E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: প্রকৃত সংযোগ

ধরা যাক, কেউ বেড়াতে ভালবাসেন। তাঁর মোবাইল পর্দায় বেড়ানো সম্পর্কিত বার্তা আসতে থাকে বেশি করে। তিনিও নেশায় পড়ে তা দেখতে থাকেন অন্য কাজ ভুলে। তাঁর শখ জাগে ভাল জায়গায় বেড়ানোর। অথচ, বাস্তবে তা হয়ে ওঠে না।

শেষ আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৪২

‘হিতে বিপরীত’ (১২-৩) সম্পাদকীয়ের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু সংযোজন। বর্তমান ডিজিটাল বিশ্বে সমাজমাধ্যমের কুপ্রভাব একটি জ্বলন্ত সমস্যা। সমাজমাধ্যমে আমাদের অনেক বন্ধু। কিন্তু বাস্তবে সমস্যা হাজির হলে বা ঠেলায় পড়লে তাদের কাউকেই পাশে পাওয়া যায় না। তা ছাড়া প্রলোভনের ফাঁদ পাতা আছে নেট দুনিয়ায়। তাতে পা দিলে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অথচ ফাঁদে পড়া ছাড়া উপায়ও নেই সাধারণ মানুষের। সমাজমাধ্যমের অ্যাপে জোরদার ‘অ্যালগরিদম’ বা স্বয়ংক্রিয় যাচাই ব্যবস্থা থাকে, যা নিয়ন্ত্রণ করে এক জন ব্যবহারকারীর ‘ফিড’-এ কোন ধরনের বিষয়বস্তু দেখানো হবে। ধরা যাক, কেউ বেড়াতে ভালবাসেন। তাঁর মোবাইল পর্দায় বেড়ানো সম্পর্কিত বার্তা আসতে থাকে বেশি করে। তিনিও নেশায় পড়ে তা দেখতে থাকেন অন্য কাজ ভুলে। তাঁর শখ জাগে ভাল জায়গায় বেড়ানোর। অথচ, বাস্তবে তা হয়ে ওঠে না। তখনই আসে হতাশা। জীবন সম্পর্কে তিনি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলেন।

এর সঙ্গেই আছে অনলাইন হেনস্থা। বিজ্ঞাপন দেখে, পছন্দ করে জিনিস অর্ডার দিয়ে, অনেক সময় দেখা যায় তা উপযুক্ত মানের নয়। তাতে আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন গ্রাহক। হেনস্থার আর এক নতুন সংযোজন ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’। তাতে পুলিশ বা ব্যাঙ্ক থেকে ফোন করছি বলে গ্রাহককে ভুল বুঝিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। গণমাধ্যমের ব্যাপক প্রচার সত্ত্বেও বিশেষত প্রবীণরা এই জালিয়াতির সহজ শিকার হচ্ছেন।

অন্য দিকে, অল্পবয়সি নেট-নাগরিকরা অতি স্বল্প দৈর্ঘ্যের আকর্ষক রিলগুলি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখতে থাকে। ক্রমে এই অভ্যাস আসক্তিতে পরিণত হয়। যার পরিণতি হিসেবে মনে বাসা বাঁধে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, একাকিত্ব, ঘুমের স্বল্পতা, অমনোযোগিতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণের অক্ষমতার মতো অসুখ। এ ভাবে চলতে চলতে সমাজমাধ্যমে দক্ষ ডিজিটাল প্রজন্ম বাস্তব দুনিয়ায় ক্রমে আসামাজিক হয়ে পড়ে। এ থেকে মুক্তির উপায়— মানুষে মানুষে সংযোগ বৃদ্ধি। বন্ধুদের সঙ্গে মোবাইল ফোন-মুক্ত মেলামেশা, বেড়াতে যাওয়া, সামাজিক কাজ করায় সার্বিক লাভ হয়। ‘ফোন ঘাঁটা’র নেশা দূর হয়, প্রকৃত বন্ধুর দেখা মেলে। আশপাশের মানুষের সঙ্গে মনের কথা ভাগ করে নিলে একাকিত্ব দূর হয়। সর্বোপরি, মানসিক চাপ কমে।

পার্থ পাল, মৌবেশিয়া, হুগলি

আসক্তি

‘হিতে বিপরীত’ শীর্ষক সম্পাদকীয়ের উপসংহারে যথার্থই লেখা হয়েছে, কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বয়সভিত্তিক ফিল্টার প্রয়োগ এবং দ্রুত বিপজ্জনক বিষয়গুলির উপর সতর্কবার্তার ভারী পর্দা আবরণে তাদের বাধ্য করতে পারে একমাত্র প্রশাসনই। প্রশাসন তৎপর হলে জনগণ যে কু-অভ্যাস ত্যাগ করতে পারে, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় তা স্পষ্ট। এক যুগ আগেও শহরতলির লোকাল ট্রেনে, স্টেশন চত্বরে এবং দূরপাল্লার ট্রেনে যাত্রীদের একাংশকে যথেচ্ছ ধূমপান করতে দেখা যেত। প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানায় ভয়ে আজ এই দৃশ্য প্রায় চোখে পড়ে না বললেই চলে। আবার দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ও প্রশাসনের কড়া মনোভাবে কালীপুজোর শব্দবাজিও একদা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। প্রশাসন ঢিলে দেওয়ার ফলে অচিরেই সেই বোতলবন্দি দৈত্য বেরিয়ে এসে বর্তমানে ফের ধারাবাহিক শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ষোলো বছরের নীচে সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ভারতের কর্নাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশও এই বিধি আরোপ করতে চলেছে। উদ্দেশ্য সাধু, সন্দেহ নেই। কিন্তু বয়সসীমা বেঁধে কিশোর-কিশোরীদের ডিজিটাল সমর্পিত মননে বেড়ি পড়িয়ে প্রত্যাশিত সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সমাজমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য একটি স্মার্টফোন ও ডেটার ক্রয়ক্ষমতা থাকলেই চলে, বয়সে জল মেশানো জেন জ়ি-র কাছে জলভাত।

শৈশব থেকে শিশুদের হাতে মোবাইল ধরিয়ে আসক্তি গড়ে তোলার পর বয়ঃসন্ধি কালে সমাজমাধ্যমের দরজা বন্ধ করা অত্যন্ত কঠিন। এতে ‘উইথড্রয়াল সিনড্রোম’-এর সম্ভাবনা থাকে। তারা যে রিল, ভিডিয়ো ক্রমাগত দেখে চলেছে, সেগুলি কি আদৌ শিশুমনের উপযুক্ত? সেলফি, স্টেটাস, রিল নামক নিশির ডাকে বেরিয়ে পড়ার আগে অভিভাবকদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যমগুলিতে এই বিষয়ে নিয়মিত আলোকপাত ও চর্চা হওয়া জরুরি।

সরিৎশেখর দাস, কলকাতা-১২২

ধ্বংসের পথ

‘হিতে বিপরীত’ সম্পাদকীয় প্রসঙ্গে বলি, অপ্রাপ্তবয়স্কদের সমাজমাধ্যমের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত রাখার জন্য এ দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন রকম উদ্যোগ করা হলেও অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও সমাজচিন্তকদের উদ্বেগ এতটুকুও কমেনি। বরং বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে কোথাও কোথাও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও মোবাইলে আসক্তিজনিত সংক্রমণ যত দ্রুত ছড়াচ্ছে, সেই তুলনায় যথাযথ ব্যবস্থা খুবই কম। সমস্যার গভীরতা বিবেচনা করে প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলির যে ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল, তা থেকে আমরা বহু যোজন পিছিয়ে রয়েছি। বেশির ভাগ মানুষের চরম উদাসীনতাই এর প্রধান কারণ। এই উদাসীনতাই ধীরে ধীরে এই প্রজন্মকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। তাই রাষ্ট্র বা আইনের মুখাপেক্ষী না থেকে পারিবারিক স্তর থেকেই বিপদটির প্রতিরোধ শুরু করা দরকার। অনলাইন প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়েছে বলেই সব বয়সিদের সেটা সমান ভাবে ব্যবহার করার মানসিকতাও তৈরি হবে, এমনটা নয়। কোনও নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ছোটরা সহজেই মোবাইলের অ্যাপ খুলে যা দেখা অনুচিত, তাও দেখার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। এটা মোটেও কাম্য নয়।

আসলে প্রযুক্তির প্লাবনে আমরা এমন ভাবে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়েছি যে, কোন বয়সে কার কিসের প্রতি আগ্রহ থাকা উচিত, সেটা পর্যন্ত বিবেচনায় আনতে ভুলে যাচ্ছি। এত দিন খেলার মাঠের প্রতি যে আকর্ষণ ছোটদের কাছে স্বাভাবিক ছিল, সেটা আজ প্রযুক্তির ঝড়ে উড়ে যেতে বসেছে। ছোটরা খেলার মাঠ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে শৃঙ্খলা রক্ষা, নিয়ম মেনে দলগত ভাবে কাজ করা, নেতৃত্ব দেওয়া, সহানুভূতিশীল হওয়া, হারজিত মেনে নিয়ে জীবনের পথ চলা ইত্যাদি বহু কিছু শিক্ষার সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। এই আসক্তির ফাঁদ থেকে ছোটদের দূরে রাখতে পাড়ায় পাড়ায় এবং স্কুলে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। দরকার ছোটদের খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ।

কঠোর নিয়ন্ত্রণ, বয়সভিত্তিক ফিল্টার প্রয়োগ সাময়িক টোটকা হিসেবে কাজ করলেও সামগ্রিক সমস্যার সমাধানে কতটা অগ্রসর হতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। বাজার অর্থনীতি ও উন্নত প্রযুক্তিবাহিত সমাজমাধ্যমের সাঁড়াশি আক্রমণ মোকাবিলা করা যে খুব একটা সহজ কাজ নয়, এই সত্য দ্রুত উপলব্ধি করা জরুরি।

রতন রায়চৌধুরী, পানিহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

ছোট-বড় মিলে

‘হিতে বিপরীত’ সময়োপযোগী সম্পাদকীয়। কিন্তু এর অভিমুখ শুধুমাত্র অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ভাবনায় সঙ্কীর্ণ ও একপাক্ষিক। আন্তর্জালের মায়ায় সমস্ত মানুষই বিশ্ব জুড়ে আবদ্ধ। সমস্যাটি সর্বজনীন। আশ্চর্যের বিষয় হল, প্রবীণ নাগরিকেরা পুরনো মূল্যবোধে লালিত, পালিত প্রজন্ম। আজ থেকে কয়েক দশক আগে জন্ম নেওয়া এই মানুষেরা যৌথ পরিবারে, রেডিয়ো শুনে, বিনোদনের দুনিয়া থেকে দূরে নিয়ম মেনে, আদর্শবাদী গুরুজন শিক্ষককুলকে দেখে শৃঙ্খলাবদ্ধতায় কৈশোর কাল যাপন করেছেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা কেন আন্তর্জালে জড়ালেন? এই প্রবণতাই ছোটদের উদ্বুদ্ধ করছে। আগে বড়দের এই দুনিয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। তবেই না ছোটরা শিখতে পারবে।

মানস দেব, কলকাতা-৩৬

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Social Media Mobile Addiction Mental Health

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy