ভারতে জাতিভিত্তিক জনগণনা করা বা না-করা বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কাছে জাতিভিত্তিক জনগণনা কাঙ্ক্ষিত। আবার অনেকেই মনে করেন যে, সম্পদের পুনর্বণ্টন সম্পর্কিত নীতিগুলি নতুন করে সাজানোর জন্য জাত সংক্রান্ত তথ্য একটি পূর্বশর্ত। অন্যদের কাছে, জাতিগণনা অবাঞ্ছিত। আমাদের উত্তর-ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতপাত এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জাতপাত নির্বাচনী রাজনীতিতে গভীর ভাবে প্রোথিত— যেখানে ক্ষমতার প্রতি সমস্ত জাতিরই স্বার্থ রয়েছে; এবং সমস্ত রাজনৈতিক দলই নিজেদের অনুকূলে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতিকে ব্যবহার করতে আগ্রহী।
আনন্দ তেলতুম্বডে, জাতপাতের ঊর্ধ্বে থাকা বৃহত্তর সমতাবাদী উদ্দেশ্যের প্রতি সহানুভূতিশীল। জাতিভিত্তিক জনগণনার পিছনে ‘প্রতারণা’র দিকটি তিনি তুলে ধরেছেন। তাঁর যুক্তি অনুযায়ী, সামগ্রিক উন্নয়নের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জাতিভিত্তিক জনগণনা করা না হলে এটি অনিবার্য ভাবেই, নির্বাচনী স্বার্থে আরও সুপরিকল্পিত ভাবে জাতপাতকে ব্যবহার করবে। জাতিভিত্তিক জনগণনার সবচেয়ে বড় বিপদ হল শাসক দল কর্তৃক এর সম্ভাব্য অপব্যবহার। বর্তমান স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে জাতিভিত্তিক জনগণনার ভূমিকা অকিঞ্চিৎকর হবে, যদি না এই গণনার উদ্দেশ্যগুলি মানব-উন্নয়নের মৌলিক ভিত্তিগুলোর দ্বারা পরিচালিত হয়।
বইটির প্রথম কয়েকটি অধ্যায়ে জাতিব্যবস্থার উপর ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের এক স্পষ্ট সমালোচনা ও ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। আম্বেডকর বলেছিলেন, কেউ কেউ দরজা বন্ধ করে দেয়; আর কেউ কেউ এসে দেখে, দরজাটা তাদের মুখের উপর বন্ধ। এখানে ‘দরজা’ কথাটি ক্ষমতা, সম্পদ ও মর্যাদার সুযোগের এক রূপক হয়ে ওঠে। দরজা বন্ধ মানে বঞ্চনা। ভূমি, জল, শিক্ষা, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রে অসম অধিকারকে সামন্তবাদ, উপনিবেশবাদ বা পুঁজিবাদ— কোনও শক্তিই উৎখাত করতে পারেনি। বরং চাষাবাদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজস্ব, বেতনভোগী চাকরির উপরে উচ্চবর্ণের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে, পর্যায়ক্রমে টিকে গেছে।
বইটি এও পর্যালোচনা করে যে, কী ভাবে জাতপাত ঔপনিবেশিক প্রশাসনের অধীনে আরও সুদৃঢ় হয়ে এক অভিন্ন আধুনিক পরিচয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। জনসংখ্যা গণনা এবং ঔপনিবেশিক জ্ঞান উৎপাদনের মাধ্যমে, রাষ্ট্র-স্বীকৃত সর্বভারতীয় ভেদগুলোর মধ্য দিয়ে, জাতপাত প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে সুদৃঢ় হয়েছিল। স্থানীয় বৈচিত্র এবং দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে উপেক্ষা করে জাতিগণনা চার স্তরের বর্ণপ্রথাকে একটি সামগ্রিক রূপ দেয়। জাতিগুলো কখনওই অভ্যন্তরীণ ভাবে সমজাতীয় ছিল না, কারণ এলাকা ও জনজাতি-নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস বিদ্যমান ছিল। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ঔপনিবেশিক জাতিভিত্তিক জনগণনা, ব্রাহ্মণ্য বর্ণ-আদর্শকে আরও সুদৃঢ় বৈধতা প্রদান করে। ভারতীয় সমাজের সবচেয়ে বিভাজনকারী ও নির্ধারক দু’টি দিক: ‘ধর্ম’ এবং ‘জাতপাত’কে ঔপনিবেশিক প্রশাসন প্রায়শই সামাজিক বিভাজন এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকারী কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। তেলতুম্বডে আধুনিক ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজের জাতপাতকরণকে ঔপনিবেশিক জাতিভিত্তিক জনগণনার পরিণতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে করতে যথেষ্ট সময় ব্যয় করেছেন।
দ্য কাস্ট কন সেনসাস
আনন্দ তেলতুম্বডে
৪৯৯.০০
নাভায়না
প্রেক্ষাপট তৈরি করার পর, লেখক এমন এক প্রশ্ন তুলেছেন যা বইটির পরবর্তী বেশ কয়েকটি অধ্যায়কে একসূত্রে গেঁথেছে। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী কেন জাতপাত গণনায় আগ্রহী? যে সরকার পর্যায়ক্রমে দারিদ্র, বেকারত্ব, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি সঙ্কট ও মূল্যবৃদ্ধি সংক্রান্ত তথ্য দমন করেছে— এবং এর ফলে তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নীতি-নির্ধারণকে ক্ষুণ্ণ করেছে— তারা কেন বিরোধীদের জাতিগণনার দাবিকে মানতে আগ্রহী? বিশেষ করে যখন জাতিভিত্তিক জনগণনা, সংখ্যাগত শক্তি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বা সম্পদ-বণ্টনের মধ্যেকার অসামঞ্জস্যকে প্রকাশ করতে বাধ্য। বা যখন জাতিভিত্তিক জনগণনার ফলে সংরক্ষণ সম্প্রসারণের আরও জোরালো দাবির জন্ম দিতে পারে। শাসক দলের ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী প্রকল্প হল জাতপাতের বিভাজনের ঊর্ধ্বে হিন্দু সংহতির একটি আখ্যান তৈরি করা— তা হলে জাতিগণনার মাধ্যমে পুনর্বণ্টনমূলক ন্যায়বিচারের প্রতি হঠাৎ এই আগ্রহ কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পাশাপাশি লেখক আমাদের এও মনে করিয়ে দেন যে, জাতিগণনার পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু জানানো হয়নি। কোন জাতিগুলোকে গণনা করা হবে এবং কাদের বাদ দেওয়া হবে? উচ্চবর্ণের আধিপত্যের মাত্রা এবং সুবিধাপ্রাপ্ত জাতিগুলোর সম্পদও গণনা করা হবে কি? জাতি এবং জাতিগোষ্ঠীগুলির অভ্যন্তরীণ আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের মানচিত্র পাওয়া যাবে কি? গণনার লক্ষ্য সম্বন্ধে লেখক আমাদের সংশয়ী হতে বলেন।
বইটির দ্বিতীয়ার্ধে, সামগ্রিক উন্নয়নের পক্ষে জোর দেওয়ার আগে লেখক মনে করিয়ে দেন যে, সংরক্ষণ পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতিকে সুদৃঢ় করেছে এবং একটি জাতিগোষ্ঠীকে অন্যটির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। একই ভাবে, মাত্র কয়েক দশকের সুরক্ষামূলক বৈষম্য, শত শত বছরের জাতিভিত্তিক শোষণকে মোকাবিলা করার জন্য যথেষ্ট নয়। তা ছাড়া, সংরক্ষণের সুবিধাগুলো মূলত একটি জাতির প্রভাবশালী অংশই ভোগ করে। ব্যক্তি বা পরিবারের ঊর্ধ্বমুখী সামাজিক গতিশীলতা— স্বয়ংক্রিয় ভাবে— সমগ্র সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে না। তা ছাড়া, দেশের হাজার হাজার জাতি ও তার উপগোষ্ঠীগুলির মধ্যে সংরক্ষণের উপবিভাজন গাণিতিক ভাবে অসম্ভব। কেবল সরকারি চাকরি ও আসন সংরক্ষণের মাধ্যমে এর সমাধান করা সম্ভব নয়।
লেখকের মতে, জাতি সংক্রান্ত তথ্যের নিজস্ব কোনও উপযোগিতা নেই, তা নিহিত রয়েছে এই তথ্যের প্রয়োগে— হয় আদিম বিভেদমূলক পরিচয় আরও সুদৃঢ় করায়, নতুবা জাতপাতকে সম্পূর্ণ নির্মূল করায়। লেখকের মতে, সর্বজনীন ক্ষমতায়ন ছাড়া পুনর্বণ্টনমূলক ন্যায়বিচার অসম্ভব। তিনি আমাদের জাতপাত-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে ওঠার জন্য উৎসাহিত করছেন। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক শোষণ এবং বৈষম্যের বিশাল কাঠামোকে অমীমাংসিত ও অক্ষত রেখে, কেবল সান্ত্বনা হিসেবে সামান্য অবশিষ্টাংশ প্রদান যথেষ্ট নয়। এটি নিম্নবর্ণের মানুষদের এমন একটি ব্যবস্থায় নির্ভরশীল করে তোলে যেখানে উচ্চবর্ণের মানুষেরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সম্পদের মালিক হয় এবং বাকিদের জন্য সীমিত বরাদ্দ নির্ধারণ করে।
এর সমাধান নিহিত ‘সর্বজনীন সক্ষমতা বৃদ্ধি’তে, যা সাম্যবাদী পরিকাঠামো তৈরির মাধ্যমে সম্ভব। প্রয়োজন সর্বজনীন ও নিঃশর্ত ভাবে সরকারি সম্পদে সমান অধিকার। সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন লেখক। অন্যথায়, নিম্নমানের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করা এক জন দলিত বা আদিবাসী শিক্ষার্থী এবং এক জন সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চবর্ণের শিক্ষার্থীর মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়তে থাকবে। তিনি সামাজিক-ন্যায়বিচার কাঠামোর গাঠনিক পরিবর্তনের কথা বলেছেন, এবং দরিদ্রদের কেবল দারিদ্রসীমার উপরে বাঁচিয়ে রাখতে, সামান্য কিছু উচ্ছিষ্ট বিতরণের তীব্র বিরোধিতা করেছেন।
ক্ষমতাবানরা খুব কমই ক্ষমতার পুনর্বণ্টন চায়। ঔপনিবেশিক থেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে উত্তরণে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় কোনও ফাটল বা আমূল পরিবর্তন ঘটেনি। আমরা বেশ কিছু নিয়মতান্ত্রিক নিপীড়ন, আধিপত্য ও শোষণের উত্তরাধিকার বহন করি। নেতা, বড় জোতের মালিক, শহুরে মধ্যবিত্ত ও উদ্যোক্তাদের নিয়ে গঠিত উচ্চবর্ণ-উচ্চবিত্তের আঁতাঁত আত্মসাৎ করে সম্পদ, শক্তি, মুনাফা। চরম বঞ্চিত ও শোষিত হয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। আর সেটাই স্থিতাবস্থাবাদ। তাই, সবচেয়ে বড় প্রতারণা আসলে জাতিগণনা নিয়ে ঐকমত্য বা তার অভাব নয়; বরং জাতি ও শ্রেণির সেই দীর্ঘস্থায়ী এক আঁতাঁত— যা সুযোগ-সুবিধা আত্মসাৎ করে এসেছে এবং এখনও করছে। লেখকের মতে, সংরক্ষণ হল স্থিতাবস্থা বজায় রাখার একটি কৌশল মাত্র।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)