মিলিন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ও জুলিয়ান স্ট্রুবে সম্পাদিত, দশটি প্রবন্ধে বিন্যস্ত বইটি ২০১৮-য় মিউনিখে আয়োজিত মহাভারত বিষয়ক এক আলোচনাচক্রের ফসল। শিরোনাম থেকে স্পষ্ট, প্রাচীন বা প্রাক্-আধুনিক পর্ব এই বইয়ের মুখ্য উপজীব্য নয়। সুপ্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্যটি কী ভাবে আদি-আধুনিক কাল থেকে মূলত উনিশ ও বিশ শতক অবধি উপমহাদেশে, পশ্চিম, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এবং ইউরোপে রাষ্ট্রিক ও সামাজিক উপপত্তির নির্মাণে উপাদান ও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে, তার সানুপুঙ্খ পরিচয় পাঠক পাবেন। রাষ্ট্র ও সমাজ বিষয়ক তত্ত্বরাজি সতেরো শতক থেকে প্রধানত প্রতীচ্যের ভাবনা-বিশ্বকে আশ্রয় করেই বহমান। সংস্কৃত মহাভারত (আ: ৪০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ৪০০ খ্রিস্টাব্দ ব্যাপী রচনাকাল) বিবিধ ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষায় ও বিদেশি ভাষায় (বিশেষত ইংরেজিতে) অনূদিত এবং কিছুটা রূপান্তরিত হওয়ার কারণে সমকালীন দুনিয়ায়— প্রধানত তৃতীয় বিশ্বে— জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রগঠনে, ঔপনিবেশিকতার অবসানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমাজের আকল্পে যে উদ্দীপনা এনেছিল, সম্পাদকদ্বয় ও প্রাবন্ধিকেরা সেই অনুসন্ধানে ব্যাপৃত।
মহাভারতের আশ্রয়ে ও অনুপ্রেরণায় একাধারে রাজা ও কৃষক-সমাজ, বিদ্রোহী/বিপ্লবীগণ এবং রাষ্ট্রনায়কেরা, চিন্তাবিদ ও সক্রিয় আন্দোলনকারীরা অতীতের আলোকে সাম্প্রতিকের মোকাবিলা করে চলেছেন— বইয়ের এই সামান্য লক্ষণটি দর্শিয়েছেন সম্পাদকযুগল, ভূমিকায়। মহাভারত আদিতে ক্ষত্রিয়বীরগাথা হলেও, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর পর্বে ব্রাহ্মণ্যবাদী ও ভার্গব প্রাধান্যের (বিশেষত বৈষ্ণব মতাদর্শের প্রভাবে) সুবাদে শাস্ত্রপ্রতিম মান্যতা পেল। রাষ্ট্রসমাজের তত্ত্ব যদি ও যখন মহাভারতের ভিত্তিতে সন্ধান করতে হয়, তা হলে ব্রাহ্মণ্য মতাদর্শবাহী শান্তিপর্ব, অনুশাসনপর্ব ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার বচনের উপর ঝোঁক থাকে। বইটিতে সেই প্রবণতা প্রকট। গীতায় আত্মার অবিনশ্বরতা বিষয়ক ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’ বিখ্যাত উদ্ধৃতিটি দেওয়া হলেও (পৃ ৮) সম্পাদকদ্বয় খেয়াল করেননি, কার্যত তা কঠোপনিষদ থেকে প্রায় হুবহু আত্তীকৃত।
মিলিন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় বাদশা আকবরের নির্দেশে মহাভারতের ফারসি তর্জমা (রযমনামা) এবং চট্টগ্রামের প্রশাসক পরাগল খানের পৃষ্ঠপোষকতায় কবীন্দ্র পরমেশ্বর-কৃত বাংলা অনুবাদের নজির দেখিয়ে শাসকীয় বৈধতার আধার হিসেবে মহাভারতের মান্যতা দেখিয়েছেন (পৃ ১৪)। তবে, বঙ্কিমচন্দ্র জাতীয়তাবাদের উন্মেষ বোঝাতে শান্তিপর্বে ও গীতার মতাদর্শে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার যে সম্ভাবনা দেখান, তাতে ব্রাহ্মণ্যবাদী, পুনরুজ্জীবনপন্থী ভাবনার প্রাবল্য নিয়ে লেখকের মন্তব্য নেই। শান্তিপর্বে রাজ্যের উৎপত্তি নিয়ে চুক্তিপ্রতিম তত্ত্বের কথা জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদদের প্রাণিত করেছিল (পৃ ২৮)। মানুষ নিজেরাই অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে প্রথম শাসককে (মহাসম্মত) বেছে নিল, তার প্রাচীনতম উল্লেখ বৌদ্ধ দীঘনিকায়তে আছে— মহাভারতে নয় কিন্তু। পৃ ৩৩-এ রবীন্দ্রনাথের পারস্যযাত্রা (১৯৩২) নিয়ে কৃষ্ণ ও জরথুস্ট্রের উল্লেখ করলেন মিলিন্দ, কিন্তু ওই বৃত্তান্তের গোড়াতেই গীতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে তীব্র ও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ আছে তার সমতুল উচ্চারণ, তৎকালে কেবল আম্বেডকরই করেছেন। খুবই বিস্ময়কর যে গোটা বইয়ে এক বারের (পৃ ৩০) বেশি আম্বেডকর নিয়ে কোনও শব্দ নেই। ভূমিকায় শাঁওলী মিত্রের নাথবতী অনাথবৎ উল্লিখিত হলেও ইরাবতী কার্ভের যুগান্ত নিয়ে নীরবতার কী ব্যাখ্যা হতে পারে?
দ্য মহাভারত ইন গ্লোবাল পলিটিক্যাল অ্যান্ড সোশ্যাল থট
সম্পা: মিলিন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, জুলিয়ান স্ট্রুবে
১১৯৫.০০
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস
অলোক ওক-এর প্রবন্ধটি তথ্যসমৃদ্ধ; জাতীয়তাবাদের উষালগ্নে পণ্ডিতবর্গ ও গান্ধীজি-সহ বহু ব্যক্তি যে মহাভারত থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন, তার সুলিখিত পরিচয় দেবে। আচার্য বিনোবা ভাবের সর্বোদয় আন্দোলন যে গীতার আদর্শ-অনুসারী, ওক তা জানালেন বটে, তবে বললেন না, দেশে জরুরি অবস্থাকালীন দুঃশাসনের নৈতিক মদত দেওয়ার জন্য তিনি ‘অনুশাসনপর্ব’কে হাজির করেন (এর বিপ্রতীপে ‘কঠোর বিকল্পের কোনও পরিশ্রম নেই’— শঙ্খ ঘোষের শাণিত ব্যঙ্গ মনে পড়বেই)। ভগবদ্গীতার আধারে গান্ধীবাদী অহিংসার পদ্ধতিগত যে গভীর বিচার অর্কমিত্র ঘটক করেছেন (পৃ ৭৫-১০৭), তাতে অনাসক্তি-যোগ যথাযথ মনোযোগ পেয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ দ্বারা গুণ-কর্ম বিভাগের ভিত্তিতে চতুর্বর্ণ সৃজনের তত্ত্ব গীতায় আছে; তবে গীতার ১/৩৯-৪৩ এবং ৩/২৩-২৪ শ্লোকের প্রেক্ষিত থাকাও কাঙ্ক্ষিত ছিল। অর্জুন সশর ধনু ত্যাগ করেছিলেন শুধু স্বজননিধনের পাপের কারণে নয়, যুদ্ধে পুরুষশূন্যতা ঘটলে পরিবার নস্যাৎ হয়ে অবধারিত বর্ণসঙ্কর আর কুলনারীদের দূষিতা (স্ত্রীষু দুষ্টাসু) হওয়ার আশঙ্কাতেও। পরে শ্রীকৃষ্ণের বাণী ছিল: তিনি অতন্দ্রিত হয়ে সদা কর্মনিরত, নচেৎ তিনিও বর্ণসঙ্করের হেতু (সঙ্করস্য কর্তা) হতেন, প্রজাহন্তাও হতেন। বর্ণাশ্রম মেনে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র কি সামাজিক স্থিতি, সুনীতি ও ন্যায় নিশ্চিত করতে পারে? এই প্রশ্নের স্পষ্ট মোকাবিলা কিন্তু পাইনি।
গ্রন্থভুক্ত সেরা দু’টি নিবন্ধ: বিশ ও একুশ শতাব্দীতে মহাভারত-অনুসারী আদর্শ ভারতীয় নারীর নির্মাণ ও বিনির্মাণ (মেলানি জে ম্যুলর, পৃ ১৩৭-৬০) এবং স-লিথোগ্রাফ ফারসি ও উর্দুতে মহাভারতের ভারতীয় ও ইরানীয় আখ্যান (আমান্ডা লানযিল্লো, ১৬১-৮৫)। মহাভারতের নারীদের প্রশ্নশীল উন্মোচন ঘটেছে বীণা জি-র ও পামেলা লথস্পাইখের দু’টি তাত্ত্বিক বই এবং মহাশ্বেতা দেবীর ছোটগল্পের একটি সঙ্কলন ঘিরে। স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীসমাজকে শামিল করার কৃতিত্ব গান্ধীজিকে দিয়েও ম্যুলর-এর অভিমত, সাবেক পুরুষতান্ত্রিক পরিবার ও সমাজ-আদর্শ অনুসরণই যে নারীর প্রধান কর্তব্য— সে ব্যাপারে মহাত্মা ছিলেন নির্দ্বিধ। নওলকিশোর প্রেস-এর অসামান্য প্রয়াসে মহাভারতের উর্দু অনুবাদ ভারতে ও ইরানে যুগপৎ জাতীয়তাবাদী আবেগের আধার হয়েছিল, লানযিল্লো-প্রণীত বয়ানটি পাঠকের টান-টান অভিনিবেশ দাবি করে (পৃ ১৬৯ ও ১৭২ অবশ্যই)। তার সঙ্গে মিলিয়ে পড়া যায় বাহ্ল এবং আব্দাল্লাহ্ সউফান-এর প্রবন্ধ (পৃ ২৫৭-৭২): ওয়াদি অল-বুস্তানি মহাভারতের স্বকৃত আরবি অনুবাদে যে ভূমিকা লিখেছিলেন, তার আলোচনাও। জার্মানিতে (ভারততত্ত্বের আঁতুড়ঘর) হুম্বোল্ড এবং হেগেল কেমন বিচার করেছিলেন গীতার (পাউলুস কাউফমান: পৃ ১৮৬-২১৬); জাপান ও চিনে ভারতীয় মহাকাব্যের ব্যবহার উনিশ ও বিশ শতকে কেমন ছিল (এগুস মনিত্জ় বান্ডেইরা: পৃ ২১৭-৪০); শ্যামদেশে মহাভারতের আবেদন নিয়ে বিচার (ডেভিড এম মালিত্জ়: পৃ ২৪১-৫৬)— এই প্রবন্ধগুলি বহির্ভারতে (বিশেষত এশীয় জাতীয়তাবাদের উত্থানের প্রশ্নে) মহাভারত নিয়ে আগ্রহ উদ্দীপনা তুলে ধরে। শ্যামদেশ নিয়ে নিবন্ধটি দুর্বল— লেখকের ইতিহাসবোধ এখানে কিঞ্চিৎ দুর্বল বলে। তাইলান্ডের প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র দ্বারবতীর (সপ্তম শতকেই ষুয়ান জাং সম্যক অবহিত ছিলেন) নামকরণ গুজরাতের দ্বারকার আদলে ঘটেছিল (এর একমাত্র সমর্থন দ্বাদশ শতাব্দীর জৈন পণ্ডিত হেমচন্দ্রের লেখা ত্রিষষ্ঠীশলাকাপুরুষচরিত-এ আছে), তা প্রমাণ করার দুশ্চেষ্টা চালিয়েছেন তিনি।
এই বইয়ে শ্রীকৃষ্ণ সরাসরি বা পরোক্ষে অগ্রাধিকার পেয়েছেন (প্রচ্ছদের ছবিও সেই বার্তাবাহী)। তার দরুন মহাভারতের দু’টি অতি তাৎপর্যপূর্ণ তত্ত্ব আনৃশংস্য (নৃশংসতা তথা নিষ্ঠুরতা পরিহার) ও অনুক্রোশ (অপরের বেদনায় কাঁদা— সহানুভূতি নয়, বরং সমানুভূতি) নিয়ে ইদানীং স্বদেশি-বিদেশি বিজ্ঞজনেরা যে মূল্যবান আলোকপাত করেছেন তা এখানে অনুপস্থিত। তার নিট ফল: ওই দুই সুনীতির প্রধান প্রবক্তা যুধিষ্ঠির বইয়ে উধাও (নির্ঘণ্টেও বাদ)! কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাক্কালে যুধিষ্ঠির কুরুবৃদ্ধদের কাছে মিনতি করেন, যে ভাবে হোক এই রক্তক্ষয় রোধ করার। তাঁদের অসহায় উত্তর ছিল: মানুষ অর্থের দাস, অর্থ কারও দাস নয়; অর্থের কারণে তাঁরা কৌরবদের কাছে বাঁধা পড়েছেন। স্যাঙাতপ্রধান ধনতন্ত্র যে মৃত্যুমিছিলের নিপুণ আয়োজন করছে, তাতে উক্তিটি থমথমে হয়ে ওঠে। “বকের আশ্চর্য প্রশ্ন যুধিষ্ঠির বুঝেছিল ঠিক,/ বাস্তবিক—/ অবশ্য-মৃত্যুর ছন্দে খুঁজে ফেরা তালের বিচ্যুতি,/ অনির্বাণ জীবনের অলীক আকুতি—/ এর চেয়ে বিস্ময়প্রয়াস,/ এখনো লেখেনি মর্তে মানুষের স্বল্প ইতিহাস।” (এবং ইন্দ্রজিৎ, বাদল সরকার)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)