যেন মনোবল না হারান।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Mountaineer Mount Everest

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy