E-Paper

উত্তরাধিকার ও বহুস্বর

মালিয়া ভট্টাচার্যের ‘দ্য স্কারস অব টাইম সিরিজ়’ প্রদর্শনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পোড়ানো কাগজ, প্রাপ্ত বস্তু ও ড্রয়িং-এর দগদগে মিশেল জীবনের চিহ্ন বহন করে।

পিয়ালী গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০৭
সম্মিলিত: অ্যাকাডেমিতে ‘দ্য গ্রুপ’-এর প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

সম্মিলিত: অ্যাকাডেমিতে ‘দ্য গ্রুপ’-এর প্রদর্শনীর চিত্রকর্ম।

বাংলার শিল্পপরিসরে ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘দ্য গ্রুপ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ দল। নারীশিল্পীদের যে পরিসর এক সময়ে সীমিত ছিল, এই গোষ্ঠী ধীরে ধীরে তা প্রসারিত করেছে। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত মাথায় রেখেই বর্তমান প্রদর্শনীর দিকে তাকাতে হয়। শানু লাহিড়ী, করুণা সাহা, সন্তোষ রোহাতগী, মীরা মুখোপাধ্যায় ও শ্যামশ্রী বসুর মতো শিল্পীদের উত্তরাধিকার বহন করে আজকের প্রজন্ম হাজির।

অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের নিউ সাউথ গ্যালারিতে ‘দ্য গ্রুপ’-এর এটি ৪২তম উপস্থাপনা। স্বভাবতই একটি দীর্ঘ যাত্রার নথি। নিছক উত্তরাধিকার রক্ষার চেষ্টা নয়, সমকালীন অভিজ্ঞতার নতুন ব্যাখ্যা। এখানে নারীবাদ কোনও ঘোষণাপত্র নয়। কাজের মধ্যে নিহিত শক্তিতেই তা প্রকাশিত। মাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং নিজস্ব ভাষার দাবি এখানে স্পষ্ট। চিত্র, ভাস্কর্য ও মিশ্র-মাধ্যমজনিত শৈলী কোনও একরৈখিক ভাষ্য তৈরি করেনি, বরং বহুস্বরের সহাবস্থান ঘটিয়েছে কাজগুলিতে।

প্রদর্শনীতে মিনতি নাথের ‘কনসেনট্রেট’ কাজটি মনোজগতের বিশেষ খোঁজ। কোনও নির্দিষ্ট পরিচয়ে আবদ্ধ নয়। রেখা দ্বিধাগ্রস্ত। গাঢ় রং ও অনিশ্চিত আলোর ব্যবহার মিলে একটি অন্তর্মুখী চাপ। এক নিঃশব্দ পরিবেশের ঘেরাটোপে নারীরা যেন চিন্তান্বিত। সুদেষ্ণা দাসের কাজের অনুপ্রেরণা হল প্রকৃতি। তিনি গাছপালা, পোকামাকড়, এমনকি জড় বস্তুকেও প্রকৃতিরই একটি অংশ হিসেবে দেখেন। তাঁর ‘স্টিল লাইফ’-এর (অ্যাক্রিলিক) বিষয় আপাত ভাবে নিরীহ হলেও, স্বচ্ছ কাচের ভিতর দিয়ে অস্থিরতা প্রকাশ পায়।

মালিয়া ভট্টাচার্যের ‘দ্য স্কারস অব টাইম সিরিজ়’ প্রদর্শনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পোড়ানো কাগজ, প্রাপ্ত বস্তু ও ড্রয়িং-এর দগদগে মিশেল জীবনের চিহ্ন বহন করে। স্তরবিন্যাস, সেলাই ও গেঁথে দেওয়ার নিয়ন্ত্রণে শিল্পীর সচেতন সিদ্ধান্ত স্পষ্ট। কাজের বেশির ভাগই উদ্ভূত এমন এক আগ্রহ থেকে, যেখানে স্মৃতি বস্তুর মধ্যে বাস করে। স্মৃতি এখানে ক্ষত হিসেবে উপস্থিত। সীমা ঘোষ ভট্টাচার্যের প্রক্রিয়া বেশ শক্তিশালী। ছবির নাম, ‘উইদিন মি’। প্রকৃতপক্ষে আত্মানুসন্ধানের একটি ইঙ্গিত। রূপান্তরিত বুননে গঠিত হয় ক্ষতের অনুলিপি। তারই মধ্যে একটি ক্ষুদ্র আলো, আশার মতো জ্বলতে থাকে। অ্যাসিড-ফ্রি পেপারে টেক্সচার জুড়ে অতীতের হাহাকার। কাজটি নীরব, কিন্তু গভীর।

