সিঙ্গুরে টাটাদের কারখানা এখনও জমি বিতর্কে আটকে। আর গুজরাতের সানন্দ কারখানায় তৈরি হতে চলেছে ন্যানো-র পরে সংস্থার দ্বিতীয় ছোট গাড়ি ‘জিকা’। সাত বছর আগে সিঙ্গুর থেকে ‘বিতাড়িত’ হয়ে সেখানেই নতুন করে ঘর পেয়েছিল টাটা মোটরস। দেশে যাত্রী গাড়ির বাজারে ঘুরে দাঁড়াতে এ বার সেই কারখানায় নতুন ধরনের গাড়ি তৈরি করতে টাকা ঢালছে তারা।
দেশের গাড়ি শিল্পে প্রথম যাত্রা শুরু করলেও পরে ব্যক্তিগত গাড়ির বাজারে তেমন কৌলিন্য পায়নি টাটা মোটরস। যে-সংস্থা জাগুয়ার-ল্যান্ডরোভার’-এর মতো সংস্থাকে মুনাফার পথ দেখিয়েছে, নিজের দেশের যাত্রী গাড়ির বাজারে তারা ৩ নম্বর থেকে নেমে এসেছে পাঁচে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে খবর, রতন টাটার মতোই টাটা গোষ্ঠীর শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার পরে গাড়ির ব্যবসা নিয়ে আগ্রহী হন সাইরাস মিস্ত্রি। ঘুরে দাঁড়াতে ক’বছর আগে ‘হরাইজনেক্স্ট’ পরিকল্পনায় ২০২০ পর্যন্ত বছরে দুটি করে নতুন গাড়ি বাজারে আনার কথা জানিয়েছিল তাঁর সংস্থা। সেই তালিকায় চলতি বছরে বোল্ট ও জেস্ট ছিল প্রথম দুই। তবে জিকা সংস্থার ভাঁড়ারের প্রথম গাড়ি, যেটি সম্পূর্ণ নতুন ‘প্ল্যাটফর্ম’-এ তৈরি। এ জন্য সানন্দের কারখানায় টাকাও ঢেলেছে তারা। সংস্থার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট পিবিইউ) গিরীশ ওয়াঘ জানান, আগামী দিনে আরও কয়েক ধরনের নতুন গাড়ি তৈরির উপযোগী ওই প্ল্যাটফর্ম। আলাদা করে কোনও একটি কারখানায় লগ্নির ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলতে না-চাইলেও তিনি জানান, সার্বিক ভাবে বছরে ৩০০০ কোটিরও বেশি ঢালছেন তাঁরা।
টাটাদের গাড়ির ‘লুক’টাই সেকেলে, এই অভিযোগ নতুন নয়। সেই ধারণা ভাঙতে গাড়ির নকশা থেকে শুরু করে সব কিছুরই খোলনলচে বদলাচ্ছে সংস্থা। ভাইস প্রেসিডেন্ট (সেলস) এস এন বর্মনের দাবি, বিশ্বমানের কথা ভেবেই তৈরি হয়েছে নতুন প্ল্যাটফর্ম ও গাড়ি। পেট্রোল মডেলটির সর্বোচ্চ ‘পাওয়ার’ ৮৫ পিএস। ডিজেলের ৭০ পিএস।
জিকা-র মূল নকশা তৈরি হয়েছে লন্ডনে সংস্থার স্টুডিওয়, তবে পুণে ও ইতালির স্টুডিওর সহায়তা নিয়েই। ড্রয়িংবোর্ডের নকশা থেকে গাড়ি তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ে বেশ কিছু রসদ এসেছে জাগুয়ার-ল্যান্ডলোভারের কাছ থেকেও, জানান সংস্থাটির ডিজাইনার প্রতাপ বসু।
নকশায় নতুনত্ব ছাড়াও, ভারতীয় ক্রেতার কাছে গাড়ি এখন প্রযুক্তি ও বিনোদনের কেন্দ্রও বটে। না-হলে তরুণ প্রজন্মকে টানা যাবে না। তাই জিকা-তে একগুচ্ছ সুবিধা দিচ্ছে টাটা। যেমন, ‘জুক কার’ অ্যাপ, যেটি দিয়ে পাঁচজন সওয়ারির মোবাইলে থাকা বিভিন্ন গান গাড়ির ‘মিউজিক সিস্টেমে’ শোনা যাবে। বস্তুত, একটি ফোন ‘মোবাইল হটস্পট’ হিসেবে কাজ করবে। সংস্থার আর একটি অ্যাপ ডাউনলোড করলে নেট ছাড়াই গন্তব্যের বিভিন্ন বাঁকে সতর্কতা (টার্ন বাই টার্ন ন্যাভিগেশন) নেওয়া যাবে।
হুন্ডাইয়ের আই১০ গ্র্যান্ড, মারুতি-সুজুকির সেলেরিও, ওয়াগন-আর জিকার প্রতিদ্বন্দ্বী। সংশ্লিষ্ট মহলের আশা, দাম চার লক্ষ টাকার কমই হবে। জানুয়ারির গোড়ায় বাজারে আসার কথা জিকা-র।
সানন্দে মোট উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে অনেক কম ন্যানো তৈরি হয়। ফলে প্রশ্ন ওঠে জিকার সম্ভাব্য বাজার নিয়ে। তবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, ক্রেতাদের চাহিদা মাথায় রেখেই নতুন ভাবনা ভাবতে হয়। তাই কারখানায় বাড়তি জায়গা থাকলে সেই মতো পরিকল্পনা করা সহজ হয়। সানন্দে সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগাচ্ছে টাটা মোটরস। যে-সুযোগ হয়তো পেতে সিঙ্গুরও।
সানন্দে টাটাদের পরে পা রেখেছে মার্কিন বহুজাতিক ফোর্ড মোটর। এক অর্থে সিঙ্গুরকে দু’গোল দিয়েছে সানন্দ। এ বার টাটাদের সানন্দের কারখানাও সিঙ্গুরকে দু’গোল দিল গাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে। দেশের বাজারে ঘুরে দাঁড়াতে যখন সানন্দের কারখানাকে হাতিয়ার করছে তারা, তখন পশ্চিমবঙ্গে আর একটি বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে কঙ্কালসার চেহারায় পড়ে আছে সিঙ্গুর কারখানার কাঠামো।