অমিত দাসের প্রবন্ধ “তিনি একাই ‘একশো’” (২০-১২) প্রসঙ্গে কিছু সংযোজন করতে চেয়ে এই পত্রের উপস্থাপনা। শিল্পীর প্রয়াণের পর সত্যজিৎ রায়ও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, সন্তোষ দত্ত ছাড়া ‘লালমোহনবাবু’ চরিত্রে তিনি আর কাউকেই ভাবতে পারবেন না। এখানেই অভিনেতা সন্তোষ দত্তের প্রকৃত জয়। জয় বাবা ফেলুনাথ উপন্যাসে সত্যজিতের তুলিতে ‘জটায়ু’-র চেহারা যখন আমূল বদলে সন্তোষ দত্তের মতো করে আঁকা হল, তার প্রধান কারণ— সোনার কেল্লা ইতিমধ্যেই মুক্তি পেয়ে গিয়েছিল। এক জন অভিনেতার প্রভাবে সাহিত্যের চরিত্ররূপ এমন ভাবে বদলে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে আর কি কখনও ঘটেছে? বলা শক্ত।
তাঁর বাল্যপ্রসঙ্গে আসি। সন্ধ্যাবেলা চরকা কাটতে কাটতে বাবার সঙ্গে ছোট্ট সন্তোষ নাটকের চরিত্রের সংলাপ বলতেন। তখন তাঁদের একমাত্র দর্শক ছিলেন সন্তোষের মা। এই ভাবেই বাবার হাত ধরে অভিনয়ের হাতেখড়ি। গলার স্বর মিহি হওয়ায় প্রথম দিকে মহিলা চরিত্রেও অভিনয় করতেন সন্তোষ দত্ত। অল্প বয়সেই তাঁর ব্যাঙ্কে চাকরি হয়। পরে ব্যাঙ্ক তাঁকে ওড়িশায় বদলি করলে তিনি চাকরি ছেড়ে আইনজীবী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। বহু জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলা বুদ্ধিমত্তা ও সততার সঙ্গে লড়লেও, মোহনবাগানের খেলা থাকলে তিনি সাধারণ দর্শকদের সঙ্গে গ্যালারিতে গিয়ে বসতেও স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন।
নাটকের প্রতি সন্তোষ দত্তের ক্ষুধা ছিল প্রবল। যোগ দেন ‘আনন্দম’ গোষ্ঠীতে, ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম। সুকুমার রায়ের চলচ্চিত্তচঞ্চরী নাটকে তাঁর অভিনয় দেখে সত্যজিৎ রায় সিদ্ধান্ত নেন, তাঁকে একটি ছোট চরিত্র দেবেন পরশ পাথর ছবিতে। সেই ছোট্ট চরিত্রেই দর্শকদের মন জয় করে নেন সন্তোষ দত্ত। বুঝিয়ে দেন, তাঁর অভিনয়দক্ষতা অচিরেই অনেকের ঈর্ষার কারণ হবে। হীরক রাজার দেশে ছবিতে সন্তোষ দত্ত অভিনয় করেন দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রে, শুন্ডীর রাজা ও বৈজ্ঞানিক। একই ছবিতে একই অভিনেতাকে দিয়ে এমন ধরনের দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করানো সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রজীবনে সম্ভবত এক বারই ঘটেছিল।
পরবর্তী কালে তরুণ মজুমদারের শ্রীমান পৃথ্বীরাজ, গণদেবতা, তপন সিংহের হারমোনিয়াম, পার্থপ্রতিম চৌধুরীর যদুবংশ, দীনেন গুপ্তের মর্জিনা আবদাল্লা, শঙ্কর ভট্টাচার্যের শেষরক্ষা, পূর্ণেন্দু পত্রীর মালঞ্চ এবং স্ত্রীর পত্র-সহ বহু ছবিতে তিনি অভিনয় করেন। তবুও আজও আমরা তাঁকে মনে রেখেছি মূলত ‘জটায়ু’ হিসাবেই। প্রসঙ্গত, এক বার এক সাক্ষাৎকারে সন্তোষ দত্তকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কৌতুকাভিনেতার ভাবমূর্তি তৈরি হয়ে যাওয়ার পর সিরিয়াস চরিত্রে অভিনয় করতে তাঁর কেমন লাগে? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “ঠিক কৌতুকাভিনেতার ইমেজ আমার তৈরি হয়েছে বলে আমি মনে করি না। যদি হয়ে থাকে, সেটা বোধহয় জটায়ুর ইমেজ।”
শক্তিশঙ্কর সামন্ত, ধাড়সা, হাওড়া
কঠিন রূপবদল
অমিত দাসের “তিনি একাই ‘একশো’” শিরোনামের প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই চিঠি। অভিনেতা সন্তোষ দত্তের একটি বিশেষ গুণ ছিল। সেটি তিনি এমন নিখুঁত ভাবে রপ্ত করেছিলেন যে, কমেডিয়ান হিসাবে তাঁর অবস্থান কোনও দিনই টলানো সম্ভব হয়নি। কমেডি করার সময় তিনি নিজের ‘ম্যাচিয়রিটি লেভেল’টিকে একেবারে শিশুর পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারতেন। তাঁর অঙ্গভঙ্গি, হাত-পা ছোড়া, ভয়— সব কিছুর মধ্যেই মিশে যেত পাঁচ-ছয় বছরের একটি শিশু। আর এই সম্পূর্ণ রূপান্তরটাই তিনি করতেন ভীষণ বিশ্বাসযোগ্য ভাবে। এটা ঠিক কতটা কঠিন, যাঁরা অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা সকলেই জানেন।
অনেকে বলে থাকেন, সন্তোষ দত্তের চেহারাটাই তাঁকে বিখ্যাত করে তুলতে বিশেষ ভাবে সাহায্য করেছে— ছোটখাটো উচ্চতা, গোলগোল ভিতু ভিতু চোখ। কিন্তু কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। জয় বাবা ফেলুনাথ ছবিতে জটায়ুর চরিত্রটির কথা মনে পড়ে। এক দৃশ্যে মগনলাল মেঘরাজের বাড়ির দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জটায়ু। একের পর এক ছোরা ছোড়া হচ্ছে তাঁর দিকে। ভয়ঙ্কর এক খেলা— বিশাল বিশাল ছোরা তীব্র গতিতে তাঁর শরীরের থেকে বড় জোর এক ইঞ্চি দূরত্ব রেখে দেওয়ালে গেঁথে যাচ্ছে। খেলা শেষ হতেই, তিনি যে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ঠিক সেই ভাবেই অজ্ঞান হয়ে সোজা ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।
এই পড়ে যাওয়ার মুহূর্তটি নিঃসন্দেহে যথেষ্ট উৎকণ্ঠার। অথচ কোথাও গিয়ে সেটাই দর্শকদের ঠোঁটের কোণে হালকা, বা কারও ক্ষেত্রে প্রবল হাসির রেখা টেনে দেয়। এটাই কমেডির টাইমিং। সন্তোষ দত্তের মতো চেহারার অভিনেতা আরও অনেকেই ছিলেন, কিন্তু শুধুমাত্র চেহারা দিয়ে তো আর উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছনো যায় না। সত্যজিৎ রায় কেন তাঁর মৃত্যুর পর শত প্রলোভন সত্ত্বেও আর ফেলুদা করতে রাজি হননি, তা এই সব ছোট দৃশ্য থেকেই বোঝা যায়।
ক্রিমিনাল লয়ার হিসাবে আদালতে সওয়াল করতেও তাঁকে দেখা গেছে। তখন তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। প্রবল ব্যক্তিত্বে ভর করে তুখোড় ইংরেজিতে একের পর এক প্রশ্নবাণ ছুড়ে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে দিচ্ছেন। দেখতে দেখতে গুলিয়ে যায়— এই মানুষটিই কি আবার সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে জটায়ু চরিত্রে অভিনয় করতে এসে ফেলুদার সঙ্গে প্রথম দৃশ্যে তাঁর ছাতি আর কোমরের মাপ শুনে বলে ওঠেন, “আপনি কি শুয়োর?” আর সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড জোরে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে ওঠেন? আবার ছবির শেষের দিকে, ভীষণ সিরিয়াস পরিস্থিতিতে ফেলুদা আর তোপসের মাঝখানে জবুথবু হয়ে বসে উটের প্রসঙ্গ উঠতেই হঠাৎ প্রশ্ন করে ফেলেন— “উট কি কাঁটা বেছে খায়?” এ রকম মুহূর্ত কেবল সন্তোষ দত্তই তৈরি করতে পারতেন, বুদ্ধি, অভিনয়ক্ষমতা আর নিখুঁত ‘টাইমিং’-এর মেলবন্ধনে।
প্রদীপকুমার সেনগুপ্ত, ব্যান্ডেল, হুগলি
বিরল পুরুষ
‘সত্যসন্ধানী’ (১৪-১২) শিরোনামের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, রাখঢাক না করে লুকোনো সত্য— এমনকি যৌনজীবনের কঠোর সত্যও— প্রকাশ করার ক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধী ছিলেন বিরলতম এক পুরুষ। আমরা জানি, লিয়ো টলস্টয়ের ক্রয়টজ়ার সোনাটা উপন্যাসটি তাঁকে গভীর ভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল। এই বই পড়ে তিনি যৌন নৈতিকতার বিষয়টির প্রতি বিশেষ ভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠেন।
তাঁর আক্ষেপ ছিল, আমাদের দেশের নারীরা পত্নী হতে জানে, কিন্তু ভগিনী হতে জানে না। তিনি এও বলেছেন, প্রতিটি ভারতীয় নারী বিবাহ করবে বলেই জন্মায় না। তাঁর পরামর্শ ছিল, দেশের শিক্ষিত নারীরা পশ্চিমি ভাবধারার শিখর থেকে নেমে এসে ভারতের মাটির সঙ্গে সংযুক্ত হোক। ষোড়শ শতকের বিখ্যাত কবি মীরাবাইয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রকৃত অর্থে নারীজীবন কাকে বলে। মীরাবাই ছিলেন সেই মহীয়সী নারী, যিনি একাধারে নারীর পত্নীজীবন ও মাতৃজীবনের বাঁধা গণ্ডিকে অগ্রাহ্য করতে পেরেছিলেন। তিনি যেমন নারীর ‘রাইট টু বডি’-র অধিকারকে স্বীকার করেছেন, তেমনই প্রশ্ন তুলেছেন— নারীর শুচিতার বিষয়টি নিয়ে পুরুষসমাজের এমন অসুস্থ দুশ্চিন্তার কারণ কী। এও এক সত্যসন্ধানের পথ।
শিবাশিস দত্ত, কলকাতা-৮৪
আশঙ্কা
কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রেট নিকোবর দ্বীপ উন্নয়ন প্রকল্পটি ক্ষতিকর হতে পারে। দ্বীপটি ১,৮০০-রও বেশি প্রাণী এবং প্রায় ৮০০ প্রজাতির উদ্ভিদের আবাস, অনেকগুলিই স্থানীয় প্রজাতি। প্রকল্পটিতে একাধিক বিপন্ন পশুপাখির চিরকালের মতো হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। বিপুল পরিমাণ গাছ কাটলে জলবায়ুর উপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
তীর্থ মজুমদার, কলকাতা-৫১
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)