খরা পরিস্থিতির মধ্যে হঠাৎ ভারী বর্ষণ হলে যেমন হয়, ভারতের শেয়ার বাজারের অবস্থা অনেকটা সেই রকম। গত সপ্তাহে স্বপ্নের দৌড় দৌড়েছে আমাদের দুই মূল সূচক সেনসেক্স ও নিফটি। যেন পাল্লা দিয়েছে বিরাট, ডেভিলিয়ার্স এবং ওয়ার্নারের সঙ্গে।
একটু তাকানো যাক স্কোরবোর্ডের দিকে। বুধবার সেনসেক্স স্কোর করেছে ৫৭৬ পয়েন্ট, বৃহস্পতিবার ৪৮৫ এবং শুক্রবার ২৮৭। এই ভাবে পিটিয়ে খেলে সপ্তাহ শেষে মুম্বই সূচক পৌঁছেছে ২৬,৬৫৪ অঙ্কে। অন্য দিকে নিফ্টি ছাড়িয়েছে ৮১৫০-এর মাত্রা। গত তিন মাসে ভারতীয় বাজারের কাছে এটি ছিল শ্রেষ্ঠ সপ্তাহ। কেউ কেউ মনে করছেন, বড় দৌড়ের আগে বুল-রা এক প্রস্ত গা ঘামিয়ে নিল। শেয়ার বাজারে কত দ্রুত ভাগ্য পরিবর্তন হতে পারে, এটি তার অন্যতম উদাহরণ। এ বারের উত্থানে মাত্র কয়েক দিনে বাজার উঠেছে ৫ শতাংশেরও বেশি। এতে শুধু শেয়ারে লগ্নিকারীরাই নয়, বেজায় খুশি ইকুইটি ফান্ডের বিনিয়োগকারীরাও। ১০ দিনে ন্যাভ বেড়েছে আকর্ষণীয় গতিতে।
এ বার এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক, কোন শক্তিতে ভর করে বাজার এতটা উঠল এবং বাজারের ভবিষ্যৎই বা কী।
১) আবহাওয়া বিশারদ সংস্থা স্কাইমেটের পূর্বাভাস। এদের অনুমান এ বার বর্ষা হবে স্বাভাবিকের তুলনায় ১০৯ শতাংশ। বাজার এবং দেশের কাছে এটি অত্যন্ত ভাল খবর।
২) আশার তুলনায় সামগ্রিক ভাবে ভাল কোম্পানি ফলাফল। দেশের প্রথম সারির মূলধনী পণ্য এবং পরিকাঠামো কোম্পানি লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো-র ফলাফল বাজারের দৃষ্টিভঙ্গিই পাল্টে দিয়েছে। এই ফলাফল শুধু কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের জন্যই ভাল নয়, তা দেশের উন্নয়নেরও ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
৩) অসমে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার গঠন। এটি কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের হাত আরও শক্তিশালী করবে বলে বাজার মনে করছে। এতে সরকারের সংস্কারের কাজ ত্বরান্বিত হবে বলে অনেকের ধারণা।
৪) মোদী সরকারের দু’বছর পূর্তিতে ভাল কাজের খতিয়ান প্রকাশ। ঘোষণা করা হয়েছে নতুন কিছু প্রকল্পও। বাজার মনে করছে, সরকার এখনও পর্যন্ত ভালই কাজ করেছে। তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাই বাজার আশাবাদী।
৫) বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দাম ৫০ ডলার ছাড়ানো। এই খবরে বেশ খানিকটা চাঙ্গা হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতি ও শেয়ার বাজার। এর ফলে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলির অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরবে। সেখানে বাড়বে পণ্যের চাহিদা। ভারত-সহ বেশ কিছু দেশের রফতানিও বাড়বে বলে আশা।
৬) বিদেশি লগ্নিকারীদের বাজারে ফেরা। এর জেরে মোটা অর্থ অপেক্ষা করছে ভারতে লগ্নির জন্য।
বাইরের গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গত সপ্তাহে গরম হয়েছে ভারতীয় বাজার। প্রশ্ন হল, এই উত্তাপ কি আগামী দিনেও বজায় থাকবে? অনেক সদর্থক দিকের পাশাপাশি কয়েকটি প্রতিকূল শর্তও কিন্তু বাজারে আছে। লগ্নিকারীদের এগুলিকে উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। যেমন:
ক) অশোধিত তেলের দাম বাড়ার প্রভাব ভাল এবং মন্দ দুই-ই। দাম বাড়লে দেশের আমদানি বিল বাড়বে। এতে টাকায় ডলারের দাম বাড়বে। পাশাপাশি বাড়বে পণ্যমূল্য। পাইকারি মূল্য সূচকের আওতায় থাকা পণ্যগুলির মধ্যে জ্বালানি এবং বিদ্যুতের ভাগ ১৫%। তেলের দাম বাড়লে তাই মূল্যবৃদ্ধিও মাথা তুলবে। খুচরো পণ্যমূল্য এতটা নেমে আসার অন্যতম কারণ তেলের দামে পতন। তেল বাড়ার কারণে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হলে সুদ আরও ছাঁটাইয়ের সম্ভাবনা কমবে। তেল ও পেট্রোপণ্যের দাম বাড়লে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়বে বেশ কিছু কোম্পানি। এর মধ্যে থাকতে পারে বিমান সংস্থা, রং কোম্পানি এবং কিছু ভোগ্যপণ্য বা এফএমসিজি কোম্পানি। অর্থাৎ বাজারের জন্য তেলের দাম বাড়া অশুভও বটে।
খ) বাজারের মাথায় আবার চেপে বসতে পারে মার্কিন শীর্ষ ব্যাঙ্কের সুদ বাড়ানোর জুজু। গত শুক্রবার মার্কিন শীর্ষ ব্যাঙ্কের কর্ণধার জ্যানেট ইয়েলেন যে-ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাতে ভারতীয় বাজার নতুন করে আতঙ্কিত হয়ে পড়তেই পারে। তাঁর মন্তব্য, মার্কিন অর্থনীতি যদি পরিকল্পনা মতো এগোয় এবং কর্মসংস্থান বাড়ে, তবে আগামী মাসগুলিতে সুদ বাড়ারই সম্ভাবনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জুন-জুলাই মাসেই বাড়ানো হতে পারে সুদ। ইয়েলেনের এই ইঙ্গিত বাজার কী ভাবে নেয়, তা সোমবার লেনদেন শুরু হলেই স্পষ্ট হবে। তা ছাড়া, এত অল্প সময়ে ১৩০০ পয়েন্ট ওঠার পরে বাজারে বিক্রির চাপ আসতে পারে এবং একটি স্বাভাবিক সংশোধনেরও সম্ভাবনা থাকবে।
আজ শেষ হচ্ছে ২০১৫-’১৬ অর্থবর্ষের ফলাফল প্রকাশের পালা। প্রকাশিত হবে একগুচ্ছ ফলাফল। এ সবেরও কম-বেশি প্রভাব থাকবে সূচকের গতিপথে। এ বার সব থেকে বেশি হতাশ করেছে সরকারি ব্যাঙ্কগুলির ফলাফল। অনাদায়ী ঋণের একটি বড় অংশ লাভ থেকে সরিয়ে রাখা সত্ত্বেও এখনও ব্যাঙ্কগুলির খাতায় মোটা অঙ্কের অনুৎপাদক সম্পদ। আশা, আগামী দু’টি ত্রৈমাসিকে ব্যাঙ্কের হাল ফেরাতে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হবে। স্টেট ব্যাঙ্কের কর্ণধার অরুন্ধতী ভট্টাচার্য মনে করেন, দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হলে বকেয়া ঋণ আদায়ও সহজ হবে। লাভ কমা বা লোকসানের জেরে এবং অনুৎপাদক সম্পদ অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠায় বড় রকমের পতন হয়েছে বেশির ভাগ সরকারি ব্যাঙ্ক শেয়ারে। ব্যাঙ্কগুলি আগামী তিন থেকে ছ’মাসে একটু ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে ওই সব শেয়ার।