• নিজস্ব প্রতিবেদন
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

লকডাউনের আগে বাজার উপচে ভিড়ে

Market
লকডাউনের আগে বাজার করে নিচ্ছেন অনেকেই। ক্যানিং বাজারে। ছবি: প্রসেনজিৎ সাহা

জনতা কার্ফু, লকডাউন, গুজব— এই তিন ধাক্কায় সোমবার সকালের বাজার পরিণত হল কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রে। আনাজ বাজার থেকে মুদিখানা, কোথাও দীর্ঘ লাইন পড়ল, কোথাও বাধল হাতাহাতি। ভিড় নিয়ন্ত্রণ বা পরিস্থিতি সামাল দিতে কোথাও কোথাও পুলিশ বাজারে হানা দিলেও তাতে বিশেষ লাভ হয়নি বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। দোকানিরা ক্রেতাদের আশ্বস্ত করেছেন, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দোকান খোলা থাকবে। জিনিসপত্রের জোগানও স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হবে। কিন্তু সারা দিনের গতিবিধি দেখে মনে হয়েছে, সে কোথায় বিশেষ ভরসা করতে পারেনি জনতা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, প্রশাসন থেকে কেন কেনাকাটার সর্বোচ্চ পরিমাণ বেঁধে দেওয়া হচ্ছে না?

ক্রেতাদের অভিযোগ, অতিরিক্ত কেনাকার ফলে কালোবাজারি শুরু হয়ে গেছে। জিনিসপত্রের দাম আচমকাই অনেকটা বেড়ে গিয়েছে। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে রবিবার রাতের দিকে কিছু দোকান খুলেছিল। জিনিসপত্র কেনার জন্য ক্রেতাদের হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। সোমবার সকালে বাজারের ভিড় দেখে প্রবীণদের অনেকেরই যুদ্ধ পরিস্থিতির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সরকার থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, মুদিখানা, আনাজ থেকে শুরু করে জরুরি জিনিসপত্রের দোকান খোলা থাকবে। কিন্তু সোমবার সাত সকালেই কাঁচরাপড়া, হালিশহর, নৈহাটি, শ্যামনগর, কাঁকিনাড়া, ইছাপুর, ব্যারাকপুর সর্বত্রই আনাজের বাজারে হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে যায়। 

পলতা স্টেশন-সংলগ্ন বাজারে আলু কেনা নিয়ে কার্যত হাতাহাতি বেধে যায় ক্রেতাদের। শেষ পর্যন্ত বিক্রেতা দোকান বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এক ক্রেতা বেশি পরিমাণ আলু কিনতে চাওয়া নিয়ে অন্যান্য ক্রেতাদের সঙ্গে ঝামেলা বাধে। পুলিশ এসে ক্রেতাদের সাবধান করে দেয়, কাউকে এক সঙ্গে বেশি জিনিসপত্র দেওয়া যাবে না।      

এ দিন ভোর থেকে লাইন পড়ে যায় বসিরহাটের বিভিন্ন বাজারে। সকলেই আগেভাগে জিনিসপত্র কিনে বাড়ি ফিরতে চান। তা নিয়ে ক্রেতাদের  মধ্যে বচসা শুরু হয়। পুলিশ বাজারে গিয়ে আলুর দাম কেজি প্রতি ২০ টাকা বেঁধে দিলেও, কিছু বিক্রেতা ২৫ টাকা কেজি দরে আলু বেচেছেন বলে অভিযোগ। ক্রেতাদের অভিযোগ, তিন দিন আগে যে চাল এক কেজি ৩০ টাকায় বিকিয়েছে, সোমবার তার দাম ওঠে ৪০ টাকায়। বিক্রেতারা জানান, আড়তদারেরা দাম বাড়ানোয় তাঁরাও বেশি দামে বেচতে বাধ্য হচ্ছেন। স্বরূপনগর, সন্দেশখালি, বাদুড়িয়া, মিনাখাঁ, হাড়োয়া থেকেও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ আসতে শুরু করে। পুলিশ কোনও কোনও বাজারে হানা দিয়ে বিক্রেতাদের সাবধান করে দেয়। বসিরহাটের নতুন বাজারের ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক প্রদীপ কুণ্ডু বলেন, “দোকানিদের বলা হয়েছে, দাম বাড়ানো বরদাস্ত করা হবে না।” বসিরহাট পুলিশ জেলার সুপার কঙ্কর প্রসাদ বাড়ুই বলেন, “কালোবাজারি করলে রেয়াত করা হবে না। অভিযোগ প্রমাণ হলে বিক্রেতাকে গ্রেফতার করা হবে।” 

লকডাউন ঘোষণা হতেই ডিমের কালো বাজারি শুরু হয়েছিল বনগাঁ শহরের গাঁধীপল্লি এলাকায়। ৬৬০ টাকা ডিমের ক্রেট বিক্রি হচ্ছিল ৭৫০ টাকায়। অভিযোগ পেয়ে বনগাঁ থানার পুলিশ এসে ডিম ব্যবসায়ীর চালান দেখে পুরনো দামেই বিক্রি করার নির্দেশ দেয়। পুলিশের তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, কেউ জিনিসপত্রের দাম বেশি নিলে আইনি পদক্ষেপ  করা হবে।

সোমবার সকাল থেকে বনগাঁর বিভিন্ন বাজারে ক্রেতাদের ভিড় উপচে পড়ে। পুলিশ বনগাঁর ট’বাজার, নিউ মার্কেট-সহ বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালায়। আনাজ, চাল-ডাল, মাছ-মাংস বেশি দরে বিক্রি বন্ধ করতে পদক্ষেপ করে। পুলিশি হস্তক্ষেপে কেজি প্রতি আলুর দর ২৫-৩০টাকা থেকে ১৮-২০ টাকায় নেমে আসে। পুলিশ জানিয়েছে, কৃত্রিম ভাবে অভাব তৈরি করে কালোবাজারি করতে দেওয়া হবে না। গোবরডাঙা এলাকাতেও পুলিশ রবিবার থেকে বেআইনি মজুতদারির বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে।

এমনিতেই বাজারে ভিড় তার উপরে জিনিসের মাত্রাতিরিক্ত দাম— এই অভিযোগ পেয়ে হাসনাবাদের বাজারেও হানা দেয় পুলিশ। একদিকে যেমন বিক্রেতাদের সাবধান করে, যাতে কেউ পণ্য মজুত করে কালোবাজারি না করেন, অন্য দিকে ক্রেতাদেরও সচেতন করা হয়, যাতে কেউ বেশি জিনিসপত্র কিনে অন্যদের অসুবিধায় না ফেলেন। পুলিশ আশ্বাস দিয়েছে, লকডাউন হলেও আনাজ-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস মিলবে।

উত্তর ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, "মানুষ স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে যে সচেতনতার পরিচয় দিচ্ছেন, কেনাকার ক্ষেত্রে সেই সচেতনতা এবং সংযম দেখাতে পারলে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের খুবই সুবিধা হবে।"

সোমবার বিকেল থেকেই সরকারি নির্দেশে রাজ্যজুড়ে জরুরি কিছু পরিষেবা ছাড়া বাকি সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। লক ডাউনের আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুত করতে সকাল থেকে বাজারে লাইন দেন মানুষ। করোনা-সতর্কতায় এক জায়গায় বেশি মানুষের জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ-প্রশাসন। তবে সে নিষেধাজ্ঞায় তোয়াক্কা না করেই এ দিন মুদিখানা থেকে আনাজ, মাছ, মাংসের দোকানে ভিড় করেন মানুষ।

অভিযোগ, এই সুযোগে একশ্রেণির ব্যবসায়ী মাছ, মাংস, আনাজ-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই নিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে ঝামেলাও বাধে কোথাও কোথাও। দাম নিয়ন্ত্রণে অনেক জায়গাতেই বাজার পরিদর্শন করেন প্রশাসনের লোকজন।

ক্যানিং বাজারে মাছ, মাংস-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অনেকটাই বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। দাম নিয়ন্ত্রণে ক্যানিং ১ পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য তথা ব্লক যুব তৃণমূলের সভাপতি পরেশরাম দাসের নেতৃত্বে যুব তৃণমূল কর্মীরা বাজারে হানা দেন। ক্যানিং ১ বিডিও নীলাদ্রিশেখর দে ও ক্যানিং থানার আইসি অমিত হাতিও বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালান। এ দিন হঠাৎই ডিম নিয়ে কালোবাজারির অভিযোগ ওঠে ক্যানিং বাজারে। খবর পেয়ে ডিম মজুত করার অপরাধে একটি গুদাম সিল করে দেন আধিকারিকেরা। বিডিও বলেন, ‘‘লকডাউন হলেও নিত্য প্রয়োজনীয় দোকান বা পরিষেবা খোলা থাকবে। ফলে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নিয়ে যাতে কালোবাজারি না হয়, সে দিকেও নজর রাখা হচ্ছে।’’ সকাল থেকেই উপচে পড়া ভিড় ছিল ভাঙড়ের বিভিন্ন বাজারে। জিনিসপত্র কেনার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায় মানুষের মধ্যে। কোথাও কোথাও বচসাও বাধে। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দাম বাড়ানোর অভিযোগও ওঠে। সরকার আলুর দাম ১৮ টাকায় বেঁধে দেওয়ার পরেও বেশ কিছু জায়গায় ২০-২২ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ। পুলিশ প্রশাসনের তরফে একাধিক বাজারে অভিযান চালানো হয়। ক্রেতারা জানান, বাজারে পুলিশ ঢুকতেই ১৮ টাকা কেজি দরে আলু বেচতে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা।

একই ছবি দেখা যায় ডায়মন্ড হারবার, কাকদ্বীপ, জয়নগরের বিভিন্ন বাজারে। প্রশাসনের তরফে জরুরি পরিষেবা চালু রাখার কথা বারবার বলা হলেও, লকডাউন হচ্ছে শুনেই সকাল থেকে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস মজুত করতে শুরু করে দেন মানুষ। চড়া দামেরও তোয়াক্কা করেননি অনেকে। অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত চাল, ডাল, আলু, আনাজ মজুত করে নেন। চাহিদার জেরে বহু জায়গাতেই বাজার খোলার কিছুক্ষণের মধ্যে অধিকাংশ মালপত্র শেষ হয়ে যায়। সমস্যায় পড়েন পরে বাজারে আসা বাকি ক্রেতারা।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন