উলুখাগড়ার প্রাণ যাওয়া যে কোনও যুদ্ধেরই অনিবার্য ভবিতব্য। নরেন্দ্র মোদীর ‘কালো টাকার বিরুদ্ধে সার্জিকাল স্ট্রাইক’-এও মারা পড়ল সাধারণ, গরিব মানুষই। সেই আঘাতের একটা দিক চোখের সামনে স্পষ্ট। যাঁরা দৈনিক মজুরিতে খেটে খান, তাঁদের কাজ নেই। বাজারে তরিতরকারি, মাছ নিয়ে যাঁরা বসেন, তাঁদের খদ্দের নেই। চাষির ফসল কেনার লোক নেই; হোটেল-রেস্তোরাঁয় খদ্দের কম, আরও কম টিপ্‌স-এর পরিমাণ। যাঁদের প্লাস্টিক মানি নেই, ই-ওয়ালেট ডাউনলোড করার মতো মোবাইল ফোন নেই, শপিং মল নেই, বাড়ি বয়ে খাবার দিয়ে যাওয়ার অ্যাপ নেই— এই পনেরো দিন তাঁদের সন্তানের জন্য দুধ এল কোথা থেকে, ওষুধের দোকানে কতখানি হয়রান হতে হল, দু’হাজার টাকা তোলার জন্য সারা দিনের কাজ শিকেয় তুলে দশ কিলোমিটার হেঁটে যেতে হল কি না, নরেন্দ্র মোদীরা সে খবর নেবেন না। হাল্লা চলেছে যুদ্ধে, তাতে কোল্যাটারাল ড্যামেজ হবে, সে আর নতুন কথা কী?

কাল না হোক পরশুর পরের দিন, অথবা ছ’মাস, কিংবা এক বছর পর টাকার জোগান ফের স্বাভাবিক হবে। তত দিন এই লোকগুলো কী ভাবে বাঁচবেন, সে প্রশ্ন আপাতত থাকুক। মার খেয়ে বেঁচে থাকার অভ্যেস গরিবের বিলক্ষণ আছে। এই ছ’মাস, এক বছরে ভারতীয় অর্থনীতির কতখানি ক্ষতি হবে, সেই হিসেবপত্রও এখন থাক। আপাতত ভাবি, সেই ‘স্বাভাবিক’ ভবিষ্যতে আমাদের চেনাজানা ব্যবস্থাগুলো বদলে যাবে কতখানি।

বাজার থেকে যত টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে, অনুমান করছি, তার পুরোটা বাজারে ফিরে আসবে না। অন্য সময় হলে হয়তো সংশয়টি উড়িয়ে দেওয়া যেত, কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর আমল বলেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করে ভাবতে ইচ্ছে করে, ঘটনাটি নিতান্ত ঘটে যাওয়া নয়, বরং সুপরিকল্পিত। নরেন্দ্র মোদী-অরুণ জেটলিরা জানতেন, সাত-দশ দিনে তো নয়ই, এমনকী প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নেওয়া ৫০ দিনেও টাকার জোগান স্বাভাবিক হওয়ার নয়। তাঁরা এই ‘অস্বাভাবিকতা’ই চেয়েছিলেন,  ভারতকে ‘ক্যাশলেস’ ভবিষ্যতের পথে ঠেলে দেওয়ার জন্য।

সরকার জানিয়ে রেখেছে, জন-ধন যোজনায় হাতে হাতে পৌঁছে যাবে ডেবিট কার্ড। সেই কার্ড সোয়াইপ করে আড়াইশো বিউলির ডাল আর তিনটে শ্যাম্পুর স্যাশে কিনব আমরা। গৃহপরিচারিকার কাজ করা যে বয়স্ক মহিলাটি এত দিন প্রতি মাসে ব্যাঙ্কের খাতায় ৫০০ টাকা জমা করতে গিয়ে অপেক্ষায় থাকতেন কোনও সহৃদয় মানুষের, যিনি তাঁর টাকা জমা দেওয়ার চালানটা লিখে দেবেন, সেই মহিলা কী ভাবে ডেবিট কার্ড ব্যবহার করবেন, ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’-য় সে প্রশ্ন নিষিদ্ধ। 

যে দোকানগুলো পারবে, কার্ড সোয়াইপ করার মেশিন বসাবে। ই-ওয়ালেট থেকে পেমেন্ট করার জন্য মোবাইল নম্বর লিখে ঝুলিয়ে রাখবে দোকানের সামনে। সব দোকানেই হবে? মনে হয় না। কাঁচা বাজারের কেনাকাটা চলবে কাঁচা টাকাতেই। ছোট মুদিখানারও ভরসা হবে সেই কাঁচা টাকাই। ক্রমশ যে টাকার অভাব বাড়তেই থাকবে, কারণ দেশ দৌড়বে ক্যাশলেস ভবিষ্যতের দিকে। যাঁদের মানিব্যাগে খানকয়েক ডেবিট আর ক্রেডিট কার্ড থাকবে, তাঁরা আর টাকার ঝকমারিতে যাবেন কেন? কেন পাঁচটা ছোট দোকানে পাঁচ রকম জিনিস কেনার পর পাঁচ বার কার্ড সোয়াইপ করার হাঙ্গামাও সহ্য করবেন? তাঁদের জন্য থাকবে শপিং মল, হাইপার স্টোর। যেখানে মাছ থেকে ডায়াপার, বিস্কুট থেকে হুইস্কি, সবই এক বারে কিনে ফেলা যাবে কার্ট বোঝাই করে। এক বারই লাইনে দাঁড়াবেন, এক বারেই টাকা মিটিয়ে দেবেন। অথবা, মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে আঙুল বুলিয়ে খুলে ফেলবেন অনলাইন হাইপার স্টোরের অ্যাপ। হাতে ধরা পাঁচ ইঞ্চিতেই দুনিয়া।

ক্রয়ক্ষমতা যাঁদের হাতে, তাঁরা যদি ক্রমশ সংগঠিত কেনাকাটার বাজারের দিকে সরে যেতে থাকেন, ব্যবসার দাঁড়িপাল্লা কোন দিকে ঝুঁকবে, আঁচ করতে কষ্ট নেই। ছোট মুদিখানার ব্যবসা কমবে। মার খাবেন ছোট সবজিওয়ালা, মাছওয়ালারা। অবশ্য, এখানেই গল্পটা ফুরিয়ে যায় না। কখনও রাতের দিকে মুদিখানায় গিয়ে দেখবেন, একের পর এক ঘর্মাক্ত চেহারার লোক সাইকেল চালিয়ে এসে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন। ওঁরা সাপ্লায়ারের কর্মচারী। মাস গেলে হাজার কয়েক টাকা মাইনে পান। লোকাল চানাচুর থেকে মাল্টিন্যাশনাল এফএমসিজি কোম্পানির সাবান-শ্যাম্পু-ইনস্ট্যান্ট নুডল, মুদিখানার প্রায় সব মালই এই পথে আসে। হাইপার স্টোরের সাপ্লাই চেন আলাদা। সেখানে বহুজাতিক সংস্থার মাল একেবারে ট্রাক বোঝাই হয়ে পৌঁছে যায় স্টোরের কেন্দ্রীয় গুদামে, তার পর সেখান থেকে পৌঁছোয় স্টোরে। মাঝখানের মানুষগুলোর এই সাপ্লাই চেনে ঠাঁই নেই। বাজারের পাল্লা ক্রমে হাইপার  স্টোরের দিকে ঝুঁকতে থাকলে এই মানুষগুলোর আর কাজ থাকবে না। তাঁদের পরিবারের কী হবে, ছোট মেয়েটার স্কুলের মাইনে বন্ধ হয়ে যাবে কি না, সেই হিসেব নেওয়ার দায় বাজারের নেই। মুদিখানার ব্যবসা যদি হাইপার স্টোর গিলে খায়, অর্থনীতির ক্ষতি নেই। বরং, পাড়ার সবজিওয়ালার ব্যবসা কমে যদি সেই টাকা শপিং মলে পৌঁছোয়, জিডিপি-র অঙ্কের লাভ।

ডিমানিটাইজেশনের ধাক্কায় আরও কত রণক্ষেত্রে আরও কত গরিবের মুণ্ডু গড়াগড়ি খাবে, সেই খতিয়ান লিখতে বসলে খবরের কাগজের পাতায় কুলোবে না। নরেন্দ্র মোদী এমন একটা কাজ করেছেন, কোনও যুক্তি দিয়েই যাকে দাঁড় করানো কঠিন। প্রশ্ন হল, গত পনেরো দিনে ঠিক কত বার এর সমর্থনে যুক্তি শুনেছেন? অথবা দিয়েছেন? সবই শুধু নরেন্দ্র মোদীর সাইবার আর্মি সমানে কুযুক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে বলে? রেডিয়োয় সরকারের সমর্থনে বিজ্ঞাপন বাজছে বলে? দেশপ্রেমের হাওয়া বেজায় জোরে বইছে বলে?

সবই উপসর্গ। ভারতীয় মধ্যবিত্ত সমাজের আসল ব্যাধি নরেন্দ্র মোদীরা ঢের আগে ধরে ফেলেছেন। সেই ব্যাধির নাম অ-রাজনীতি। অ-রাজনীতি মানে ভোট দিতে না যাওয়া নয়, অথবা কোনও দলের সমর্থনে বা অন্য কোনও দলের বিরোধিতায় তরজা জমানো বন্ধ করে দেওয়া নয়— অ-রাজনীতি মানে কোনও প্রসঙ্গকে তার সামাজিক তাৎপর্য দিয়ে বিচার করতে পারার ক্ষমতাকে হারিয়ে ফেলা। অ-রাজনীতি মানে শুধু নিজেরটুকু দিয়েই দুনিয়াকে দেখা। শিক্ষায়, কর্মসংস্থানে দলিতদের জন্য, অনগ্রসর শ্রেণির মানুষদের জন্য সংরক্ষণ কেন জরুরি, অ-রাজনীতি যেমন তা ভাবতে পারার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়— অথবা, সেই ক্ষমতা তৈরিই হতে দেয় না— তেমনই, বাজার থেকে রাতারাতি নগদ টাকা উধাও হয়ে গেলে কার সন্তানের মুখে দু’বেলা খাবার জোটে না, অ-রাজনীতি সেই কথাও আর ভাবতে দেয় না। অ-রাজনীতি যেটা নষ্ট করে দেয়, তার নাম সমানুভূতি, সমমর্মিতা। অন্যরা কেমন আছেন, তা অনুভব করার ক্ষমতা। নরেন্দ্র মোদীরা জানেন, নিজেদের ক্রেডিট কার্ড যত ক্ষণ চলছে, তত ক্ষণ অবধি পাশের বস্তিতে রান্না বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে ভাবার, রেগে যাওয়ার কোনও কারণ ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেই।

বলতেই পারেন, মধ্যবিত্ত শুধু নিজের কথা ভাবছে কোথায়? বরং বলছে, ‘দেশের ভাল’-র জন্য নিজের এই সমস্যাটুকু মেনে নিতে কোনও আপত্তি নেই। বলছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু, অ-রাজনীতি তাকে ভাবায়নি যে ‘দেশ’ বলতে আসলে কী বোঝায়? সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিকরা যে কাঁটাতার পাহারা দিচ্ছে, সেটাই দেশ, না কি তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা হরেক ধর্মের, ভাষার, খেতে না পাওয়া মুখগুলো? অ-রাজনীতি প্রশ্ন করায়নি, নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে এই মুখগুলোর ঠিক কতখানি ভাল হচ্ছে। সত্যিই যদি সব কালো টাকা ধ্বংস হয়ে যায়, তাতেই বা এই মুখগুলোর কতখানি ভাল? অর্থনীতির উন্নতির সুফল তাদের কাছে চুঁইয়ে আসা অবধি তারা বেঁচে থাকতে পারবে তো? এই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোই রাজনীতির প্রশ্ন।

অ-রাজনীতি এ ভাবে ভাবতে পারার অ-ক্ষমতা। বৃহত্তর ন্যায়ের বিচার করতে না পারা, না শেখা। তার চেয়েও বেশি, যারা এখনও এই প্রশ্নগুলো করে চলেছেন, তাঁদের প্রতি অবজ্ঞা পোষণ করা, তাঁদের শত্রু হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া। অ-রাজনীতি হল বিনা প্রশ্নে রাষ্ট্রকে মেনে নেওয়া; যত ক্ষণ সরাসরি নিজের গায়ে আঁচ না লাগছে, তত ক্ষণ অবধি টুঁ শব্দটি না করা। নরেন্দ্র মোদীরা জানেন, তাঁদের ভারত অ-রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আমরাই সে কথা জানিয়ে দিয়েছি। গুজরাতের উন্নয়নের হাওয়ায় ভাসানো গল্পকে মেনে নিয়ে ভারত যে দিন গুজরাতের ২০০২ সালকে ভুলতে দ্বিধা করেনি, সে দিনই আমরা বলে দিয়েছি— আমাদের রাজনীতি নেই।

ভাল থাকা-না থাকার মাপকাঠি যখন বাজার স্থির করে দেয়, যখন কিনতে পারার ক্ষমতাকেই ক্রমে ভাল থাকার ক্ষমতা বলে ভুল হতে থাকে, তখন এই অ-রাজনীতির অভ্যুত্থানই ভবিতব্য? না কি, বাম রাজনীতির বেধড়ক ব্যর্থতা? যে রাজনীতি বাজারের প্রতিস্পর্ধী মূল্যবোধের কথা বলতেই ভুল গিয়েছে? যে রাজনীতি শেখাতে ভুলে গিয়েছে কী ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের কথা, অপর’-এর কথা ভাবতে হয়, ভেবে চলতে হয়? প্রশ্নটা তোলা থাক। হয়তো সীতারাম ইয়েচুরি কোনও এক দিন টুইট করে উত্তর জানাবেন।

আপাতত অর্থনীতির গোড়া ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েও নরেন্দ্র মোদীরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। তাঁরা জানেন, সাইকেল চালিয়ে মুদিখানায় চানাচুরের প্যাকেট দিয়ে যান যিনি, অথবা যিনি ফলপট্টিতে দিনভর পেটি বয়ে ছেলের স্কুলের মাইনে জোগান, তাঁরা বাঁচলেন কি না, তা নিয়ে এখন মাথা না ঘামালেও চলবে।

যত ক্ষণ অবধি শপিং মলে ক্রেডিট কার্ড চলছে, স্মার্টফোনে অ্যাপস চলছে, সার্জিকাল স্ট্রাইক জিন্দাবাদ।