২২ মাসে ১৩৬ এনকাউন্টার! ভোট নজরদারিতে আসা যোগী-ঘনিষ্ঠ কে এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ আইপিএস ‘সিংহম’ অজয়?
রাজ্যে পা দিয়েই বিতর্কে জড়িয়েছেন। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনী লড়াই সামাল দিতে পুলিশ পর্যবেক্ষক করে আনা হয়েছে ‘এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট’। কে এই উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের আইপিএস অজয় পাল শর্মা?
তাঁর নামের সঙ্গে জুড়েছে একাধিক তকমা। এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট, দবং থেকে যোগীরাজ্যের সিংহম। পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনী লড়াই সামাল দিতে তাঁকে পুলিশ পর্যবেক্ষক করে আনা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ পুলিশ অফিসারকে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে এসেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। এইমুহূর্তে রাজ্য রাজনীতির অন্যতম চর্চিত নাম আইপিএস অজয়পাল শর্মা।
রাজ্যে পা দিয়েই বিতর্কে জড়িয়েছেন অজয়। ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের বাড়িতে গিয়ে তাঁর হুমকি ও হুঁশিয়ারির ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে। এই ঘটনা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজাও। ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
রাজনৈতিক শিবিরের দাবি-পাল্টা দাবিতে সরগরম রাজ্যের আবহাওয়া। পুলিশ পর্যবেক্ষক ‘সিংহম’ অজয়পাল শর্মার ভূমিকা নিয়ে সোমবার থেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস।
২৯ এপ্রিল, বুধবার রাজ্যে দ্বিতীয় তথা শেষ দফার ভোটগ্রহণ চলছে। ঠিক তার দু’দিন আগে সোমবার ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গিরের বাড়িতে হানা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশ। এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন উত্তরপ্রদেশের দুঁদে আইপিএস অজয়।
ঘটনার পর পুলিশ পর্যবেক্ষকের এক্তিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো স্পর্শকাতর এলাকায় উপস্থিত হয়ে তিনি যে ভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তা নিয়ে জোর গুঞ্জন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে। তবে এই ধরনের আলোচনা-সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে রাজি হননি অজয়।
আরও পড়ুন:
ভোটের দিন সকাল থেকে নিজের মেজাজেই রাজ্যে চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। তাঁর কনভয় শিরাকোল হয়ে সোজা চলে যায় ডায়মন্ড হারবার স্টেশনের কাছে সিআরপিএফের অস্থায়ী ক্যাম্পে। ভোটের আগের দিনও, অর্থাৎ মঙ্গলবার দিনভর তিনি নিজের এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন।
অজয়কে কেন উত্তরপ্রদেশে ‘সিংহম’ বা ‘এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট’ নামে ডাকা হয় তা নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল ও জল্পনার শেষ নেই। কে এই দোর্দণ্ডপ্রতাপ আইপিএস, যাঁর প্রতাপে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়?
২০১১ সালের উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের এই আইপিএস পঞ্জাবের লুধিয়ানার ভূমিপুত্র। কেরিয়ারও চোখধাঁধানো। আইপিএস হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার আগে তিনি ছিলেন দন্তচিকিৎসক। পটিয়ালার সরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে তিনি ডেন্টাল সার্জারি বা বিডিএস পাশ করেন। সাদা অ্যাপ্রন ছেড়ে বেছে নিয়েছেন খাকি উর্দি। হাতে তুলে নিয়েছেন আগ্নেয়াস্ত্র।
সুষ্ঠু ভোট করাতে নতুন করে যে ১১ জন পুলিশ পর্যবেক্ষকের তালিকা প্রকাশ করেছিল কমিশন, তাতে প্রথম নাম ছিল অজয়ের। বর্তমানে প্রয়াগরাজের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি।
আরও পড়ুন:
উত্তরপ্রদেশে একাধিক এনকাউন্টারের কারণে তিনি ‘এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট’ বা ‘সিংহম’ নামে পরিচিত। জৌনপুরের পুলিশ সুপার হিসাবে তাঁর মেয়াদকালে তিনি ৫০০টিরও বেশি পুলিশি এনকাউন্টার পরিচালনা করার কৃতিত্ব অর্জন করেন।
মাত্র ২২ মাসে ১৩৬টি এনকাউন্টার করার ‘কৃতিত্ব’ রয়েছে চল্লিশোর্ধ্ব অজয়ের। ৫ অভিযুক্তকে নিকেশ করেছেন তিনি। এনকাউন্টার বিশেষজ্ঞ হিসাবে পরিচিত অজয়ের হাত থেকে অপরাধীদের ছাড় পাওয়া দুষ্কর। এই কড়া মনোভাবই তাঁকে নামের সঙ্গে ‘সিংহম’ উপাধিটি জুড়তে সাহায্য করেছে।
নয়ডা, শামলি, জৌনপুর এবং রামপুর-সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন অজয়। যোগী আদিত্যনাথের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত অজয়। এ-হেন কড়া অফিসারকে এ রাজ্যের নির্বাচনে ‘তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি’ বলে পরিচিত এলাকার পর্যবেক্ষক করে পাঠানোর পর তাঁর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগও দায়ের হয়েছে।
রবিবার মধ্যরাতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতায় অভিযান চালিয়েছিল পুলিশ। সেই অভিযানের প্রসঙ্গ টেনেই থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। অভিযোগকারিণীর দাবি, আদালতের কোনও আদেশ বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই রাতে তাঁর বাড়িতে ঢুকেছিলেন সিআরপিএফ পরিচয়ধারী কয়েক জন।
অভিযোগকারিণী জানিয়েছেন রবিবার রাতে যা ঘটেছিল, তা আইন মেনে ঘটেনি। সিআরপিএফ পরিচয়ধারীরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে শ্লীলতাহানি, শারীরিক নির্যাতন করেছেন বলেও অভিযোগ ওই মহিলার। অভিযোগপত্রে তিনি এ-ও উল্লেখ করেন ওই ঘটনায় অজয়পালের সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
তাঁর একটি ভিডিয়ো ঘিরেও বিতর্কের সূত্রপাত। দাবি উঠেছে ভিডিয়োটি ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের বাড়ির কাছেই ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে। অভিযোগ সেখানে তৃণমূল প্রার্থীর পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশেও হুঁশিয়ারির সুরে কথা বলছেন কমিশন নিযুক্ত পর্যবেক্ষক।
তাঁর হুঁশিয়ারির ভিডিয়ো সামনে আসতে এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল। তার মাঝেই আইপিএস অফিসারকে খোঁচা দিয়ে সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। ওই ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, চটুল হিন্দি গানে নাচছেন স্বল্পবসনা নর্তকীরা। কয়েক জন যুবকের মনোরঞ্জন করছেন তাঁরা। নর্তকীদের সঙ্গে দৃশ্যমান যুবকটি আদিত্যনাথের রাজ্যের ‘এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট’ বলে দাবি করেছেন মহুয়া। যদিও এই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম।
দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে কঠোর ভাবে সতর্ক করতে দেখা গিয়েছে ভিন্রাজ্য থেকে আসা এই আইপিএসকে। সূত্রের খবর, জেলায় পৌঁছোনোর পর তিনি স্থানীয়দের কাছ থেকে অভিযোগ পান। ফলতা থেকে তৃণমূলের প্রার্থীর সহযোগীরা স্থানীয় ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছেন। ভোটারদের হুমকি দিলে ফল ভাল হবে না, মোটামুটি এটাই জাহাঙ্গিরের পরিচিতদের বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন আদিত্যনাথের রাজ্যের ‘এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট’।