×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৬ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

দারা শুকো ও ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ

গৌতম ভদ্র
০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০১:২৫
বইটি পাঠক সমাজে সমাদৃত, লেখকমহাশয় তো বটেই।

বইটি পাঠক সমাজে সমাদৃত, লেখকমহাশয় তো বটেই।

গত শতকের পঞ্চাশের দশকে বড় হওয়া রেডিয়োখোর পাঠক আমি। দারা শুকো, আওরঙ্গজেব ও শাহজাহানের উপরে বই পড়ব, আর কানের কাছে অহীন্দ্র চৌধুরীর গলায় শাহজাহানের সংলাপ আর সরযূবালার গলায় জাহানারার ডায়লগ বাজবে না, এমন হওয়াটা মুশকিল। মনে রেডিয়ো-নাটকের অনুষঙ্গটা এতই জোরদার, বলতে গেলে, গত দেড়শো বছর ধরে দারা আর আওরঙ্গজেবকে নিয়ে মুঘল দরবারের মারামারি ঘিরে স্মৃতির বিনিয়োগ কম হয়নি, এঁদের হাত ধরে নানা মুঘল চরিত্র গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও নাটকে নানা রূপে ফিরে এসেছে। এমনকি সুপ্রিয়া গাঁধীর আলোচ্য বইটার চিন্তার বীজও তো দাস্তানগোই-এর একটা খসড়া পত্রে, ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত কথকতার আদলে। ২০১৭-তে তানিয়া নন্দর ও শাহিদ নাদিম দারা আর আওরঙ্গজেবের দ্বন্দ্ব নিয়ে নাটক লিখেছেন, গোঁড়ামি স্বৈরাচারের দরবারে এক মুক্তমনা মানুষের বিচারই নাটকটার উপজীব্য। অন্য পক্ষে বাঙালি নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় মুঘল তখতের জন্য শাহজাদাদের সংঘর্ষকে যৌথ পরিবারের ভ্রাতৃকলহের নাটকে রূপান্তরিত করেন। নাটকে হতভাগ্য বাদশাহ পিতার হাহাকার শুনি, অনুতপ্ত পুত্র ক্ষমা ভিক্ষা চান।

দাস্তান আর নাটকের অঙ্গনই সব নয়। গত শতকের চিন্তাবিদদের আলোচনার বৃত্তে দারা ও আওরঙ্গজেব জায়গা পেয়েছিলেন, দুই ভাইয়ের দ্বন্দ্বে ছিল দুই বিপরীতমুখী আদর্শের বিরোধ। যেমন, কবি চিন্তাবিদ ইকবালের সমর্থন আওরঙ্গজেবের ইসলামি রাষ্ট্র ভাবনার পক্ষে। অন্য দিকে সুফি সাধক সরসদের উপর লেখা বিখ্যাত প্রবন্ধে যুবক মৌলানা আবুল কালাম আজাদ দারার সহিষ্ণু সমন্বয়ী চেতনার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। মুঘল-ই-আজ়মে দুই শাহজাদার বিরোধ বৃত্তান্তে অতীত যেন বর্তমানের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশের দুই ভিন্নধর্মী সমাজসম্পর্ক ও রাষ্ট্র ভাবনার চিত্রকে তুলে ধরে।

দুই শাহজাদার জীবন পেশাদার ইতিহাসবিদদের গবেষণার অন্বিষ্ট হয়েছে। মুঘল সাম্রাজ্যের ট্রাজিক নায়ক আওরঙ্গজেবের উপর যদুনাথ সরকার পাঁচ খণ্ড বই লিখেছেন, সেই সূত্রে দারার ভাগ্যবিপর্যয়ও তাঁর নজর এড়ায়নি। মুঘল দরবারি রাজনীতির প্রেক্ষাপটে আতহার আলি তখতের জন্য দুই শাহজাদার বিরোধের তৎকালীন ভাবনা ও নানা গোষ্ঠীর পারস্পরিক অবস্থানের তথ্যনির্ভর বর্ণনা দিয়েছেন।

