Advertisement
E-Paper

ঘরে ঘরে বন্দুক, মনে মনে বিদ্বেষ

এক দিকে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ, অন্য দিকে বন্দুক রাখার অবাধ অধিকার। মাসুল গুনছে আমেরিকা, তার সমাজ, তার সংস্কৃতি। সবচেয়ে বড় মাসুল গুনছে সে দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যাদের গায়ের রং সাদা নয়।এক দিকে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ, অন্য দিকে বন্দুক রাখার অবাধ অধিকার। মাসুল গুনছে আমেরিকা, তার সমাজ, তার সংস্কৃতি। সবচেয়ে বড় মাসুল গুনছে সে দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যাদের গায়ের রং সাদা নয়।

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৫ জুন ২০১৫ ০০:০২
দাবি। চার্লস্টন, সাউথ ক্যারোলাইনা। ২০ জুন, ২০১৫। ছবি: এএফপি।

দাবি। চার্লস্টন, সাউথ ক্যারোলাইনা। ২০ জুন, ২০১৫। ছবি: এএফপি।

একুশ বছর বয়েসি যুবক ডিলানস্টর্ম রুফ যখন সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লস্টনে কৃষ্ণাঙ্গদের চার্চে বাইবেল ক্লাসে গিয়ে বসেছিল, তখন কেউ তাকে সন্দেহ করেনি। শ্বেতাঙ্গ বলে তাকে কেউ কৃষ্ণাঙ্গদের ক্লাসে বসতে বাধা দেয়নি। ব্ল্যাক আমেরিকানদের চার্চ প্রায় সর্বত্র এই রকমই। অভিবাসী আন্দোলনে কাজ করার সময়ে এনএএসিপি-র (নামটা এসেছে ‘ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডবান্সমেন্ট অব কালার্ড পিপল) বন্ধুদের সঙ্গে তাদের গির্জায় গিয়ে বসেছি, তাদের গান শুনেছি, মিটিং করেছি। কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিনিরা ধর্ম, জাতি, ভাষা বা বর্ণ নির্বিশেষে দুহাত বাড়িয়ে অতিথি, বন্ধুদের গ্রহণ করেন। এই ট্র্যাডিশন সেই ফ্রেডেরিক ডগলাস এবং পরে রেভারেন্ড মার্টিন লুথার কিং-এর সময় থেকেই চলে আসছে।

কিন্তু ডিলান রুফ তাঁদের আপ্যায়নের শরিক হতে সেখানে যায়নি। তার হাতের ব্যাগে ছিল স্বয়ংক্রিয় আধুনিক বন্দুক, মনের মধ্যে ছিল উগ্র জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ, ও ঘাতকের হিংসা। কালোদের প্রতি, অন্য ধর্ম ও বর্ণের মানুষের প্রতি চরম ঘৃণা। আমেরিকার দক্ষিণের এই প্রাচীনপন্থী রাজ্যগুলোতে এখনও যে বর্বররা লুকিয়ে আছে, যাদের বিষাক্ত ঘৃণা মাঝে মাঝেই ঝলকে উঠে আমেরিকার দুশো বছরের হিংসার ইতিহাস, বৈষম্যের ইতিহাসকে আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, ডিলান ছিল তাদেরই বংশধর। তার ফেসবুকে সে লিখেই গেছে, সে কালোদের ও ইমিগ্র্যান্টদের ঘৃণা করে। সে সিভিল ওয়ার চায়। কনফেডারেট ফ্ল্যাগকে সে তার জাতীয় পতাকা বলে মনে করে।

মনে রাখা দরকার, আমেরিকার যুক্তরাজ্য কাঠামোয় বিভিন্ন রাজ্য নিজের নিজের স্বাতন্ত্র বজায় রেখে চলেছে। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাউথ ক্যারোলাইনা, টেক্সাস, জর্জিয়া প্রভৃতি রাজ্যে এখনও সেই এক বিরাট এক্স-মার্কা কনফেডারেট পতাকা সরকারি অফিস-কাছারিতে শোভিত হয়। রক্ষণশীল দক্ষিণীরা কনফেডারেট ফ্ল্যাগকেই তাদের দেশের ফ্ল্যাগ বলে মনে করে। বহু আন্দোলনে ও দাবিতেও দক্ষিণী রাজ্যগুলো এই ফ্ল্যাগকে নির্বাসন দিতে রাজি নয়। চার্লস্টনের ভয়ংকর ঘটনায় ন’জন কৃষ্ণাঙ্গ নরনারী নিহত হলেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। তার পর, রিপাবলিকান পার্টির কিছু নেতাও এই পতাকাকে নির্বাসন দিতে বলেছেন। সাউথ ক্যারোলাইনার ভারতীয় বংশোদ্ভূত গভর্নর নিকি হেলি প্রথমে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, পরে অবশ্য প্রবল চাপের মুখে পড়ে তা মেনে নিয়েছেন।

কনফেডারেট ফ্ল্যাগ তাদের, দাসপ্রথার বর্বরতা বজায় রেখে যারা লক্ষ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে কয়েকশো বছর ধরে মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিল। আমেরিকায় এ কাজ করে এসেছে উপরোক্ত দক্ষিণের রাজ্যগুলো এবং তার সঙ্গে মিসিসিপি, অ্যালাবামা, লুইসিয়ানা, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা, টেনেসি, কেনটাকি, মিসৌরি। ঠিক যেমন করেছে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী শ্বেতাঙ্গরা। দাসপ্রথার বিলোপ হওয়াতে তারা ক্রোধে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। প্রতিশোধ নেবার জন্যে লিঙ্কনকে হত্যা করেই তাদের কাজ শেষ হয়ে যায়নি। যখনই কালো মানুষদের হয়ে কেউ কথা বলেছে, তখনই তাকে এরা শেষ করে দিয়েছে। মার্টিন লুথার কিং, জন কেনেডি, ববি কেনেডি এবং আরও বহু সিভিল রাইটস ও হিউম্যান রাইটস নেতা ও নেত্রী তাদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন গত দেড়শো বছর ধরে। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ নরনারী কনফেডারেট ফ্ল্যাগকে হিটলারের স্বস্তিকার মতোই ভয় পান। কারণ, ইতিহাসটা একই। রাজনীতিটাও অনেকটা এক। চরম বিদ্বেষী, নিরঙ্কুশ আধিপত্যবাদী জীবনদর্শন। যা আমেরিকায়, দক্ষিণ আফ্রিকায়, জার্মানিতে এবং ভারতেও আমরা বার বার দেখে আসছি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় এখনও এক প্রাচীন অন্ধকার। কুক্লুক্স ক্ল্যান ও তাদের বহু গোপন ও প্রকাশ্য সংগঠন দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে এখনও বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে। ক্রিশ্চিয়ান কোয়ালিশন, মিনিটম্যান, প্রজেক্ট ইউএসএ, ইগল ফোরাম ইত্যাদি বহু সংগঠন তাদের এক্সিকিউটিভ বোর্ডে চরম জাতিবিদ্বেষী ব্যক্তিদের নির্বাচিত করে থাকে। এখনকার আমেরিকার উগ্র দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম টি পার্টি-র মধ্যে এমন বহু নেতা ও নেত্রী ঘাঁটি গেড়ে বসেছেন। এঁরা প্রায় সকলেই রিপাবলিকান পার্টির সদস্য বা সমর্থক। এবং এই অন্ধকার সমাজের অনেক গভীরে লুকিয়ে আছে। নিউ ইয়র্ক বা বড় বড় শহরের মানুষ অনেক বেশি উদার মনোভাব পোষণ করেন, কিন্তু একটু বাইরে গেলেই আমেরিকার আসল চেহারাটা প্রকট হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, ডিলান রুফের মতো ছেলেরা যে সামাজিক ব্যবস্থা থেকে উঠে আসছে, সেখানে এখনও কেকেকে ও শ্বেতাঙ্গ-আধিপত্যবাদীদের রাজত্ব। তাদের মনে আছে অপর-এর প্রতি ঘৃণা, প্রাচীনপন্থী সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব।

আর তাদের হাতে আছে এনআরএ-র সৌজন্যে পাওয়া স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। এনআরএ মানে ন্যাশনাল রাইফ্‌লস অ্যাসোসিয়েশন। এদের ক্ষমতা এখন এত বেড়ে গেছে যে দুই বড় দল রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কোনও নেতাই এখন আর এদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পান না। যখন প্রথম প্রথম এ দেশে আসি, তখন এনআরএ-র বিরুদ্ধে কিছু কিছু আন্দোলন দানা বাঁধতে দেখেছিলাম। কিন্তু বিশেষ করে গত দু’দশকে রাষ্ট্রচালকরা এই সামাজিক ব্যাধির কোনও প্রতিষেধক তৈরি করতে পারেনি। বারাক ওবামার সাত বছরে আমেরিকায় বড় বড় নারকীয় বন্দুকবাজি ও গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে। কানেক্টিকাট স্টেটের নিউ টাউনে বাচ্চাদের স্কুলে নারকীয় বন্দুকবাজি ও হত্যালীলায় সারা পৃথিবী আঁতকে উঠেছিল। কিন্তু এমন ভয়ংকর ঘটনার পরেও বারাক ওবামা ন্যাশনাল রাইফ্‌লস অ্যাসোসিয়েশনকে বাগে আনতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। এই নরমেধ যজ্ঞের পরে টেক্সাসের এক এনআরএ কর্তা ঘোষণা করেছেন, এই ঘটনার জন্য চার্লস্টন চার্চের প্যাস্টর অনেকাংশেই দায়ী, কারণ তিনি ওই চার্চে উপাসকদের বন্দুক নিয়ে যাওয়ার অনুমতি খারিজ করে দিয়েছিলেন! এই কর্তাটি নিজে আবার এক জন কৃষ্ণাঙ্গ। ও হ্যাঁ,এক সময় এনআরএ-র সর্বময় কর্তা ছিলেন হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা চার্লটন হেস্টন।

দু’একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে মার্কিন মূলস্রোত সংবাদমাধ্যমে এই বিষয় নিয়ে আজকাল কোনও আলোচনাই প্রায় হয় না। এনআরএ ও তাদের প্রভাবগ্রস্ত দুই রাজনৈতিক দল মানুষকে বুঝিয়েছে, আমেরিকার সংবিধানে দ্বিতীয় সংশোধনী বলে যে আইনটি আছে, তার বলে সমস্ত নাগরিকের বন্দুক সঙ্গে রাখা এক আইনসঙ্গত অধিকার, এর অন্যথা হওয়া অধর্ম, এমনকী ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরোধী। টেক্সাস, কলোরাডো, টেনেসি, কেনটাকির মতো জায়গায় গিয়ে লোকের বাড়ির ক্যাবিনেটে নানা রকম বন্দুক, রিভলভার সাজানো রাখা দেখেছি। আগে খুব আশ্চর্য লাগত, এখন আর লাগে না। ওয়ালমার্ট বা কেমার্টের মতো বিরাট বিরাট দোকানে প্রকাশ্যে বন্দুক বিক্রি হয়। বহু জায়গায় এমনকী ক্রেতার সম্পর্কে কোনও খোঁজখবরও নেওয়া হয় না। এক ব্যাগ পটেটো চিপসের সঙ্গে পয়সা ফেলে একটা সেমি-অটোমেটিক মারণাস্ত্র ও বুলেট কিনে বাড়ি চলে আসতে পারেন।

ডিলান রুফকে তার বাবা একুশ বছরের জন্মদিনে এই সব মারণাস্ত্র উপহার দিয়েছিলেন। ছেলে বাবার দেওয়া উপহার চমৎকার কাজে লাগিয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

abp post editorial united states gun culture racism apartheid us trigger happy partha bandyopadhyay
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy