Advertisement
E-Paper

এক না-দেশের অধিবাসী

আর কথাকার মান্টোর যাবতীয় বিড়ম্বনার উৎস এই বিষয়টি, বলা ভাল, এই বিষয় উপস্থাপনার কৌশলটি। নারীলাঞ্ছনার বিচিত্র সব কৌশল খুলে দেখিয়েছেন বলেই তাঁর বিরুদ্ধে এসেছে অশ্লীলতার অভিযোগ।

সোমেশ্বর ভৌমিক

শেষ আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০১৮ ০০:০৮
মান্টো ছবিতে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি।

মান্টো ছবিতে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকি।

নন্দিতা দাশের ‘মান্টো’ ছবির একটি দৃশ্যে মান্টোর স্ত্রী সাফিয়া ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলেন, আমাদের জীবনটা আপনার গল্পের চরিত্রদের কাজ-কারবারের থেকে অনেক আলাদা সা’দসাব। দর্শকদের অনেকেই তখন সাফিয়ার উচ্চারণের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে ফেলেছেন। অস্ফুটে একটা সাফাই অবশ্য দিয়েছিলেন মান্টো। তবে লাহৌর-বাসের সেই পর্বে জীবিকাহীনতা, অসহায়তা, মর্মবেদনা, আর তথাকথিত শুভানুধ্যায়ীদের শঠতায় ধ্বস্ত মান্টো তখন দর্শকদের করুণার পাত্র। ছবির সেই মুহূর্তের মেজাজ আর উপস্থাপনার যুক্তি অনুযায়ী তাঁর সাফাই বিশেষ দাগ কাটেনি। কিন্তু ছবি শেষ হলে আমরা উপলব্ধি করি, এই দৃশ্যেই লুকোনো আছে পরিচালক তাঁর ছবিতে মূল চরিত্রটিকে কোন সুরে বাঁধতে চেয়েছিলেন, তার হদিস। ঠিক যেখানে সাফিয়ার আপত্তি, সেটাই নন্দিতার ধরতাই: সাদাত হাসান মান্টোর লেখা ছোটগল্পের বিচিত্র সব চরিত্র।

ছবি শুরু হয় লেখকের প্রথম জীবনের গল্প ‘দশ রূপয়ে’-র সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা দিয়ে। কিশোরী গণিকা সরিতা খরিদ্দারের মনোরঞ্জন করার বিনিময়ে পায় দামি গাড়িতে চড়ার, ভাল হোটেলে ঢোকার সুযোগ। কিন্তু এই গল্পে দু’জন অনভিজ্ঞ খরিদ্দার সরিতার উচ্ছলতা আর ব্যবহারের জাদুতে তাকে ভোগ করার সুযোগ পায় না, মদ্যপান করে এলিয়ে পড়ে। এর পর গাড়ির চালককেও কথার মারপ্যাঁচে ভুলিয়ে বাড়ি ফিরে আসে সরিতা। যাত্রার শুরুতে দশ টাকার যে নোটটা হাতে এসেছিল তার, সেটা অবহেলায় ছুড়ে দিয়ে আসে গাড়ির মধ্যে। বিনা পরিশ্রমের ধন যে! এই মোচড়ই মান্টোর খাস কারদানি। ছবিতে এই মোচড়টা আমরা শুনি সাফিয়ার মুখে, যেন এইমাত্র লেখা গল্পটি পড়ে ফেললেন উনি। স্বামীর কৃতিত্বের আভায় উদ্ভাসিত সাফিয়ার মুখ। মান্টোও সুখী এক সাংসারিক মানুষ। অবশ্য সাহিত্যজীবনে প্রাথমিক সাফল্যের এই পর্বেও বন্ধুদের কাছে নিজের সাহিত্যদর্শন নিয়ে কৈফিয়ত দিতে হচ্ছে তাঁকে।

দু’ঘণ্টার ছবিতে আরও চার বার মান্টোর গল্পে ঢুকেছেন নন্দিতা—‘শও ক্যান্ডল পাওয়ার কা বাল্‌ব’, ‘খোল দো’, ‘ঠান্ডা গোস্ত্’ আর ‘তোবা টেক সিং’ উপস্থাপনার সূত্রে। গল্প চারটে লেখা হয়েছে যখন উপমহাদেশে আগুন জ্বলছে, অস্থির মান্টোর মনও। তবু দিন-দিন ধারালো হয়েছে তাঁর কলম, আরও তীক্ষ্ণ হয়েছে গল্পের মোচড়। কিন্তু মান্টোর সাহিত্যক্ষমতার বিচার করা নন্দিতার উদ্দেশ্য নয়, কোনও ধরাবাঁধা আখ্যানকৌশল আশ্রয় করে মান্টোর জীবনীচিত্র রচনাও নয় তাঁর উদ্দিষ্ট। তিনি জানেন, জটিল এবং বহুমাত্রিক চরিত্রের মানুষটাকে দুই ঘণ্টার খোপে বেঁধে ফেলা অসম্ভব। নন্দিতা আসলে খুঁজেছেন গল্পকার মান্টোর জীবনদর্শন। যদিও শুধু ছোটগল্পেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না মান্টো, কিন্তু তাঁর আসল মেজাজটা ধরা পড়ে ছোটগল্পে। নন্দিতা খুব যত্ন নিয়ে পৌঁছতে চেয়েছেন কালজয়ী আফ্‌সানা-নিগার মান্টোর রক্তাক্ত হৃদয়ের কাছে। রক্তক্ষরণের দু’টি কারণ আমরা সকলেই জানি: গণিকাজীবনের নারকীয়তা আর দেশভাগ-দাঙ্গার উন্মত্ততা। বিষয় দু’টি নন্দিতার ছবিরও ভরকেন্দ্র। সাদা চোখে দেখলে, বিষয় দু’টি আলাদা। আসলে দ্বিতীয়টি প্রথমটিরই সম্প্রসারণ। দু’টিরই কেন্দ্রে আছে লাঞ্ছিত নির্যাতিত নারীত্ব।

আর কথাকার মান্টোর যাবতীয় বিড়ম্বনার উৎস এই বিষয়টি, বলা ভাল, এই বিষয় উপস্থাপনার কৌশলটি। নারীলাঞ্ছনার বিচিত্র সব কৌশল খুলে দেখিয়েছেন বলেই তাঁর বিরুদ্ধে এসেছে অশ্লীলতার অভিযোগ। কিন্তু মান্টো যখন জিগ্যেস করেছেন, শিল্পে অশ্লীলতার সংজ্ঞা কি সত্যিই পাওয়া গিয়েছে? অথবা বলেছেন, পুরুষেরা অশ্লীল কাজকর্ম করলে দোষ নেই, যত দোষ সেই কাজকর্মের বর্ণনা দিলে! — তখন তাঁর দিকে ধেয়ে এসেছে হিরণ্ময় নীরবতা, নিন্দামন্দ অথবা আদালতের শমন। প্রসঙ্গগুলো ছবিতেও এসেছে।

নন্দিতার নিজের কথায়, এ ছবি মান্টোইয়াত-এর অন্বেষণ। আমরা ইনসানিয়াত জানি, যে শব্দের অর্থ মনুষ্যত্ব বা সংবেদন। কিন্তু মান্টোইয়াত? এ কথায় নিখাদ মান্টোপ্রেমীরা যা বোঝেন তাকে বাংলায় বলা যায় মান্টোগিরি: টক-ঝাল-ঝাঁঝালো কথার ফুলঝুরি। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই, ছবিতে শব্দটি একটা অন্য মাত্রা পেয়েছে। এ ছবি, আক্ষরিক অর্থেই দায়বদ্ধ এক জন মানুষের ইনসানিয়াতের অন্বেষণ। মান্টোর দায়বদ্ধতা নিয়ে কেউ কোনও দিন প্রশ্ন তোলেননি, কিন্তু অনেকেই চিনতে পারেননি তাঁর বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইনসানিয়াতকে। নন্দিতা আন্তরিক ভাবেই চেয়েছেন মান্টোর মন, মনন আর মেজাজকে বুঝতে, যাতে তাঁর ইনসানিয়াতের ভিত্তিটা চেনা যায়। ছবি যত এগোয় আমরা বুঝতে পারি, শব্দের চেনা অর্থ আর গণ্ডি ছাড়িয়ে এক অন্য আয়তনে নন্দিতা বাঁধতে চাইছেন মান্টোইয়াতকে। ছবির শেষ দৃশ্যে অসীম দক্ষতায় দর্শককে সেই ‘অন্য আয়তন’-এর হদিস দিয়ে দেন নন্দিতা। সিনেমারই ভাষায়।

দৃশ্যের সূচনা হয় ভাগ্নে হামিদের সঙ্গে মানসিক সংশোধনাগার যাত্রার মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের তথ্য বলছে, সরকারি হাসপাতালবাসের এই মেয়াদ ছিল মাত্র পাঁচ সপ্তাহের, ১৯৫১ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ১ জুন পর্যন্ত। এখানেই লেখা হয়েছিল বিখ্যাত গল্প ‘তোবা টেক সিং’। অনেকে বলেন গল্পটা মান্টো নিজেকে নিয়েই লিখেছিলেন। আমৃত্যু বুকের মধ্যে এক টুকরো ভারতকে বয়ে বেড়িয়েছেন; পাকিস্তানের মাটি তাঁর স্বভূমি হয়নি কোনও দিন। সেই মনোভাবেরই প্রতিফলন এই গল্প। কিন্তু নন্দিতা ছবিতে এনেছেন গল্পের গভীরতর এক ব্যঞ্জনা। সংশোধনাগারে উবু হয়ে বসে খবরের কাগজ নিয়ে ব্যস্ত মান্টো। কিন্তু উন্মাদ মানুষগুলোর বিচিত্র আচরণ তাঁর মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটায়। এর মধ্যেই হঠাৎ সবাইকে সচকিত করে ছুটে আসে মিলিটারি ট্রাক। এক লহমায় মান্টোকে ফেলে ছবি ঢুকে পড়ে মান্টোর গল্পের মধ্যে। নন্দিতা দেখান, গল্পে যেমন আছে, এক জন মানুষ এই ভারত-পাকিস্তান, পাকিস্তান-ভারত ডামাডোলে অস্থির হয়ে একটা গাছের ডালে চড়ে রক্ষীদের অনুনয়-বিনয় বা ভয় দেখানো উপেক্ষা করেই দেশভাগ নিয়ে ভাষণ শুরু করল। এর পরেই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিষাণ সিং-এর প্রবেশ। মুখে রহস্যময় হিং-টিং-ছট, উপর দি গুড় গুড় দি অ্যানেক্স দি বেধ্‌য়ানা...। হিন্দুস্থান বা পাকিস্তান কোনও দেশই তার উদ্দিষ্ট নয়, পনেরো বছর ধরে সে খুঁজছে তোবা টেক সিং নামের তার গ্রামটিকে। অনেক বার রক্ষীদের হাত ছাড়িয়ে পালানোর চেষ্টার পরে অবশেষে সে রাজি হয় কোনও এক দিকে যেতে। কিন্তু তোবা টেক সিং-এর ঠিকানাটা এখনও কেউই বলতে পারে না। সুতরাং হিন্দুস্থান আর পাকিস্তানের মাঝখানে নো ম্যান্‌স্‌ ল্যান্ড-এ হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ে সে। সাউন্ডট্র্যাকে তার গলায় সেই বিখ্যাত ছড়াটি শুরু হয়, কথাগুলো একটু বদলে যায় যদিও: উপর দি গুড় গুড় দি অ্যানেক্স দি মুঙ্গ দি ডাল অব দি হিন্দুস্থান অউর পাকিস্তান... ক্যামেরা জুম আউট করতে থাকে, তার পর পর্দায় ভেসে ওঠে মান্টোর মুখ, আর শেষ কথাটা শোনা যায় নওয়াজ়উদ্দিনের গলায়, ...অউর মান্টো।

মান্টোরই আদলে নন্দিতার এই অসামান্য মোচড়ের পরেই মান্টোইয়াত-এর নতুন অর্থ তৈরি হল ছবিতে— সংবেদনশীল অথচ নিন্দিত এক শিল্পীর নিজস্ব মানসভূমি যার কোনও অবস্থানগত পরিচয় বা স্বীকৃতি নেই। মান্টোর গল্পের নির্মাণকৌশল, ভাষা-ব্যবহার আর শিল্পসুষমা তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে, অথচ অশ্লীলতার ধুয়ো তুলে বার বার তাঁর গায়ে কালি ছিটানো হয়েছে। জীবৎকালে সরকারের চোখে তিনি অশ্লীল আর বামপন্থী লেখক। আবার বামপন্থী বন্ধুরাই এক সময় তাঁকে বলেছেন প্রতিক্রিয়াশীল, দক্ষিণপন্থী। ভৌগোলিক অর্থে তো বটেই, দর্শনগত ভাবেও শেষ পর্যন্ত কাঁটাতার-ঘেরা এক না-দেশের অধিবাসী হয়ে ইতিহাসের পাতায় থেকে গেলেন মান্টো।

Manto Nawazuddin Siddiqui Nandita Das Film Bollywood
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy