‘বাস্তবকে বোঝাতে জাদুর শরণ’ (৫-২) শীর্ষক অরুন্ধতী ভট্টাচার্যের প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা।
বাস্তবতার কুহক লুকিয়ে থাকে বলার ধরনেই। লাতিন আমেরিকার ছোট-বড় দেশগুলোর বাস্তবতা হয়তো এমনই ছিল যে, তাদের নিঃসঙ্গতা শেষ পর্যন্ত কিছুতেই ঘোচেনি। ভেনেজ়ুয়েলার উপর আমেরিকার প্রত্যক্ষ আগ্রাসন, কলম্বিয়া-সহ অন্যান্য দেশের প্রতি আগ্রাসী পরিকল্পনা পুনরায় মনে করিয়ে দেয় এক অতিকায় বাস্তবতার কথা। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি ভাষণে বিশ্লিষ্ট লাতিন আমেরিকার এক নায়কের ক্রিয়াকলাপ থেকেই বোঝা যায়, এই নতুন মহাদেশের বাস্তবতা কেন ভিন্ন, কেন তার ইতিহাসকে বাদ দিয়ে তাকে বোঝা যায় না। গার্সিয়া মার্কেস এ ক্ষেত্রে সাহিত্যের দায়িত্বও স্বীকার করে নিয়েছিলেন। কলাকৈবল্যবাদীদের মতো কখনও বলেননি, শিল্প শুধু শিল্পের জন্যই; জীবন বা ইতিহাসের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি কিন্তু কৃৎকৌশলের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন; নিজেই বলেছিলেন, এই বাস্তবতার কুহককে ফুটিয়ে তুলতে প্রয়োজন সম্পূর্ণ নতুন ও ভিন্ন প্রকৃতির এক রচনাকৌশল।
পেয়ারার গন্ধ বইতে এক কথোপকথনের সময় তিনি যা বলেছিলেন, তা আজও ফিরে ভাবলে আমরা বুঝতে পারি, কোন রচনাকৌশলে এই কুহকের বাস্তবতা অথবা বাস্তবতার কুহক ফুটিয়ে তোলা যায়— “একশো বছরের নিঃসঙ্গতা-ই হোক কিংবা আমার অন্য যে কোনও বই-ই হোক, আমার লেখার প্রতিটি পঙ্ক্তির যাত্রাভূমি নিখাদ বাস্তব থেকে। আমি শুধু একটি আতশকাচ দিই, যাতে পাঠক বাস্তবকে ভালভাবে বুঝে নিতে পারে।… প্রেম সম্বন্ধে এত কথা আগেই বলা হয়ে গেছে যে এই ছেলেটি যে প্রেমে পড়েছে এটা বলার জন্যে আমাকে নূতন প্রকাশভঙ্গি উদ্ভাবন করে নিতে হয়েছিল। কাজেই আমি দেখতে থাকি কাচের রং পাল্টে যাচ্ছে আর তার মাকে দিয়ে বলাই, ‘ও-সব জিনিস হয় শুধু প্রেমে পড়লেই... মেয়েটি কে শুনি।’ যে কথা অজস্রবার বলা হয়ে গেছে, প্রেম কেমন করে জীবনকে সবকিছুকে ওলট-পালট করে দেয় এটাই তো কথা, সে-কথাই আমি বলতে চাইছি। শুধু আমার বলবার ধরনটা অন্যরকম।”
এমন অন্য রকম স্বরের অন্যতম কারিগর ছিলেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। ক্ষমতার দম্ভে উন্মত্ত রাষ্ট্রীয় আগ্রাসনের এই দুঃসহ সময়ে, জন্মশতবর্ষে উপনীত মার্কেসের জাদুবাস্তবতার কথন আমাদের স্মরণে-মননে এক উল্লেখযোগ্য স্মৃতিসরণি হয়ে থাকে।
সঞ্জয় রায়, হাওড়া
জাদুআয়না
কলম্বিয়ার নোবেলজয়ী সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের স্মরণ এবং পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের এই মুহূর্তের ঘটমান বর্তমান ‘এসআইআর’-এর মতো এক তোলপাড়-করা কেন্দ্রীয় কর্মযজ্ঞ— এই দুই ভিন্ন স্রোত যে কী নিপুণ ভাবে একই সূত্রে গ্রন্থিত হয়ে গেল অরুন্ধতী ভট্টাচার্যের ‘বাস্তবকে বোঝাতে জাদুর শরণ’ শীর্ষক প্রবন্ধটির জাদুতে, তা ভাবলে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়।
এক সাক্ষাৎকারে মার্কেস জীবনের জাদুবাস্তবতার কথা উল্লেখ করেন এই ভাবে, “এক দিন আমি আর আমার স্ত্রী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম। এর মধ্যে শুনতে পেলাম কলিংবেলের শব্দ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে! দ্রুত আমি দরজা খুললাম এবং এক জন মানুষ জানালো সে ইলেকট্রিক আয়রন মেশিন ঠিক করতে এসেছে! আমার স্ত্রী বেডরুম থেকেই জানালো, আমাদের আয়রন মেশিনে কোনো সমস্যা হয়নি। তার পর আগন্তুক জানতে চাইলো, ‘এটা কি অ্যাপার্টমেন্ট নাম্বার দুই?’ আমি তাকে জানালাম, ‘না, নাম্বার দুই উপরের তলায়।’ এর কিছুক্ষণ পর আমার স্ত্রী কাপড় আয়রন করতে গিয়ে সুইচ অন করার সঙ্গে সঙ্গেই আয়রনের তারটি শর্ট সার্কিটে পুড়ে গেল! দেখুন এটাই অন্য রকম কিছু! আমরা আমাদের অবস্থা সম্পর্কে জানার আগেই সে এসেছিল সমস্যাটি ঠিক করতে! আমাদের জীবনে প্রায়ই এমন হয়! যদিও আমার স্ত্রী হয়তো ঘটনাটি পুরোপুরি ভুলে গিয়েছে।”
তবে অদ্ভুত কিছু লেখা মানেই জাদুবাস্তবতা নয়। যদি তা সম্পূর্ণ অবাস্তব বলে মনে হয়, তবে আর সেটি জাদুবাস্তবতার পরিসরে পড়ে না। সলমন রুশদির বিখ্যাত উপন্যাস মিডনাইট’স চিলড্রেন জাদুবাস্তববাদের একটি অসামান্য উদাহরণ। ভারতের স্বাধীনতা ও দেশভাগের বাস্তব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কিছু জাদুময় ঘটনা একেবারে স্বাভাবিক সূত্রেই যেন এই উপন্যাসের বাস্তবতার সঙ্গে মিলেমিশে থাকে।
গৌতম নারায়ণ দেব, কলকাতা-৭৪
পক্ষপাতদুষ্ট
‘বীর নয়, মানুষ’ (৯-২) শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রসঙ্গে এই চিঠি।
যে হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা দেখেছিলেন, তা যেন বর্তমানে আংশিক হলেও সাফল্য লাভ করেছে, এমন ধারণা অনেকের মনে জন্ম নিচ্ছে। গত এক দশক ধরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষের দ্বারা মুসলিম ও তথাকথিত অ-হিন্দু বা নিম্নবর্ণের মানুষের উপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণ ও অত্যাচারের ঘটনা সেই বিশ্বাসকেই জোরদার করে। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিচার না পাওয়া, বিচারপ্রক্রিয়ার বিলম্ব, সাক্ষীদের আকস্মিক ‘দুর্ঘটনাজনিত’ মৃত্যু, অভিযুক্তদের হুমকি প্রদর্শন, সহজে জামিন বা মুক্তি পাওয়া এবং মুক্তির পর তাদের সাড়ম্বরে সংবর্ধনা— এই সমস্ত ঘটনাও সংশয়কে গভীর করে। কোথাও কোথাও গোবলয়ের নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস, হিন্দু মন্দির সংলগ্ন এলাকায় আমিষ খাদ্য নিষিদ্ধ করা, এমনকি কিছু ট্রেনে কেবল নিরামিষ খাদ্য সরবরাহের মতো ঘটনাও প্রশাসনের হিন্দুত্ববাদী অবস্থানকেই প্রতিফলিত করছে বলে মনে হয়। ডাবল এঞ্জিন সরকারের কিছু রাজ্যে তথাকথিত উচ্চবর্ণের প্রাধান্য প্রদর্শনের প্রবণতা জনমনে এই প্রশ্ন জাগায়, ভারত কি আর প্রকৃত অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র রয়েছে?
এই রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের কিছু আচরণও অনেকের কাছে নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তোলে; মনে হয় যেন তেন প্রকারেণ কেন্দ্রকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়াই উদ্দেশ্য। অতএব, নির্বিকার জনগণের পক্ষে নিউটনের তৃতীয় সূত্রের কার্যকারিতা দেখার অপেক্ষায় বসে থাকা ছাড়া আর উপায় আছে কি? অবশ্যই, তার আগে প্রয়োজন প্রশাসনের কঠোর ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপ। দেশের সর্বত্র যে কোনও অন্যায় ও অবিচারের ক্ষেত্রে প্রশাসনের তৎপর, দৃঢ় এবং পক্ষপাতহীন ভূমিকা অপরিহার্য। গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য এটাই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
বিশ্বনাথ মুর্মু, খাটখুরা, ঝাড়গ্রাম
সবারই প্রাপ্য
‘অধিকার ও ন্যায়’ (১১-২) শীর্ষক সম্পাদকীয় যথাযথ। বকেয়া মহার্ঘ ভাতা প্রদান নিয়ে রাজ্য সরকারের অনিচ্ছা বনাম সরকারি কর্মচারীদের দাবি ঘিরে দীর্ঘ দিন ধরেই সমস্যা চলছে। সরকারি কর্মচারীরা তাঁদের অধিকার তথা প্রাপ্য আদায়ের জন্য গণতান্ত্রিক পথে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন, এখনও করে চলেছেন। তাঁরা মহার্ঘ ভাতার অধিকার আদায়ের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থানে অনড়। কিন্তু সঙ্গত প্রশ্ন ওঠে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কোন যুক্তিতে আলাদা? বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদেরও তো বাজারে যেতে হয়। মূল্যবৃদ্ধির আগুনের আঁচ তাঁদের গায়েও সমান ভাবে লাগে। তাঁরাও কেন মহার্ঘ ভাতা পাবেন না?
রাজ্য সরকারের বর্তমান আর্থিক অবস্থা দুর্বল। রাজ্যের ঋণের বোঝা উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। আবার ভোটের আগে জনসমর্থন ধরে রাখার তাগিদে লক্ষ্মীর ভান্ডার-সহ নানা প্রকল্পে বরাদ্দ কমালেও রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে যায়। কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও ধর্মগুরুদের ভাতা প্রদান, দুর্গাপুজোয় অনুদান বা নতুন ধর্মস্থান নির্মাণে রাজ্য প্রশাসনের দরাজ হাত দেখে বিস্মিত হতে হয়। অথচ সে সবের জন্য কোনও দিনই সুসংগঠিত দাবি ছিল না। তাই সাধারণ নাগরিক হিসাবে রাজ্য সরকারের কাছে অনুরোধ, বাজারদরের ঊর্ধ্বগতির সাপেক্ষে সব ধরনের কর্মচারীর ন্যায্য বেতনবৃদ্ধি ও আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টি সমান গুরুত্বে বিবেচনা করা হোক।
কৌশিক চিনা, মুন্সিরহাট, হাওড়া
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)