প্রকৃতিকে সরাসরি অনুকরণ না করে, অনুভূতির মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন রিনা মুস্তাফি। স্প্যাচুলায় তেলরঙের মুক্ত স্ট্রোক ও উচ্চকিত রঙের একটি কম্পোজ়িশন। ফর্ম ভাঙার বিমূর্ত পথে উথালপাথাল হয় ইমপ্যাস্টোর প্রকৃতি। মধুশ্রী মুচ্ছলের ‘হুইস্পার অব ডন’ ভিন্ন প্রকৃতির। ক্যানভাসে তেলরঙের আলো। নীল ও হলুদের মৃদু সংলাপ। ফুলের উপস্থিতি এখানে আলঙ্কারিক নয়। বাস্তব ও বিমূর্তের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা এক সকালের অনুভব। প্রতিটি চিত্রকর্মে স্তরে স্তরে লাগানো রঞ্জক এবং সূক্ষ্ম ইঙ্গিত আধিভৌতিক প্রতিফলনের আভাস দেয়।

সমকালীন শহরের অভিজ্ঞতা ফুটে ওঠে তমালী দাশগুপ্তের কাজে। আমরা এক দিকে ক্রমাগত বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত, আবার নিকটবর্তী পরিবেশের সঙ্গে মানসিক সংযোগের অভাব অনুভব করি। ছোট ছোট ফ্রেমে আবদ্ধ ‘কানেক্টেড, ডিসকানেক্টেড’ সিরিজ়ে উঠে আসে এই খণ্ডিত দৃশ্য। সংযোগ ও বিচ্ছিন্নতার দ্বিত্ব স্পষ্ট তুলে ধরা। বলা ভাল এটি ডিজিটাল সময়ের মানসিক মানচিত্র। মিশ্র মাধ্যমে ন্যূনতম রঙের ব্যবহারে বিষয়টি জোরালো হয়ে ওঠে। মহুয়া ভট্টাচার্যের কাজে রূপকথার অনুষঙ্গ চোখে পড়ে। শিল্পীর চিত্রকর্মে প্রকৃতি ও প্রাণী একই সঙ্গে বর্ণিত। তাঁর ‘এক্সুইজিট বিউটি’ ছবিটিতে রূপকের আধারে একটি হরিণ। তিনটি স্তরের স্থান-বিভাজনে রং বেশ উজ্জ্বল। লোকশিল্পের ফরম্যাটে ডটের ব্যবহার জর্জ সুরাট এবং পল সিগন্যাকের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।

ভাস্কর্য বিভাগে বনশ্রী খানের ‘এনটুইন্ড ইন লাভ’ আলাদা করে চোখে পড়ে। দু’টি শরীরের প্রেমকাব্য। পারস্পরিক নির্ভরতা ও গতি, ভাস্কর্যের স্থবিরতা ছাড়িয়ে যায়। এখানে রোম্যান্টিকতা দেখা গেলেও তা সহজ নয়। নীচে সারিবদ্ধ মুখাবয়ব সমাজের চাপের ইঙ্গিত দেয়। মূলত ব্রোঞ্জের গড়নে মানবিক সম্পর্কের জটিলতা ধরা পড়ে। প্রদর্শনীতে আর একটি নির্মাণ উল্লেখ্য। নীলিমা গোয়েলের ‘মঙ্ক’, ব্রোঞ্জনির্মিত এই ফর্মটি স্থির। মাথা নত, শরীর বাঁকানো। অতিরিক্ত কিছু বলা নেই, সংযমই শক্তি।

পূর্বসূরিদের পথকে সম্মান জানিয়ে, সেই পথেই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন শিল্পীরা। তবে দীর্ঘ ইতিহাসের ভার বহন করলে, প্রত্যেক উপস্থাপনার কাছেই প্রত্যাশা বাড়ে। তাই সব কাজই একই গভীরতায় পৌঁছেছে এমন দাবি করা যায় না। কোথাও ধারণা স্পষ্ট হলেও রূপায়ণ থেমে গিয়েছে পরিচিত ভঙ্গিতে। কিছু কাজে মাধ্যমের ব্যবহার প্রত্যাশিত মাত্রায় যায় না। এই অসমতাই মনে করিয়ে দেয় উত্তরাধিকার শুধু গৌরবের নয়, দায়েরও।

এই প্রদর্শনী মনে করিয়ে দেয়, শিল্পে পরিচয় লিঙ্গনির্ভর নয়। আবার ইতিহাসের দায় এড়ানোও যায় না। এই দুইয়ের মধ্যবর্তী জায়গাতে দাঁড়িয়ে আছে ‘দ্য গ্রুপ’। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নয়, সময়কে বুঝে এগোনোর একটি চলমান প্রয়াস।


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Academy of Fine Arts

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy