E-Paper

অবসান

হিড়মার মৃত্যু যে কেন্দ্রের কাছে শুধুই এক ধুরন্ধর অধরা মাওবাদী নেতার অবসান নয়, তার গুরুত্ব যে সুদূরপ্রসারী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া লক্ষ্য মাথায় রাখলে তা বোঝা যাবে।

শেষ আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৪:২৮

ছত্তীসগঢ়-অন্ধ্রপ্রদেশ-তেলঙ্গানা সীমান্তের ঘন জঙ্গলে যৌথবাহিনীর অভিযানে গত মাসে নিহত হলেন শীর্ষ মাওবাদী নেতা মাড়বী হিড়মা ওরফে সন্তোষ। এ ঘটনাকে মাওবাদী আন্দোলনের প্রকৃত অবসান বলে দাবি করছে নিরাপত্তা বাহিনী— গত দেড় দশকেরও বেশি সময়ে যাঁর উত্থান ও আগ্রাসন মাওবাদী আন্দোলন তথা গেরিলা আক্রমণকে প্রায় অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল; দন্তেওয়াড়া, ঝিরাম ঘাঁটি, সুকমা-বিজাপুর’সহ একের পর এক জায়গায় যাঁর নেতৃত্বে হামলায় সব মিলিয়ে শতাধিক সেনা, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু হয়েছে; এনআইএ ও নানা রাজ্য পুলিশের ঘোষণায় যাঁর ‘মাথার দাম’ উঠেছিল এক কোটি— তাঁকে বাগে পাওয়া ও ‘নিকাশ’ করা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বড় সাফল্য; স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার শামিল।

হিড়মার মৃত্যু যে কেন্দ্রের কাছে শুধুই এক ধুরন্ধর অধরা মাওবাদী নেতার অবসান নয়, তার গুরুত্ব যে সুদূরপ্রসারী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া লক্ষ্য মাথায় রাখলে তা বোঝা যাবে। অমিত শাহের ঘোষিত ‘প্রতিশ্রুতি’— আগামী বছর ৩১ মার্চের মধ্যে দেশ থেকে মাওবাদীদের মুছে ফেলা। সম্প্রতি যে গতিতে মাওবাদীদের ধরপাকড় ও তাঁদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান চলছিল তাতেই সরকারের সুস্পষ্ট রোখ ফুটে উঠেছে। তার ফলাফলও চোখের সামনেই: চলতি বছরেই চলপতি, বাসবরাজু, সুধাকরের মতো শীর্ষ মাওবাদী নেতারা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত। পদমর্যাদার বিচারে এঁদের গুরুত্ব যারপরনাই: কেউ মাওবাদী পলিটব্যুরোর সদস্য, কেউ সাধারণ সম্পাদক, কেউ ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটিতে। সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারকদের এ-হেন পরিণতির পাশাপাশি লক্ষণীয় বহু মাওবাদী নেতা-নেত্রী ও সহযোগীর আত্মসমর্পণ, বেণুগোপাল রাও বা ওয়াম লাকমুর উদাহরণ মনে পড়তে পারে। মাওবাদীদের পরিধি যে ছোট হয়ে আসছিল তাতে সন্দেহ নেই; হিড়মার মৃত্যুকে এই ঘটনাক্রমের নিরিখে দেখলে মাওবাদ দমনে সরকার তথা রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘চূড়ান্ত সাফল্য’ বলেই মালুম হয়।

তবে, এই সাফল্যের পথ প্রশ্নাতীত নয়। নেতাদের মৃত্যু বা আত্মসমর্পণ হেতু মাওবাদী নেতৃত্বসঙ্কট, আন্দোলন সম্পর্কে ক্যাডারদের একাংশের মোহভঙ্গ যেমন সত্য, ততটাই সত্য মাওবাদীদের সংগঠনে বিভাজন বা ক্যাডারদের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র সুযোগ নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর আরও সক্রিয় হয়ে ওঠা, নেতাদের গতিবিধির খোঁজ পেয়ে যাওয়া। আবার, যে অরণ্যবাসী মানুষ দশকের পর দশক ধরে মাওবাদীদের আশ্রয়দাতা, সমর্থক, সদস্য-জোগানের আধার হয়ে উঠেছিলেন, তাঁদেরই সঙ্গে এ কালে মাওবাদীদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে— সেও বহুলাংশে রাষ্ট্র-পরিকল্পিত: বনাকীর্ণ, খনিজসমৃদ্ধ যে বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের কাছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অধিকার প্রতিষ্ঠার সূত্র ধরে মাওবাদীরা গোড়ায় তাঁদের সহানুভূতি পেয়েছিলেন, এ যুগে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়ে, অল্প কিছু ক্ষেত্রে হাতে-কলমে কাজ করে রাষ্ট্র সেই সহানুভূতির হাওয়া নিজেদের দিকে ঘোরাতে সক্ষম হয়েছে। মাওবাদী রক্ত-হিংসার পথটি প্রকৃত পথ নয়, কিন্তু তাঁদের আন্দোলনের উপজাত হিসেবে জনজাতিভুক্ত হতদরিদ্র এই মানুষদের প্রতি রাষ্ট্রের চূড়ান্ত অবহেলা প্রকট হয়েছিল। এখন রাষ্ট্রীয় ঢাকঢোল পিটিয়ে মাওবাদী দমন নাহয় হল, কিন্তু এই প্রান্তিক ভারতীয়দের জীবন এর পরেও পাল্টাবে কি?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Maoist Central Government Maoists

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy