পশ্চিম এশিয়ার অশান্তি ছায়া ফেলল ভারতের আবাসন বাজারে। পরিসংখ্যানে প্রকাশ, গত প্রায় দেড় মাস ধরে চলা যুদ্ধের কারণে আবাসন তৈরির খরচ ৫-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। নির্মাতাদের অবশ্য দাবি, এখনই দাম বাড়ছে না। সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের মতে, জ্বালানির চড়া দাম ও মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ফ্ল্যাট-বাড়ির চাহিদা কমার উদ্বেগ মাথাচাড়া দিয়েছে। মার্চে বিক্রি কিছুটা কমেওছে। এপ্রিল নিয়ে বেড়েছে চিন্তা। তাই হয়তো আপাতত বাড়ানো হচ্ছে না দাম। তবে আগামী দিনেও যে বাড়বে না, এমন কথা বলা যাচ্ছে না। ফলে আশঙ্কা থাকছেই। অন্য অংশের দাবি, ইতিমধ্যেই দাম বাড়তে শুরু করেছে। ভবিষ্যতের তার গতি চড়তে পারে।
দেশের প্রধান আটটি শহরকে নিয়ে আবাসন ক্ষেত্রের উপদেষ্টা নাইট ফ্র্যাঙ্কের করা সমীক্ষায় স্পষ্ট, গত জানুয়ারি-মার্চে সব মিলিয়ে আবাসন বিক্রি আগের বছরের ওই তিন মাসের তুলনায় ৪% কমেছে। তবে শহর ধরে বিচার করলে কলকাতা-সহ চারটিতে বিক্রি ঊর্ধ্বমুখী। সংস্থার চেয়ারম্যান শিশির বৈজল বলেন, ‘‘বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চাহিদা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। সংঘাত কোন দিকে গড়ায় তার উপর সবটা নির্ভর করছে।’’ রাজ্যে নির্মাতাদের সংগঠন ক্রেডাই ওয়েস্ট বেঙ্গলের সভাপতি সুশীল মোহতার কথায়, ‘‘বেশ কিছু কাঁচামালের দাম বেড়েছে প্রায় ৫-৭ শতাংশ। তবু এখনই দাম বাড়ানোর পথে হাঁটছি না। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ দিন চললে এই পথ ছাড়া অন্য বিকল্প থাকবে না।’’
অম্বুজা নেওটিয়া গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান হর্ষবর্ধন নেওটিয়া দাবি করছেন, “আগামী কিছু দিন আবাসন নির্মাণের খরচ খানিকটা বেড়ে থাকবে। তবে আমরা নজর রাখছি। বিকল্প ব্যবস্থার কথাও মাথায় রাখা হচ্ছে।” পূর্তি রিয়েলটির কর্ণধার মহেশ আগরওয়ালও জানান, পরিস্থিতি কোন দিকে যায় খেয়াল রাখা হচ্ছে। নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়লেও এখনই ক্রেতাদের উপর তার বোঝা চাপানো হচ্ছে না। আর এক আবাসন উপদেষ্টা অ্যানারকের কর্তা অনুজ পুরির মতে, মার্চে গোটা দেশে ফ্ল্যাট-বাড়ি বিক্রিতে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আগামী দিনে সমস্যা বাড়বে কি না, সেটাই প্রশ্ন।
নাইট ফ্র্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চে কলকাতায় আবাসন বিকিয়েছে ৪০৪৩টি। সারা দেশে সংখ্যাটা প্রায় ৮৫ হাজার। দিল্লি এবং পুণেতে বিক্রি কমেছে ১১%, মুম্বইতেও প্রায় ৬%। জৈন গোষ্ঠীর এমডি ঋষি জৈন বলেন, ‘‘বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে আমরা সিমেন্ট, ইস্পাত, বিভিন্ন প্লাস্টিকের পণ্যের জন্য বছরের শুরুতেই চুক্তি করে ফেলি। তাই এখন দাম বৃদ্ধি এড়াতে পারছি। আপাতত ক্রেতাদের খরচ বাড়ছে না। তবে নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে তা ৩-৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা।’’
নির্মাণ বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই বক্তব্য, চলতি ত্রৈমাসিক অর্থাৎ এপ্রিল-জুনের চূড়ান্ত হিসেবে আবাসনের মূল্যবৃদ্ধি ধরা পড়তে পারে। আগামী ত্রৈমাসিক, অর্থাৎ জুলাই-সেপ্টেম্বরেও হয়তো তা স্পষ্ট হবে। এমনকি সংস্থাগুলি যা-ই বলুক না কেন, নির্মাণের বেড়ে যাওয়া খরচ নানা ভাবে ঘুরেফিরে ক্রেতাদের ঘাড়ের
উপরেই চাপবে। কেউ কেউ ইতিমধ্যেই ধীরে ধীরে তা চাপাতে শুরু করেছেন, দাবি একাংশের। নাইট ফ্র্যাঙ্ক জানিয়েছে, গত এক বছরে শহরে আবাসনের দাম বেড়েছে ৩%। জানুয়ারি-মার্চে কলকাতায় প্রতি বর্গফুট ছিল ৫৯৩৭ টাকা। চলতি বছরের শেষের দিকে তা বেড়ে ৬২০০-৬৩০০ টাকা হতে পারে। ইডেন রিয়েলটির কর্তা কুমার সাত্যকির বার্তা, ‘‘আপাতত বর্ধিত খরচ নির্মাতা বা আবাসন সংস্থাই বইছে। ভবিষ্যতে দাম বাড়াতে হলেও তা সাধারণ ক্রেতার সাধ্যের মধ্যে রাখা হবে।’’
উদ্বেগ
আবাসন তৈরির খরচ বেড়েছে ৫-১৫ শতাংশ।
চাহিদা কমার আশঙ্কায় এখনই দাম বাড়াতে চাইছে না নির্মাতা সংস্থাগুলি।
তবে তাদের বার্তা, আগামী দিনে দাম বাড়াতে হতে পারে, বিশেষ করে যুদ্ধ আরও কিছু দিন চললে।
কারণ, উপাদানের দাম বাড়ায় নির্মাণের খরচ বেড়েছে।
সামগ্রিক বিক্রি কিছুটা কমেছে মার্চে, আগামী দিনেও চিন্তা বহাল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)