Advertisement

দি এম্পেরর হু নেভার ওয়াজ়: দারা শুকো ইন মুঘল ইন্ডিয়া

সুপ্রিয়া গাঁধী

৬৯৯.০০, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস

সম্প্রতি মুনিম ফারুকি মুঘল শাহজাদাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি কাঠামোগত বিশ্লেষণ করেছেন, সেই প্রেক্ষিতে দারা ও আওরঙ্গজেবের চরিত্র, রাজনীতি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি তাঁর তুলনামূলক আলোচনার উপজীব্য। অন্য পক্ষে যদুনাথ সরকারের প্রিয় ছাত্র কালিকারঞ্জন কানুনগো ইংরেজি ও বাংলা দুই ভাষাতেই দারার উপর মনোজ্ঞ জীবনী লিখেছেন। দারার রচনা নিয়ে বিক্রমজিৎ হসরতের নির্ভরযোগ্য বই আছে। আধুনিক ইতিহাসবিদ মহলে ফারুকি ছাড়া দারার প্রতি সবাইয়ের সহানুভূতি আছে। সবাই একমত যে, মুঘল রাজনীতির দাবা খেলায় শাহজাদা আওরঙ্গজেব অনেক ধুরন্ধর। উত্তরাধিকার সংক্রান্ত যুদ্ধে দারার সাফল্যের বড় একটা আশা ছিল না, লোক চটাতে তিনি নাকি ওস্তাদ ছিলেন। ভ্রাতৃঘাতী আওরঙ্গজেব নিষ্ঠুর কিন্তু মুঘলশাহি ঐতিহ্যে নিষ্ঠুরতার ওই ঐতিহ্য তাঁর পিতা শাহজাহানই পোক্ত করেছিলেন। সম্ভাব্য দাবিদারদের বাঁচিয়ে রেখে তখত বাঁচানো মুশকিল। মোটের উপর দারা আর আওরঙ্গজেবের রক্তক্ষয়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতার রাজনৈতিক ও নৈতিক মানচিত্রের রেখাগুলি স্পষ্ট, নতুন কোনও তথ্যভান্ডার পাওয়ার সম্ভাবনাও কম। নতুন দৃষ্টিকোণে মানচিত্রের কোন অংশগুলি বিশেষ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে, সেটাই বিবেচ্য।

দারা শুকো: দ্য ম্যান হু উড বি কিং

অভীক চন্দ

৬৯৯.০০, হার্পার কলিন্স

সুপ্রিয়ার জীবনীর ঝোঁক দারা কী ভাবে তাঁর মেধাজগৎ তৈরি করছেন, মুঘল দরবারি সংস্কৃতির ঐতিহ্যে তাঁর মেধাজীবনের তাৎপর্যই বা কী। দিল্লির সুলতানি বা মুঘল শাসকদের সঙ্গে সুফি সন্তদের যোগ থাকার ঐতিহ্য সজীব ছিল। আকবরের আমলে চিশতিয়া সুফি পরিবারের লোকেরা সরাসরি শাসনতন্ত্রে মনসবদার হয়েছিলেন। জাহাঙ্গির তো সুযোগ পেলেই পছন্দসই সুফি সন্ত ও হিন্দু যোগীর আখড়ায় আলোচনায় বসতেন। আওরঙ্গজেবের ফৌজে নকশবন্দিরা লড়াই করত। শাহজাদা দারা নিজে কাদিরিয়া সুফি সিলসিলার মুরিদ, সিন্ধুপ্রদেশ ও কাশ্মীরের মিঁয়া মির ও খুল্লা শাহ তাঁর পির। দারা পড়ুয়া লোক, লেখকও বটে। ভারতে সুফি ধর্মগুরুদের পরম্পরার উপরে তজকিরা বা জীবনী জাতীয় দু’টি বই লিখেছেন, কাদেরি ছাড়া অন্য সুফি সিলসিলার সাধকদের কথাও আছে। হিন্দু সাধক বাবা লালের সঙ্গে তাঁর বাক্যালাপ চলে, চিশতি সুফি মুজিবুল্লার সঙ্গে তিনি পত্রালাপ করেন। তাঁর অনুসন্ধিৎসার সঙ্গী তাঁর বোন জাহানারা। এই প্রভৃতি নিয়েই তিনি ভারতীয় সুফি ধর্মসত্যের উপর কয়েকটি বই লেখেন, যেমন, রিসালা-ই-হকনুমা বা মজমা-উল-বাহরাইন। শেষোক্তটি সমুদ্রমঙ্গল নামে সংস্কৃত ভাষাতেও অনূদিত হয়। পরিচিত রচনা কিন্তু রচনার অনুচ্ছেদ ধরে সুপ্রিয়া দারার নিজস্ব মত বোঝার চেষ্টা করেছেন। আকবরের ইবাদতখানার ঐতিহ্য দারার মধ্যে বহমান, তবে তাঁর ধর্ম অবস্থান নিয়ে দারা স্পষ্ট বক্তা। ইসলামি ধর্মতত্ত্বের বহিরঙ্গবাদী বা আহলে জাহিরদের বক্তব্য তিনি খারিজ করে দেন, ইসলামের অন্তরঙ্গ বা গুহ্য তত্ত্বেই তাঁর সন্ধিৎসা নিবদ্ধ। পড়াশোনার ঊর্ধ্বে মুরশিদের আশীর্বাদ তাঁর ভরসা, সাধনার জোরেই তিনি অন্তরঙ্গ পথের পথিক, গোপন রহস্য বোঝার অধিকারী। দারার আদর্শ দুনিয়াদারির মধ্যেই দীনদারিকে প্রতিষ্ঠিত করে সাধক বাদশাহ হয়ে ওঠা, এবং দরবেশী বাদশাহের রিয়াসত স্থাপন করা।

