বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর দল-সহচররা কেন কথায় কথায় জওহরলাল নেহরুর প্রতি ঘৃণাভাষণ করে থাকেন, বুঝতে অসুবিধা হয় না। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের অনেক ভিত্তিপ্রস্তর প্রতিষ্ঠাতেই তাঁর ব্যক্তিগত ভূমিকা বিশেষ স্মরণীয়, সে ঠিক বা ভুল যে অভিমুখেই হোক না কেন। ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতির কথা ভাবতে গেলেও আবার সেই প্রথম প্রধানমন্ত্রীরই বিভিন্ন বক্তব্যের শরণাপন্ন হতে হয়। এই মুহূর্তে দেশে জাতীয় সংসদের আরও এক অধিবেশন চলমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন বিরোধীরা না কি এ বার সংসদে এমন সৃষ্টিছাড়া আচরণ করছেন যা অভূতপূর্ব। এ কথা শুনে নেহরুর একটি ভর্ৎসনাবাক্য মনে পড়ে— যা তিনি উচ্চারণ করেছিলেন ১৯৬৩ সালে, মৃত্যুর এক বছর আগে। সেই সময় একের পর এক ঘটনায় সংসদে তৎকালীন বিরোধীরা অচলাবস্থা তৈরি করছিলেন, বিশেষত ‘অফিশিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাক্ট’ বিতর্ক নিয়ে সংসদ বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ভারতীয় জনসঙ্ঘের স্বামী রামেশ্বরানন্দ এত বিশৃঙ্খলা তৈরি করেন যে তাঁকে জোর করে সংসদ-কক্ষ থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে হয়। জনসঙ্ঘের আর এক সাংসদ অন্যের হাত থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে তারস্বরে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কুৎসিত বাক্য উচ্চারণ করেন। রামেশ্বরানন্দ সংসদের সেন্ট্রাল হলের মধ্যেই আগুন জ্বালিয়ে তাতে বিলের একটি প্রতিলিপি পোড়ানোর প্রস্তুতি নেন। এই বিপজ্জনক কাজে তাঁকে বাধা দিলে তিনি সংসদের গেটের সামনে গিয়ে একই কাজ করেন। ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী নেহরু বলেন, “জানি না এঁরা কেউ জানেন কি না কাকে বলে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কী ভাবে চলাফেরা, কাজকর্ম করতে হয়।” বিরোধীদের বাধাদানে রাষ্ট্রপতির বক্তৃতাদান আটকে যাওয়ার উপক্রম হলে অত্যন্ত বিরক্ত ও বিচলিত নেহরু বলেন: “কেবল আমাদের আচারে-ব্যবহারে শৃঙ্খলা রাখার কথাই ছিল না এই সংসদে, তার থেকে বেশি দায়িত্ব ছিল আমাদের। দেশের মর্যাদা ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেও কিছু রীতিপদ্ধতি তৈরি করার কথা ছিল।” (২৪ এপ্রিল)
পরবর্তী কালে সংসদে অধিবেশন চলাকালীন কুনাট্যের পরিমাণ ও তীব্রতা কেবল বাড়তেই থাকে সময়ের সঙ্গে। নেহরুর মৃত্যুর পর সংসদে অশান্তি তৈরির প্রবণতা এমন মাত্রায় বেড়ে যায় যে মরিস-জোনস নামে স্বাধীন ভারত বিষয়ক এক গবেষক মনে করেছিলেন, নেহরু মৃত্যুর সঙ্গে ভারতে ওয়েস্টমিনস্টার মডেলেরও মৃত্যু ঘটে গিয়েছিল। পার্লামেন্টকে একটি উচ্চধারার নৈতিক প্রতিষ্ঠান, এবং ভারতীয় আধুনিক রাজনীতির শ্রেষ্ঠ প্রতীক হিসাবে দেখার যে দৃষ্টি, তারও বিলোপ ঘটেছিল। ইতিহাসবিদ-দ্বয় লয়েড রুডলফ আর সুজ়ান রুডলফ-এর মনে হয়েছিল, গোড়া থেকেই ভারতীয় সাংসদরা সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিনীতিতে আগ্রহী ছিলেন না, বিশেষত মান্য সংসদীয় রীতির যে সব নির্ধারিত সীমা, তা মানতে তাঁরা অনেকেই অরাজি ছিলেন। ফলে যাঁরা মুখের কথায় পারদর্শী ছিলেন না, তাঁরা সহজেই জুতো ছোড়ার দলে জুটে গেলেন।
একুশ শতকের দ্বিতীয় দশক অবশ্য এর মধ্যেও আলাদা করে নজর কেড়ে নেয়। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে (২০০৯-১৪) যে ভাবে দিনের পর দিন সংসদে তীব্র অশান্তি, সংঘর্ষ, অচলাবস্থা তৈরি হত, এবং সংসদীয় কার্যক্রম অধিকাংশ দিন বন্ধ করে দেওয়া যেত, তা স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে অভূতপূর্ব, নজিরবিহীন। ২০১৪-পরবর্তী কালেও সংসদকক্ষে বিরোধীরা তার তুলনীয় অ-ঘটন ঘটানোর সুযোগ পাননি— এতটাই বিশিষ্ট হয়ে আছে সেই সময়ের রাজনীতি। এর একটি কারণ ২০১৪ সালের পর সরকারি পক্ষের নিজস্ব রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যা বিরোধী পরিসর প্রথম থেকেই সঙ্কুচিত করে রেখেছিল। ২০১৪ সাল সে দিক থেকে একটি বিভাজিকারেখা কি না, তা বলবেন সাংবিধানিক গণতন্ত্রের গবেষকরা। একটি কথা সহজবোধ্য— ইউপিএ আমলে যে সংখ্যক বিল পাশ করা হত, পরবর্তী এনডিএ সরকারের আড়াই দফায় পাশ হওয়া বিল তার থেকে বহু বেশি, এবং বিল-বিষয়ক আলোচনা-বিতর্ক উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কম। সুতরাং এখনকার সংসদীয় অস্থিরতার অভিযোগ আদৌ খণ্ডন না করে, এবং তার গুরুত্ব কিছু মাত্রায় না-কমিয়েও কোনও নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক হয়তো বলতে পারেন যে, এ কালের বিরোধী পক্ষ তাঁদের পূর্বসূরিদের থেকে অনেকখানি পিছিয়ে আছেন। এবং সংসদীয় আলোচনা পর্যালোচনার পরিবেশ তৈরিতে অনেকখানি ব্যর্থ হয়েছেন সরকার পক্ষ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)