×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৩ মে ২০২১ ই-পেপার

প্রবন্ধ ২

কে দেবে সেবা? কেমন হবে তার ধরন?

সুমিত চক্রবর্তী
২৩ জুন ২০১৫ ০০:০৩

মা স দেড়েক হল ভদ্রলোক চলে গিয়েছেন। ক্যান্সারে ভুগছিলেন। দুরারোগ্য এই অসুখ ধরা পড়বার পর বিশেষ কাউকে জানাতে চাননি। জানিয়েছিলেন নিজের দুই সন্তানকে, পুত্রবধূকে, আর কাছের দু-এক জন বন্ধুকে। জীবনের স্বাভাবিক গতিতেও অপ্রয়োজনীয় কোন অন্তরায় সৃষ্টি করেননি। একাই থাকতেন। সকালে উঠে রেডিয়ো শুনতে শুনতে চা খাওয়া, তার পর টুকটুক করে বাজার যাওয়া; ফিরে এসে গান শোনা, বই পড়া, দু-একটা টেলিফোন; সন্ধ্যায় পাড়ার পার্কে খানিক আড্ডা, রাত সাড়ে নটা নাগাদ খাওয়াদাওয়া, ওষুধপত্র ইত্যাদির পর ঘুমোনোর আয়োজন। শরীর বেগতিক বুঝলে সন্তানদের খবর দিতেন। নিতান্ত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিয়ে আবার স্বাভাবিক গতিময়তায় ফেরার চেষ্টা। দুটো নির্দেশ দিয়েছিলেন তাঁর প্রিয়জনদের: প্রথম, তাঁর এই অসুখের খবর যেন এই অতিনিকট বৃত্তের বাইরে যথাসম্ভব গোপন থাকে; দ্বিতীয়, তাঁকে যেন কোনও অবস্থাতেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া না হয়।

এই দুই নির্দেশ সংক্রান্ত আলোচনায় ক্রমশ আসব। এটা বললে সুবিধা হবে যে, ভদ্রলোকের স্ত্রী বছর তিনেক আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েই চলে গিয়েছেন। স্ত্রীর অসুস্থতার দুটো বছর ভদ্রলোক আর তাঁর নিকটজনেরা নিরন্তর নিয়োজিত ছিলেন সেই মানুষটার সেবায়। সমস্ত দেহ-মন উজাড় করে উপায় খুঁজেছেন কী ভাবে তাঁদের প্রিয়জনকে সারিয়ে তোলা যেতে পারে। অতন্দ্র সাধকের মতো স্থিতপ্রজ্ঞ সেবায় যথাসম্ভব লাঘব করবার চেষ্টা করেছেন কাছের মানুষটির কষ্ট-যন্ত্রণা। গভীর মনোযোগে মগ্ন থেকেছেন রোগের ধরন, গতিক, ফলাফলের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তারতম্য বিচার করবার চেষ্টায়। চিকিৎসকদের সঙ্গে খুঁটিনাটি আলোচনায় কিছু বোঝবার, কিছু বোঝাবার নিষ্ফল প্রচেষ্টা করে গিয়েছেন ক্রমাগত। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর ভদ্রলোক আক্ষেপের সুরে তাঁর সন্তানদের বলেছিলেন, ‘মনে রেখো, এক জন রোগীর পরিবারের মানুষজন যদি রোগটি সম্পর্কে এবং তার পরিণাম বিষয়ে ওয়াকিবহাল হয়, বেশির ভাগ হাসপাতাল এবং সেখানকার চিকিত্‌সকদের সেই ধারণার মর্ম বোঝার ক্ষমতা নেই।’

কয়েক দিন আগে হাতে এল সমাজবিজ্ঞানী রণবীর সমাদ্দারের লেখা একটা চটি বই— কৃষ্ণা: লিভিং উইথ আলঝাইমার্স। সমাজসংক্রান্ত কোন জটিল, তত্ত্বনিষ্ঠ সন্দর্ভ নয়। তাঁর আলঝাইমার্স আক্রান্ত স্ত্রী কৃষ্ণার সঙ্গে দিনযাপনের মামুলি স্মৃতিচারণ মাত্র। বইয়ে লেখক আলোচনা করেছেন কী ভাবে তিনি আর তাঁর সঙ্গে সম্পূর্ণ অনাত্মীয় জনাচারেক অল্পশিক্ষিত মানুষ তাঁর স্মৃতিরহিত জরাতুর স্ত্রীর চার পাশে একটা সেবার বলয় তৈরি করেছিলেন। নিবিড় পরিশ্রম, প্রগাঢ় মমতা, নিবিষ্ট মনোযোগ, আর এই অসুখ নিয়ে রণবীরের একান্ত গবেষণালব্ধ জ্ঞানের মিশেলে কেমন ভাবে তাঁরা কৃষ্ণার রোগজীর্ণ মানসে আনন্দের প্রকাশ ঘটাতেন। কেমন ভাবে স্নেহ, ধৈর্য আর সেবার সহাবস্থানে ক্রমাগত একটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক যাপনে ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করতেন মেধাবী, হালে অসহায় এই মহিলাকে। অথচ, যত বার তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হত, তত বার নৈর্ব্যক্তিক অশ্রদ্ধাজাত সেবায় কৃষ্ণা যেন হতোদ্যম, ক্লান্ত, অবসাদগ্রস্ত রোগিণী হয়ে ফিরে আসতেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জ্ঞানের ঔদ্ধত্যে ফুৎকারে উড়িয়ে দিতেন রণবীরের নিরলস সেবাসঞ্জাত খুঁটিনাটি তথ্য, প্রতিহত, হতাশ রণবীর ফিরে আসতেন প্রতি বার।

Advertisement

কী বলতে চেয়েছেন রণবীর? তিনি কি চাইছেন ব্যস্ত বিশেষজ্ঞ প্রত্যেক রুগির সঙ্গে একটা সমানুভূতির সম্পর্ক স্থাপন করবেন? খেয়াল করবেন তাঁর যন্ত্রণা বা অসহায়তার প্রতিটি সূক্ষ্ম প্রকাশ? বোধহয় না। এখানে তিনি একটি অত্যন্ত জরুরি শব্দবন্ধের অবতারণা করেছেন: aesthetics of care. বাংলা করলে বলা যায় ‘সেবার নন্দনতত্ত্ব’। যখন সেবা হয়ে উঠবে একটা যৌগিক প্রক্রিয়া, একটা সামগ্রিক মেলবন্ধনের সিম্ফনি। সেখানে এক জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হয়তো বা রুগির সেবাদাত্রী কোনও অল্পশিক্ষিত আয়ার কথা শুনলে, চিকিৎসাসংক্রান্ত কোনও নতুন জানালা খুলে নিতে পারবেন। অসুস্থার বিষয়ে জানেন এমন আত্মীয়ের সঙ্গে স্বল্পসময়ের কথোপকথনে জেনে নিতে পারবেন এমন কোনও তথ্য যা শুধুমাত্র সেই রুগির জীবন আর একটু সহনীয় করে তুলতে পারে! বাঁধা গতে, চিন্তারহিত অভ্যাসে, ক্রমাগত কড়া ওষুধের ভারে বিপর্যস্ত করে দেবেন না অসুস্থ মানুষটিকে! এই যে আমাদের চারিদিকে বেসরকারি, তথাকথিত ‘কর্পোরেট’ হাসপাতালের রাজপথ-বিস্তৃত বিজ্ঞাপনের চিৎকার: ‘আমরা আপনাদের সেবায় সর্বদা নিয়োজিত’— কে দেবে সেবা? কেমন সেই সেবার ধরন? নান্দনিক
কোনও সেবার প্রলেপ কি সত্যিই ছুঁতে পারল আমাদের?

স্ত্রীর মৃত্যুর পর রণবীর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একটা চিঠিতে আক্ষেপ করেন: 'The hospital must understand that patients like Krishna… who are defenceless, mute, and relying for their lives on care and proper medication, do not have to always die in this way'.

আর একটা জরুরি কথা বলেছেন রণবীর। ক্যান্সার বা আলঝাইমার্সের মতো কোনও অসুখে আক্রান্ত মানুষকে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু মায় ডাক্তার অবধি খরচের খাতায় ফেলে দেন। কোনও পরমাত্মীয় হয়তো রোগীর প্রিয় মানুষকে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নানা ভুলচুক ও তাঁর বিবিধ অপরিণামদর্শিতা সম্বন্ধে জানানোর সময় বলবেন, ‘এ ভাবে আর কত দিন পারবে? ও চলে গেলে সকলেরই কষ্ট লাঘব’। চিকিৎসক নির্বিচার তাঁর সমস্ত গতানুগতিক অস্ত্র নিক্ষেপ করে যাবেন, ফলপ্রসূ হোক বা না হোক, কেননা যুক্তি হাতের নাগালেই রয়েছে: ‘জানেনই তো রোগের ধরন... যতটুকু পারা যায়...’। রণবীর এই যুক্তিজালকে বলেছেন proto-fascism. নাৎসি জার্মানিতে চিকিৎসকরা যেমন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্তি করে অথর্ব, প্রতিবন্ধী বা বিকলাঙ্গ মানুষদের মৃত্যুর পরওয়ানা জারি করতেন, এ-ও যেন খানিকটা সে রকমই।

যে ভদ্রলোকের কথা শুরুতে বলছিলাম, তিনি যদি এই বই পড়ে যেতে পারতেন তা হলে তাঁর মনে পড়ত কী ভাবে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি নামী বেসরকারি হাসপাতাল তাঁর স্ত্রীকে একই পদ্ধতিতে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এমন রুগির মৃত্যু এতটাই স্বাভাবিক, এতটাই বিস্ময়হীন, যে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের মানুষদের সঙ্গে সৌজন্যবশত এক বার দেখা করবারও প্রয়োজন বোধ করেননি চিকিৎসকমশাই। রণবীর একে বলেছেন medical murder. এই বার হয়তো বোঝা যাবে কেন ভদ্রলোক তাঁর নিকটজনেদের ওই দুটি নির্দেশ দিয়েছিলেন!

সবটাই কি তা হলে এমন অদ্ভুত আঁধার? বোধহয় না। ভদ্রলোকের দ্বিতীয় কথাটি শেষ অবধি রাখতে পারেননি তাঁর সন্তানরা। জীবনের শেষ ষোলো ঘণ্টা তিনি কাটিয়েছিলেন একটা অনামী নার্সিংহোমে, মানবিক এক চিকিৎসকের সেবাময় সান্নিধ্যে। শেষরক্ষা করতে পারেননি তিনিও, প্রিয়জনদের হাত ধরে জানিয়েছিলেন তাঁর অপারগতা। ভদ্রলোেকর শেষযাত্রার সময় এসে দাঁড়িয়েছিলেন সন্তপ্ত পরিজনদের পাশেই। এই হন্তারক চিকিৎসা-সংস্কৃতির মধ্যিখানে এটুকুই বুঝি সেবা।

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির শিক্ষক

Advertisement