বাংলায় বন্যা অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়। পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ জেলার নদী-তীরবর্তী মানুষজন কার্যত বন্যার সঙ্গেই ঘর করেন। তার মধ্যে রাঢ় বঙ্গের জেলাগুলি— মুর্শিদাবাদ বাঁকুড়া বীরভূম বর্ধমান হুগলি হাওড়া ও মেদিনীপুরের বন্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন লেখক। উঠে এসেছে দামোদরের হঠাৎ-বন্যার কথা। এমন বিধ্বংসী বন্যা অবশ্য বার বার হত না। প্রচুর বৃষ্টিপাতের ফলে হঠাৎ জলবৃদ্ধিতে নদীতে দেখা দিত আচমকা প্লাবন। স্থানীয় জনজাতিভুক্ত মানুষ একে ‘হড়পা বান’ বলতেন, যে শব্দবন্ধ ভারতের বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে এখন প্রতি বর্ষায় শোনা যায়, যার সুবাদে ক্ষয়ক্ষতি, জীবন ও সম্পত্তিহানি আকাশ ছোঁয়। উপরোক্ত প্রতি জেলায় ১৮৬০ থেকে ১৯৫০-এর মধ্যে বন্যার প্রকোপ, আর্থ-সামাজিক জীবনে তার প্রভাব, বন্যা প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগের কথা বইয়ে সবিস্তার আলোচিত। রয়েছে বন্যা ঘিরে আবর্তিত সমসাময়িক রাজনীতির কথাও। বন্যা বিষয়ে সংগৃহীত গান ছড়া প্রবাদ তথ্যভারের ক্লান্তি দূর করে।
বন্যা ও রাঢ় বাংলা (১৮৬০-১৯৫০)
মুসাদ্দেক হোসেন
৫০০.০০
আশাদীপ
জল বাতাস লতাপাতার সঙ্গে মানুষের সখ্য এই সেদিনও ছিল নিবিড়। বাংলায় মাটির কলসি, শীতলপাটি, খাওয়ার পাতে মরসুমি আনাজের উপস্থিতি, ফড়িং, প্রজাপতি, শিশির-ভেজা ঘাসের মধ্য দিয়েই শৈশবের আলাপ হত প্রকৃতির সঙ্গে। সেই প্রকৃতি-নির্ভরতা থেকে ক্রমে সরে যেতে থাকল বেঁচে থাকার ভরকেন্দ্র, পরিবর্তন এল শুধু মানবমনে নয়, রান্নাঘর থেকে আসবাবপত্র, সর্বত্র। বাংলার পরিবেশ ও অভ্যাস বদলের সেই সময়ই ধরা পড়েছে লেখক-কলমে। লেখক জানিয়েছেন, কী ভাবে পাড়াগাঁয়েও ব্যাকহো লোডার-এর প্রবল উপস্থিতি হাতের জাদু ও লোকপ্রযুক্তির ঐতিহ্য ছুড়ে ফেলে পুকুরগুলির মৃত্যুর আয়োজন সম্পূর্ণ করছে, সাধারণ মাছ-ভাতের গ্রাসেও অনায়াসে ঢুকছে বিষ। মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে চিরচেনা প্রাণিজগতের। শুরুতে এক অমোঘ সত্য উচ্চারিত: প্রকৃতিতে অত্যাচারী ও অত্যাচারিত কখনও দু’টি স্থায়ী অবস্থান নয়। কেন নয়, বুঝতে এমন বই জরুরি।
দু’মলাটে কলকাতার রাস্তা ও পার্কের গাছপালার সঙ্গে সাধারণ মানুষের পরিচয় করানোর প্রথম দিকের উদাহরণ ১৯৪৬-এ প্রকাশিত এ পি বেনথাল-এর দ্য ট্রিজ় অব ক্যালকাটা অ্যান্ড ইটস নেবারহুড। তবে সরকারি বনসৃজন প্রকল্পের বাইরেও গাছপালার আশ্চর্য দুনিয়া ছড়িয়ে আছে শহরের রেললাইন, নয়ানজুলি ও রাস্তার ধারের জমিতে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা রাজভবনের প্রাচীন উদ্যানে। কলকাতার গাছ নিয়ে উল্লেখযোগ্য সংযোজন এই বইটি: কলমি অনন্তলতা কালকাসুন্দা থেকে বট পাকুড় কামরাঙা হয়ে কুইকস্টিক আকাশনিমের মতো চেনা-অচেনা অল্প-চেনা গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছেন লেখক। এ-সব গাছ কোথায় দেখেছেন, তার পাশাপাশি বলেছেন এদের ফুল ফোটার সময়ের কথা, যাতে উৎসাহীরা খুঁজে পেতে পারেন সহজে। কলকাতায় আকাশনিম গাছের দু’টি নমুনার কথা বলা হয়েছে, তার বাইরেও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাগানেও মেলে এর একাধিক নমুনা। বইটির অভিনব অংশ, বাংলা সাহিত্যে এ-সব গাছের উদ্ধৃতি। সাহিত্য ও উদ্ভিদ-চর্চার মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে বইটি।
‘তালদিঘিতে ভাসিয়ে দেব, চলবে দুলে দুলে।’ রবীন্দ্রগানের তালদিঘি সত্যিই আছে দক্ষিণ দিনাজপুরে, সঙ্গে আরও কত: তপনদিঘি, মহীপালদিঘি, গড়দিঘি, আলতাদিঘি, কালদিঘি, ধলদিঘি, প্রাণসাগরদিঘি, ধরলদিঘি। এত দিঘির সমাবেশ পশ্চিমবঙ্গের এই ছোট্ট জেলাটিকে করে তুলেছে অনন্য। আত্রেয়ী পুনর্ভবা টাঙন নদীর জলে ধোয়া, দিঘি পুকুর জলাশয়ে সমৃদ্ধ দক্ষিণ দিনাজপুরের জলসম্পদ নিয়ে সূরজ দাশের সনিষ্ঠ গবেষণার পরিচয় এই বই। জেলার নদী খাঁড়ি বিলের কথা তো বটেই, আলাদা করে জেলার ব্লক ধরে ধরে তিনি লিখেছেন দিঘিগুলির কথা— তথ্যের পাশাপাশি দিঘিগুলির সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও ধরে রেখেছেন, লোককথার উপাত্তও বাদ দেননি। বাংলার জলসম্পদের অতীত ও বর্তমানের বৃহত্তর তুলনামূলক আলোচনায় নির্দিষ্ট জেলাভিত্তিক গবেষণাকাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, বইটি তার দৃষ্টান্ত।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)