সুপ্রিয়ার মতে, শাহজাদা দারার বৃহৎ প্রকল্প উপনিষদের অনুবাদ, বৃহদারণ্যক, ছান্দোগ্য বা মুন্ডক উপনিষদের অংশ বাছাই করে ফারসিতে বেদান্তের এক সঙ্কলন তৈরি তাঁর উদ্দেশ্য। কবীন্দ্র সরস্বতীর নেতৃত্বে এক দল পণ্ডিত তাঁর সহযোগী ছিলেন, হিন্দি ভাষান্তর শুনে দারা ফারসি অনুবাদ সঙ্কলনের কাজ তদারক করতেন। মুঘল দরবারে অনুবাদের ক্রিয়াকাণ্ড নতুন নয়। আকবরের আমলে নল দময়ন্তীর অনুবাদ হয়েছে, মহাভারতের ফারসি অনুবাদও জনপ্রিয়।



কিন্তু সির-ই আকবর বা পরমরহস্য বলে নামাঙ্কিত বেদান্ত সঙ্কলনের অনুবাদের স্বলিখিত ভূমিকাতে দারা বলেছেন যে, সত্যান্বেষী আত্মজিজ্ঞাসু সাধক হিসেবেই একেশ্বেরবাদের উৎস তিনি উপনিষদে খুঁজে পেয়েছেন। কোরান প্রোক্ত গোপন বই বা কিতাব মকনুন-ই যে ‘উপনিখত’, এই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। এই আবিষ্কারই তিনি দুনিয়ার বিদ্বৎসমাজের সামনে হাজির করেছেন। অনুবাদে এই গুহ্য বইয়ের তত্ত্ব বোঝানোর জন্য বিশদ সংস্কৃতি-ফারসি শব্দকোষ সঙ্কলিত হয়েছে। ওঁ হয়েছেন আল্লা। ব্রহ্মার মতো দেবতারা তো জবরদস্ত ফিরিস্তা। তৌহিদ-এর অভেদ তত্ত্ব বোঝাতে শঙ্করভাষ্যের কথাও ব্যবহৃত হয়েছে এখানে।

দারা আদৌ ইসলামত্যাগী নন, বরং কোরানই যে একেশ্বরবাদের সর্বোত্তম প্রকাশ, এতে তাঁর সন্দেহ নেই। দারার মতে, ইসলামি একেশ্বরবাদ যেন এক ছাতা, তার তলায় অনেকের জায়গা আছে। বহুজনীন ইসলামের তত্ত্ব বোঝা ও বোঝানোর অধিকারী তাঁর মতো সাধক শাসক, এই অহঙ্কারটুকু তাঁর রচনার ছত্রে আছে। শাহি তখতের আদর্শ দাবিদারও তো তিনি। কিন্তু নিছক রাজনৈতিক স্বপ্নের ঊর্ধ্বে ভাবুক দারা ইসলামকে ভারতীয় সাধনার ঐতিহ্যের মানচিত্রে স্থান দিয়েছিলেন। তাঁর এই তাত্ত্বিক অবদান অনন্য।

দারা মার্কাস অরেলিয়াস নন, সেই পরিস্থিতি ও সুযোগ ছিল না। তবে মুঘল আমলের ধর্মতত্ত্ব চর্চার বিশেষ ধারার সঙ্গে দারা যুক্ত ছিলেন। যোগ কলন্দর, অমৃতকুণ্ড বা আবদুর রহমান চিশতির লেখা বইতে ভেসে বেড়ানো নানা হিন্দি ধারণা ও ইসলামি একেশ্বরবাদের টানাপড়েনের অন্বয় সাধনের চিন্তা দারার মনে দানা বেঁধেছিল। তিনি অবধারিত ভাবে সমন্বয়বাদী নন, বরং ক্রমান্বয়বাদী। দারা জানিয়েছেন যে, তাঁর পাঠককুল একান্ত ভাবে তাঁর কাছের মানুষ, কিছু আগ্রহী অভিজাত। কৌমী জনতার চিন্তা নিয়ে তিনি আগ্রহী হন।

হুমায়ুনের সমাধি সৌধের অঙ্গনে এক নামহীন কবরে দারার দেহকে গোর দেওয়া হয়, তাঁর রচনা বা গ্রন্থাগার রক্ষণাবেক্ষণ করতে শাহি দরবারের আগ্রহ ছিল না। অথচ ফারসি জানা হিন্দু ও মুসলিম পড়ুয়াদের মধ্যে দারার রচনার চাহিদা ছিল। মজমার আরবি অনুবাদ হয়, গৃহী কায়স্থের ব্যক্তিগত সংগ্রহে সির-ই-আকবর’এর পুঁথি পাওয়া দুষ্কর ছিল না। হ্যালহেড এই অনুবাদ গ্রন্থেরই ইংরেজি ভাষান্তর করেছিলেন, তবে ছাপিয়ে উঠতে পারেননি।

মুঘল আমলে ইসলামি শুদ্ধবাদী চিন্তার ভিত শেখ আহমদ সরহিন্দি ও শাহ ওয়ালিউল্লা মজবুত করেছিলেন, ফতোয়া ও ইসলামি আইন দুরস্ত আওরঙ্গজেব সেই ধারার প্রতিনিধি অন্য পক্ষে একেশ্বরবাদী ইসলামের রঙি বিরঙি প্রকাশের অনুসন্ধানীরা দারার রচনা ও তত্ত্বে অনুরক্ত ছিলেন। সুপ্রিয়ার লেখা দারার জীবনী সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে মুঘল ভারতের মেধা সাধনের একটি দিককে উদ্ভাসিত করে।

অভীক চন্দ সুলেখক, দারার প্রতি সহমর্মী। দারার সান্নিধ্য প্রত্যাশী তিনি, এ কালে থেকেই দারার মনোজগৎ ও অভিজ্ঞতার ছোঁয়াচ তিনি পেতে চান। কিন্তু তাঁর গবেষণায় বিশ্লেষণের প্রাখর্য কম। ফলে তাঁর আখ্যানকে অনেক কল্পচিত্র তৈরি করতে হয়। পিতা খুররমের বিদ্রোহের সময় পালাতে পালাতে কিশোর দারা সুন্দরী দাসীর সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পর্কে আগত হন, কথোপকথনটি পুরো এই বইয়ে দেওয়া আছে। সিন্ধু নদের তীরে শত্রুর হাতে বন্দি দারা জলকল্লোলের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত যোদ্ধার বিধবা পত্নীদের কান্নার শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের দরবারে বন্দি সুলেমান শিকোকে দেখে ঝরোখার আড়ালে শাহজাদি জেবউন্নিসা চোখের জল ফেলছিলেন। অশ্রুকণা অবশ্যই মুক্তোর মতন।

এই সব চিত্র বর্ণনা নিয়ে ঠিক তর্ক চলে না, তবে পক্ষে বা বিপক্ষে তেমন কোনও ঐতিহাসিক সাক্ষ্য নেই। অভীক চন্দের দারা অনেকটাই তাঁর ভাবা, ইতিহাসে সেই অস্তিত্বটা ফিকে। কল্পনার আতিশয্য ও উচ্ছ্বাস তাঁর রচনায় রসাভাস ঘটিয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু ঐতিহাসিক চিন্তা উস্কে দেয়নি।

দারার জীবনবৃত্তান্ত ও রচনা বোঝায় যে মুঘল ভারতের ইতিহাস কেবল শাহজাদাদের রাজবৃত্তীয় সাফল্য বা ব্যর্থতার কথা নয়। জায়গিরদার, জমিদার ও কৃষকদের টানাপড়েনে গড়ে ওঠা বা ভেঙে পড়া রাষ্ট্রব্যবস্থার কাহিনির চৌহদ্দিতেও সেই ইতিহাসকথা আবদ্ধ নেই। বোধ, বুদ্ধি ও বিশ্বাসের বুনটে গড়ে ওঠা নানা চিন্তা ও সত্তার আখ্যানও সম ভাবে সেই ইতিহাসের অঙ্গ। সত্তার নানা অভিজ্ঞানই তো ব্যক্তিকথা দেশকথা হয়ে ওঠে।

Advertisement