যত টাকা ধার করতে হচ্ছে, তার সিংহ ভাগই বেরিয়ে যাচ্ছে পুরনো জমে থাকা ঋণের উপরে সুদ মেটাতে। পুরনো ঋণে সুদের বোঝা সামলাতে এ বার জিডিপি-র তুলনায় ঋণের বোঝা কমানোকেই পাখির চোখ করতে চাইছে নরেন্দ্র মোদী সরকার।
চলতি অর্থ বছরে দেশের জিডিপি-র তুলনায় ঋণের হার ছিল ৫৬.১ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন আজ ঘোষণা করেছেন, আগামী অর্থ বছরে তিনি এই ঋণ-জিডিপি-র অনুপাতকে ৫৫.৬ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিচ্ছেন। গত বাজেটেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তিনি এই ঋণ-জিডিপির অনুপাতকে ২০৩০-৩১-এর মধ্যে ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনতে চান। কোভিডের পরে এই ঋণ-জিডিপির অনুপাত ৬১ শতাংশ ছাপিয়ে গিয়েছিল।
বাজেট অনুযায়ী, আগামী অর্থ বছরে পুরনো ঋণে সুদ মেটাতে মোদী সরকারকে ১৪ লক্ষ কোটি টাকা সুদ গুণতে হবে। খরচ ও রাজস্ব আয়ের ফারাক মেটাতে মোদী সরকারকে প্রায় ১৭ লক্ষ কোটি টাকা ধার করতে হবে। কংগ্রেস নেতা মণীশ তিওয়ারির অভিযোগ, ‘‘এর অর্থ, এক টাকা ধার করলে তার বেশির ভাগই সুদ মেটাতে চলে যাচ্ছে। নতুন সম্পদ তৈরিতে নয়। ধার করে পুরনো সুদ মেটালে আর্থিক বৃদ্ধিতে টাকা খরচের সুযোগ থাকে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঘাড়ে বোঝা চাপে। আগামী অর্থ বছরে মোট ঋণের পরিমাণ ২১৪ লক্ষ কোটি টাকা ছাপিয়ে যাবে। যা ইউপিএ-সরকারের শেষ বছরের তুলনায় প্রায় চার গুণ।’’
অর্থমন্ত্রী সীতারামন আজ যুক্তি দিয়েছেন, তিনি ঋণ-জিডিপি-র অনুপাত কমানোর চেষ্টা করছেন, যাতে সুদের খরচ কমে। অন্য অগ্রাধিকারে থাকা ক্ষেত্রে খরচ বাড়ানো যায়। ঋণ-জিডিপির অনুপাত কমানোর লক্ষ্য নিলেও রাজকোষ ঘাটতি খুব বেশি কমানোর চেষ্টা করেননি অর্থমন্ত্রী। চলতি অর্থ বছরে তিনি ৪.৪% রাজকোষ ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করেছেন। আগামী অর্থ বছরে সেই ঘাটতি কমিয়ে ৪.৩% করার লক্ষ্য নিয়েছেন। আর্থিক উপদেষ্টা সংস্থা ইওয়াই ইন্ডিয়া-র মুখ্য নীতি উপদেষ্টা ডি কে শ্রীবাস্তব বলেন, ‘‘খুব বেশি মাত্রায় রাজকোষ ঘাটতি কমানোর চেষ্টা হয়নি। কারণ আয়করে ছাড়, জিএসটি ছাঁটাই করতে গিয়ে জিডিপি-র তুলনায় কর বাবদ আয় কমে গিয়েছে।’’
প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী, কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরমের অভিযোগ, ‘‘কর বাবদ আয়ের লক্ষ্য পূরণ হয়নি মোদী সরকারের। লক্ষ্যের তুলনায় রাজস্ব আয় প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা কম হওয়ায় মোদী সরকারকে মোট খরচ প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা কমাতে হয়েছে। রাজস্ব খাতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা, মূলধনী খাতে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা খরচ ছাঁটাই করেছেন অর্থমন্ত্রী। পরিকাঠামো তৈরি-সহ মূলধনী খাতে জিডিপি-র তুলনায় খরচের হার কমেছে। গ্রামোন্নয়ন, নগরোন্নয়ন, সমাজকল্যাণ, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য— সব ক্ষেত্রেই খরচ ছাঁটাই হয়েছে। তার ফলে রাজস্ব ঘাটতির লক্ষ্য পূরণ হয়েছে।’’
বাজেটের অঙ্ক কষার সময় অর্থমন্ত্রী ধরে নিয়েছেন, চলতি অর্থ বছরের তুলনায় আগামী অর্থ বছরে বর্তমান বাজারদরের ভিত্তিতে দেশের জিডিপি ১০ শতাংশ বাড়বে। কর বাবদ আয় ৮ শতাংশ বাড়বে বলে ধরে নিয়েছেন নির্মলা। আয়কর থেকে আয় মাত্র ১১.৪% বাড়বে বলে ধরে নিয়েছেন তিনি। জিএসটি থেকে আয় এ বছরের মতোই থাকবে। যদিও রাজস্ব সচিব অরবিন্দ শ্রীবাস্তবের যুক্তি, জিএসটি ছাঁটাইয়ের ফলে বিক্রিবাটা বাড়ায় আবার আয় বাড়তে শুরু করেছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)