নেতাজি ভবনের এক একান্ত শুভার্থী ছিলেন। তিনি মাঝে মধ্যেই আমাদের বলতেন, ‘‘একটা ছোট্ট উপদেশ দিই।’’ প্রতিষ্ঠানের মঙ্গলের জন্যই তিনি নানা উপদেশ দিতেন। আমরা যথাসাধ্য তাঁর কথা মান্য করতাম। তবে আমাদের অল্পবয়সি সদস্যরা এই ‘ছোট্ট উপদেশ’ নিয়ে আড়ালে হাস্য-পরিহাস করতেন। আজ পরিণত বয়সে আমার কেমন যেন ‘ছোট্ট উপদেশ’ দেওয়ার আগ্রহ জেগে উঠেছে। হতে পারে বয়সের দোষ, সকল বন্ধুজন নিজ গুণে ক্ষমা করে নেবেন। 

এ বার সপ্তদশ লোকসভায় ভোট দিলাম; ১৯৫২ সালে প্রথম লোকসভা ভোট প্রত্যক্ষ করেছিলাম। নির্বাচনী প্রচারে এ বারের মতো এক তিক্ত বাদানুবাদ আর প্রচণ্ড হিংসার পরিবেশ আগে দেখেছি, মনে পড়ে না। সেই সময়ে সকল পক্ষের উদ্দেশে একটাই উপদেশ মনের মধ্যে ছিল, কুকথার প্লাবন আর হিংসার তাণ্ডব থেকে সংযত হোন! কিন্তু মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করেছিলাম। মনে হল এই ঘৃণার আবহে সবই মনে হবে ব্যর্থ পরিহাস। নির্বাচন উত্তর তাপ-উত্তাপ এখনও রয়েছে, তবুও মনে হল দু’একটি ছোট্ট উপদেশ দেওয়া যেতে পারে। 

কেন্দ্রে শাসন ক্ষমতায় ফিরে এসেছে বিজেপি দল। লোকপরম্পরায় শুনেছি শাসনযন্ত্র পরিচালনা করবেন একটি যুগলে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজি এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী অমিত শাহ মহাশয়। এই দুই রাজমন্ত্রীর চরণপদ্মে নমস্কার জানিয়ে একটা কথাই নিবেদন করি: ধীরে রজনী ধীরে। ২০১৪ সালে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর আপনাদের কার্যকলাপ দেখে মনে হয়েছিল এই পাঁচ বছরে আপনাদের দলীয় মতবাদ যেমন করে হোক সারা দেশে প্রয়োগ করে ছাড়বেন। এ বার দেখলাম নবনিযুক্ত শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, সারা দেশে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেবেন, আর তৎক্ষণাৎ দক্ষিণ ভারতে শুরু হল প্রচণ্ড বিক্ষোভ। উত্তর ভারতে শুরু হয়ে গেল গোরক্ষকদের তাণ্ডব। আপনাদের এক নেতা ঘোষণা করেছিলেন বিশেষ একটি শহর জঙ্গিদের আড্ডা, তার কারণ আর কিছু না, সেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বাস করেন। তাই বলছিলাম, সব কিছুই কি রাতারাতি করতে হবে? শর্টকাটে কাজ করতে গেলে তাৎক্ষণিক লাভ হতে পারে, ক্ষতি হয় দীর্ঘস্থায়ী।  

নানা কারণে ভাবা গিয়েছিল জনগণ আপনাদের প্রতি বিরূপ হবে, যথা নোটবন্দি। একটা কালো টাকাও উদ্ধার হল না, অথচ মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। মহা ধুমধাম করে সংসদের সেন্ট্রাল হলে জিএসটি চালু করেছিলেন। জিনিসের দাম বেড়ে গেল। যে জামা ক’দিন আগে একশো টাকায় কিনেছি, তার দাম হয়ে গেল তিনশো টাকা। দোকানি মৃদু হেসে বললেন, ‘‘ম্যাডাম, দু’রকমের জিএসটি যোগ করতে হল তো, তাই।’’ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হুমকি দেওয়া হত, প্রতিবেশী রাষ্ট্রে চলে যাও। কিন্তু নির্বাচন কালে দেখলাম মানুষ আপনাদের নোটবন্দি ইত্যাদি দুর্ভোগ ক্ষমা করে দিয়েছে এবং ধর্মীয় বিভাজনের সঙ্কীর্ণ নীতি মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সমর্থ হয়েছে। 

তবুও হে রাজমন্ত্রী যুগল! আপনাদের বিনম্র চিত্তে একটি নিবেদন করি, আপনারা ‘দোবারা’ ক্ষমতায় এসেছেন, কিন্তু এটা শর্টকাট। বার বার আসতে হলে, বহু শতাব্দী ধরে ভারতের যা ঐতিহ্য, তা মনে রাখতেই হবে। বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন ভাষার, বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ এ দেশে এমন ভাবে মিশে গিয়েছে, যেন চালে-ডালে মিশে একাকার, এখন ঝাড়াই-বাছাই করে আলাদা করবেন, তা অসম্ভব। 

এ বার আমার নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের দিকে একটু ফিরে তাকাই। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণীয়া মমতা আমার একান্ত স্নেহের পাত্রী, এ কথা সর্বজনবিদিত। আমি দেখেছি কী কষ্ট করে তিলতিল করে সে একা হাতে তৃণমূল দলটি গড়ে তুলেছিল। তার একমাত্র লক্ষ্য তখন সিপিএমের দমবন্ধ করা শাসন থেকে রাজ্যের মুক্তি। সে যখন মনে মনে দলটি গড়ছে তার সঙ্গে আছি, যে দিন দল সংগঠিত হল, জন্মলগ্ন থেকে রয়েছি। তখনকার মাত্র দু’জন কংগ্রেস সাংসদ তার সঙ্গেই এসেছিলেন, আমি তার অন্যতম। ২০১১ সালে মমতা যে দিন মুখ্যমন্ত্রী হল, আমি বিদেশে ছিলাম। টেলিভিশনে যখন দেখলাম, শপথ গ্রহণের পর জনসমুদ্রে ভাসতে ভাসতে রাজভবন থেকে সে চলেছে রাইটার্স বিল্ডিং-এর দিকে তখন আমার মনে অনাবিল আনন্দ। 

তার পরবর্তী সময়ে পুরাতন কর্মীরা অনেকে আমার কাছে আক্ষেপ করেছেন যে তাঁরা আর পাত্তা পাচ্ছেন না। তাঁরা বলেছিলেন, ‘‘এখন হেরে যাওয়া দল ছেড়ে সকলে ক্ষমতাসীন দলে চলে আসছে, তারাই এখন নেতৃত্বে।’’ আমি ভেবেছিলাম মান-অভিমানের পালা চুকে যাবে, তা কিন্তু হল না। মমতা অনেক বার পুরনো কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে চলার নির্দেশ দেওয়ার পরও এই নির্বাচন পর্যন্ত তা খুব কার্যকর হয়নি। এ বারের নির্বাচনের প্রাক্কালে আমার মনে এক নতুন ধরনের আশঙ্কা দেখা দিল। আমি জানি এই বাংলায় তৃণমূল কতখানি জনপ্রিয় দল, এবং তার নেত্রী মমতার জনপ্রিয়তা তুলনাহীন। কিন্তু এই নির্বাচনের আগে সাধারণ মানুষের মনে, এমনকি আমাদের একান্ত অনুগত সমর্থক ও কর্মীদের মধ্যেও এক চাপা অসন্তোষ দানা বাঁধছে, এমন কথা আমার কানে এল। মমতা মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অনেক ভাল কাজ করেছে এ কথা সংশয়াতীত। মেয়েদের জন্য কন্যাশ্রী, রূপশ্রী ইত্যাদি কত পরিকল্পনা, গ্রামীণ সমাজের দরিদ্র মানুষের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। কলকাতা শহরের শ্রী ফিরেছে, এ কথা সকলেই স্বীকার করেন। তবে কোথায় ত্রুটি হল? নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন মমতার কণ্ঠে অভিমানের সুর বেজেছিল, ‘‘হয়তো বেশি কাজ করে ফেলেছি।’’ 

কল্যাণীয়া মমতা, তুমি অনেক ভাল কাজ করেছ, কিন্তু তোমার মেজো, সেজো, ছোট নেতাদের কথাবার্তা এবং চালচলন সেই ভাল কাজের অসম্ভব ক্ষতি করেছে। তুমি কি সেই চাপা ক্ষোভের আঁচ পাওনি? কথায় বলে, ‘রাজা কর্ণেন পশ্যতি’, অর্থাৎ প্রজাদের সুখদুঃখের খবর রাজার কানে তুলতে হয়। ‘সব ঠিকঠাক চলছে’ যাঁরা বলেন তাঁরা স্তুতিকার। প্রকৃত শুভার্থীর কাজ ভুলভ্রান্তি তুলে ধরা, তথ্য গোপন করা নয়। 

চাপা ক্ষোভের খবর পেলে বিরোধীদের কাজই হবে তাকে উস্কে দেওয়া। শিক্ষিত, উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত ভোটার অনেক সময় তৃণমূলের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু এ বার আমাকে যা দুর্ভাবনায় ফেলে দিয়েছিল, তা হল সাধারণ দরিদ্র মানুষ, যাঁরা চিরদিন দলের মেরুদণ্ড, তাঁদের মধ্যে নিজেদেরই কোনও কোনও নেতার বিরুদ্ধে প্রবল অসন্তোষ। ছোটখাটো দোকানিরা, ব্যবসায়ীরা বলাবলি করছিলেন, সামান্য রোজগার, তার কত শতাংশ যেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দকে দিতে হয়। এক গোষ্ঠীকে দিলে আর এক গোষ্ঠী এসে বলে, দ্বিতীয় বার দিতে হয়। আমি লক্ষ করেছিলাম, ‘দিদি’র প্রতি আনুগত্য ও ভালবাসা অটুট আছে, কিন্তু মনে জমেছে অভিমান। ‘দিদি’ এক বার আঙুল তুলে ‘অ্যাই চোপ’ বললে এই অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পাই। কিন্তু কোথায় সেই রুদ্রমূর্তি! 

ভোটে খারাপ ফলের জন্য বিজেপি’র বিভাজন নীতি, ইভিএম-এর কারচুপি নিয়ে যেমন আলোচনা করব, তেমনই কঠোর আত্মসমীক্ষা চাই। বিপথগামী কর্মী ও নেতাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। নইলে লুম্পেনদের দাপাদাপি আর দুর্নীতির দুর্গন্ধ ইভিএম-এ সর্বনাশ ডেকে আনবে। আবার, প্রকৃত আত্মসংশোধন করতে পারলে বহিরাগত ‘ভোট-বিশেষজ্ঞ’ ভাড়া করে আনতে হবে না। 

কোনও এক সময় দলনেত্রী মমতা এবং আমরা প্রথম যুগের জনাকতক সাংসদ নয়াদিল্লির একই আবাসনে ঘনিষ্ঠ ভাবে থাকতাম। আমার স্নেহের নেত্রীকে আমি কখনও কখনও বলে ফেলতাম, মমতা এই কাজটা তুমি ঠিক করলে না। আমার সহকর্মীরা বলতেন, আমরা কিছু বললে নেত্রীর কোপে পড়ে যাই, কিন্তু কৃষ্ণাদি কিছু বললে দিব্যি পার পেয়ে যায়। আজ সে মুখ্যমন্ত্রী, রাজনীতিতে অনেক পরিণত। তবুও, যে ছোট্ট উপদেশের কথা বলে এই লেখা শুরু করেছিলাম, নিজ দলের প্রতিও রইল সেই কথা। নিজের মনের ভার লাঘব করার জন্যও প্রয়োজন ছিল এই আত্মবিশ্লেষণের। যে ভারতচেতনার মধ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিনগুলিতে বড় হয়েছিলাম, সেই প্রদীপশিখা যাতে কিছুতেই না নিবে যায়, তারই জন্য এই সামান্য দু’চারটি কথা।

পরিশেষে আর দু’টি কথা বলি। গণতন্ত্রে ‘বিরোধী-শূন্য’ কথাটা একেবারেই বেমানান। বিজেপি-শাসিত ভারতবর্ষ বিরোধী-শূন্য হয়ে পড়লে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার, তৃণমূল-শাসিত পশ্চিমবঙ্গেও কিন্তু তা-ই। ছোট-বড় সব রকম ভোটে দাঁড়ানো বা নিজের ইচ্ছে মতো ভোট দেওয়া সকলের সাংবিধানিক অধিকার। এর অন্যথা মানুষ বরদাস্ত করবেন না। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনীতিসচেতন রাজ্যে তো নয়ই। দুই, মমতা সত্যিই এ-কালের এই বাংলার এক যুগান্তকারী নেত্রী, নিন্দুকে যে যা-ই বলুক না কেন। তার উত্তরসূরি হোক এমন এক জন কেউ, যে মমতার মতোই নিজের রাজনৈতিক প্রতিভা, পরিশ্রম এবং জনপ্রিয়তার গুণে মানুষের মন জয় করে নেবে।

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের YouTube Channel - এ।     

(ভূতপূর্ব সদস্য, ভারতীয় লোকসভা)