Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৫ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

শাসক যদি একটু শুনতেন

ভাঙড় আবার অগ্নিগর্ভ। গত ১২ মে ছ’জন গ্রামবাসীকে গ্রেফতার করা নিয়ে আবার অশান্তি। আবার অবরোধ, গুলি, বোমা, চাপান-উতোর। তার পরে সপ্তাহখানেক ধরে

বোলান গঙ্গোপাধ্যায়
২৬ মে ২০১৭ ০৯:১৫
Save
Something isn't right! Please refresh.
দ্বিমত: ভাঙড়ে পাওয়ার গ্রিড সাব স্টেশন নির্মাণের বিরুদ্ধে জনসভায় শর্মিষ্ঠা চৌধুরী। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭।

দ্বিমত: ভাঙড়ে পাওয়ার গ্রিড সাব স্টেশন নির্মাণের বিরুদ্ধে জনসভায় শর্মিষ্ঠা চৌধুরী। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭।

Popup Close

ভাঙড় আবার অগ্নিগর্ভ। গত ১২ মে ছ’জন গ্রামবাসীকে গ্রেফতার করা নিয়ে আবার অশান্তি। আবার অবরোধ, গুলি, বোমা, চাপান-উতোর। তার পরে সপ্তাহখানেক ধরে সশস্ত্র পাহারা চলছে, যাতে কোনও গ্রামবাসী বের না হতে পারেন। ছাত্রছাত্রীদের স্কুল-কলেজ যাওয়া বন্ধ। অসুস্থ শিশুকে নিয়ে মা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে পারেন না। মানুষের রুজি-রোজগারে হাত। এখানকার মানুষের মূল রোজগার মাছের ব্যবসা থেকে। প্রায় মধ্যরাতে তাঁদের মাছের আড়তে যেতে হয়। লুকিয়ে-চুরিয়ে ঘুরপথে বেরোলেও সশস্ত্র প্রতিরোধের সামনে আর ফিরতে পারেন না। ফিরলে আর বেরোতে পারেন না। মাঝে গ্রামের জল-আলো বন্ধ করারও চেষ্টা হয়েছে। এরই মধ্যে এক দল সন্ত্রস্ত গ্রামবাসী শান্তি আসার আকাঙ্ক্ষায় ‘আন্দোলন সমর্থন করি না’ বলে মুচলেকা দিলেন থানায়।

ভাঙড়ে সমস্যার সূত্রপাত সেই ২০১২’য়। ২০১৩-তে রাজনৈতিক চাপে সাড়ে তেরো একর জমি বাজার দরের অর্ধেকেরও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার পর থেকেই গ্রামবাসীরা ক্ষুব্ধ ছিলেন। প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল খুঁটির জমি দেওয়াকে কেন্দ্র করে। ২০১৪-য় পাঁচিল দিয়ে কাজ শুরু হয়ে যায়। ২০১৫ থেকে হাড়োয়া রোড ও খামারআইট গ্রামের মোড়ে অধিগৃহীত জমিতে ট্রান্সমিটার আসতে থাকে। গ্রামবাসীদের প্রতিবাদ জারি থাকে, ভিতরে কাজও চলতে থাকে। ২০১৬-র অক্টোবর মাসে, গ্রামবাসীদের বিক্ষোভের আঁচ পেয়ে পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন-এর এক কর্তা তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন। স্থানীয় প্রশাসনিক দফতরে মিটিং হয়। এ পর্যন্ত এটিই ভাঙড় সমস্যা নিয়ে একমাত্র আলোচনাসভা। গ্রিডের আধিকারিক ছাড়াও স্থানীয় গ্রামবাসীদের পাঁচ জন প্রতিনিধি, শাসক দলের স্থানীয় কেষ্টবিষ্টুরা ও এক জন আধিকারিক উপস্থিত ছিলেন। সেই মিটিংয়ে গ্রামবাসীরা তিনটি প্রশ্নের লিখিত উত্তর চান। এক, জনবহুল এলাকায় ‘পাওয়ার গ্রিড সাব স্টেশন’ তৈরি হওয়ার লিখিত নির্দেশ। দুই, সালফার হেক্সাফ্লুয়োরাইড গ্যাস ব্যবহৃত হলে তা যে এলাকার মাছ, ধান, মানুষ, অন্যান্য প্রাণী ও পরিবেশের কোনও ক্ষতি করবে না— সে বিষয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি। তিন, পরিবেশ দফতরের লিখিত ছাড়পত্র। আজ পর্যন্ত এই তিনটি প্রশ্নের কোনও মীমাংসা হয়নি। গ্রিড কর্পোরেশন কেবল মুখে বলেন যে, সালফার হেক্সাফ্লুয়োরাইড ব্যবহার করার জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা তাঁরা নেবেন। বাকি দুটি প্রশ্নের কোনও মৌখিক উত্তরও দেননি।

এর পর, সম্ভবত এই প্রশ্ন করার ঔদ্ধত্যের সমুচিত জবাব দিতেই, গ্রামে পুলিশ চৌকি, পুলিশি টহল শুরু হয়। ২০১৬-র ৩ নভেম্বর গ্রামে ঢুকে ঘরদোর তছনছ করে ময়ূরজান বিবি, নূরজাহান বিবি আর নিলোফার বেগম— তিন মহিলা-সহ ছ’জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ১৭ দিন জেল হেফাজতের পর তাঁরা জামিন পান। কেস চলছে। ভাঙড় আন্দোলনে এই গ্রেফতারির একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। গ্রেফতারির পর, এঁদের জামিনের ব্যবস্থা করতে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর শরণাপন্ন হন গ্রামবাসীরা। তাঁরা অনুধাবন করেন, এত দিন যে ভাবে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে তাঁরা তাঁদের প্রশ্ন ও বক্তব্য জানাচ্ছিলেন, সে ভাবে প্রশাসনকে সজাগ করা যাবে না। বাইরের সাহায্য দরকার। তাঁরা যখন কলকাতার এপিডিআর ও অন্যান্য সমাজ-সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তখন তাঁদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, বিভিন্ন সচেতন মানুষ গ্রামে যান ঠিক কী ঘটছে, জানতে। এঁদের ‘বহিরাগত মাওবাদী’ বলে চিহ্নিত করা হয় শাসক দলের পক্ষ থেকে। প্রসঙ্গত, ‘রেড স্টার’ কোনও নিষিদ্ধ মাওবাদী সংগঠন নয়, এঁরা সংসদীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। এর পর তৈরি হয় ‘জমি-জীবিকা বাস্তুতন্ত্র পরিবেশ রক্ষা কমিটি’।

Advertisement

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এক বারও না শাসক দল, না প্রশাসন, না ‘গ্রিড কর্পোরেশন’ সমাধানের জন্য আলোচনার আহ্বান জানায়নি। প্রসঙ্গত, ভাঙড়ের মতো ঘনবসতি ও জীববৈচিত্রপূর্ণ এলাকা যে গ্রিড সাব স্টেশনের জন্য বাছা হয়েছে, তার কোনও রেকর্ড কাগজে-কলমে কোথাও নথিবদ্ধ নেই। গ্রামবাসীরা কিন্তু গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ জানানোর রাস্তা ছেড়ে দেননি। কাশিপুর থানায় পঞ্চাশটিরও বেশি আপত্তিপত্র জমা পড়ে, যাতে খুঁটি পোতার জমি দিতে অস্বীকার করেন গ্রামবাসীরা। ২২ ডিসেম্বর রাজ্যপালকে স্মারকলিপি দিতে আসেন ছ’সাত হাজার মানুষ।

১১ জানুয়ারি প্রায় দশ হাজার গ্রামবাসী টানা দশ-বারো ঘণ্টা হাড়োয়া রোড অবরোধ করে রাখেন। ‘মানুষ না চাইলে হবে না’ প্রতিশ্রুতি পেয়ে তাঁরা অবরোধ তুলে নেন। কিন্তু অধিগৃহীত জমিতে কাজ বন্ধ হয় না। এরই মধ্যে ১৬ জানুয়ারি হাড়োয়া রোডে নিজের অফিস থেকে আন্দোলনের নেতা সামসুল হককে সিআইডি তুলে নিয়ে যায়। জনগণ আবার অবরোধ করে। পুলিশ আধিকারিক রাতে সামসুলকে মুক্তি দিলে, অবরোধ ওঠে। ১৭ তারিখ সকালে পুরুষশূন্য গ্রামে (বেশির ভাগ গ্রামছাড়া, বাকিরা মাঠে) মহিলা পুলিশ না নিয়ে এক দল পুলিশ লাঠি বন্দুক হাতে গ্রামে ঢুকে তাণ্ডব চালায়। সঙ্গে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম মডেলে পুলিশের পোশাক পরা, কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা এক দল লোক ছিল। বাইরের পৃথিবীর মাছিও যাতে গলে যেতে না পারে, সে জন্য পুলিশ কর্ডন করে রেখেছিল। এই তাণ্ডবের পরিণতি দুই সদ্য-যুবক মফিজুল হক, আলমগীর হোসেনের গুলিতে মৃত্যু।

এর পর গ্রামে পুলিশ যাতে ঢুকতে না পারে, সে জন্য গ্রামবাসীরা সমস্ত ভিতরের রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ শুরু করেন। এই ছবিই আমরা বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমে দেখেছি। দেখেছি মৃতদের পরিবারকে সরকারি ক্ষতিপূরণের অর্থ তুলে দিতে। তখনও প্রশাসন বা পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশনের আলোচনায় বসার কথা মনে হয়নি। ইতিমধ্যে কমিটির সঙ্গে যুক্ত বা যুক্ত নয় এমন গ্রামবাসীরা গ্রেফতার হতে থাকেন। এপিডিআর-এর ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম’-এর সদস্যদের কেস দেওয়া হয়। জামিন নিতে গেলে, বারুইপুর আদালত চত্বরে শাসক দলের পতাকা ও স্লোগান-সহ এক দল লোক তাঁদের ও আইনজীবীদের উপরে হামলা করে। তীব্র প্রতিবাদ করেন পশ্চিমবঙ্গ ও বাইরের বুদ্ধিজীবীরা।

কেবল মামলা বা জামিন-অযোগ্য ধারা প্রয়োগ নয়, কালা কানুনও লাগু করা হয় প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে। এ পর্যন্ত মোট ৩৮ জনকে ইউএপিএ দেওয়া হয়েছে। ন’জন ছাড়া বাকি সকলেই গ্রামবাসী। আর ১৬ জন জেলবন্দির মধ্যে ১২ জন গ্রামবাসী। এই হিসেব ১২ মে-র আগে পর্যন্ত। কলকাতায় তৈরি হওয়া ‘ভাঙড় আন্দোলন সংহতি কমিটি’র দু’জনকে ইউএপিএ দিয়ে বন্দি করা হয়েছে।

বার বার শাসক দলের নেতা-নেত্রীদের মুখে শুনেছি, বিভিন্ন ভুল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাই নাকি এই আন্দোলনের মূল কারণ। শাসক দল ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বার বার এ কথাও বলা হয়েছে যে, এই সাব স্টেশন তৈরি হলে, অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহের উন্নতি হবে। প্রথমে দেখা যাক, এই দাবির কোনও ভিত্তি আছে কি না।

বিদ্যুৎব্যবস্থা বলতে আমরা বুঝি, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, সেখান থেকে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার জন্য বণ্টন কেন্দ্র বা সাব-স্টেশন, আর বণ্টনকেন্দ্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংবহন (ট্রান্সমিশন) লাইন। এখন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে অনেক কম ভোল্টে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। সংবহনের খরচ কমাতে তাকে ‘স্টেপ-আপ’ করে চারশো কেভি অর্থাৎ চার লক্ষ ভোল্টে নিয়ে গিয়ে সংবহন লাইনে পাঠানো হয়। এই কাজ হয় ‘পাওয়ার গ্রিড সাব স্টেশন’-এ। কিন্তু চার লক্ষ ভোল্টের বিদ্যুৎ তো সাধারণ ভাবে কোনও গ্রাহকের কাজে লাগে না। তাই তাকে আবার ‘স্টেপ-ডাউন’ করে ২২,০০০ (রেলের জন্য), ৪৪০ ও ২২০ ভোল্টে এনে গ্রাহককে পাঠানো হয়। ভাঙড়ের পাওয়ার গ্রিড সাব স্টেশনে স্টেপ-আপের কাজটি হওয়ার কথা। এখানে অনেক কম ভোল্টে বিদ্যুৎ ঢুকে সংবহন লাইন দিয়ে চার লক্ষ ভোল্টে বেরিয়ে পূর্ণিয়া পর্যন্ত যাবে। লক্ষণীয়, কেন্দ্রীয় সরকারের ‘এক জাতি এক গ্রিড’ নীতি অনুসরণে ন্যাশনাল পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন সারা ভারতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বণ্টন কেন্দ্র ও সংবহন লাইনগুলিকে যুক্ত করতে চায়। এর ফলে বিদেশে বিদ্যুৎ বিক্রির পথও সুগম হবে। ভাঙড় থেকে পূর্ণিয়া তারই অংশবিশেষ। ভাঙড়ে পাওয়ার গ্রিড সাব স্টেশন তৈরি হলে স্থানীয় মানুষের সুবিধের কোনও প্রশ্ন নেই। এটি বিদ্যুৎ বণ্টন কেন্দ্র নয়।

আর, ভুল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাই যদি আন্দোলনের কারণ হয়, তা হলে ঠিক বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিয়ে গ্রিড কর্পোরেশন বা প্রশাসন বা শাসক দল, কেউ এক বারও গ্রামবাসীদের কাছে যায়নি কেন? এই রাজ্যে পঞ্চায়েত থেকে নবান্ন, সবটাই কার্যত একটি দলের অধীন। সাব স্টেশনের যৌক্তিকতা বুঝিয়ে বলতে অসুবিধে কোথায় ছিল? অথচ, কোথা থেকে কোথায় সংবহন লাইন যাবে, কী কারণে এই অঞ্চলকে বাছা হয়েছে, এই কেন্দ্রের উদ্দেশ্য কী, সব যে গ্রামবাসীদের বুঝিয়ে বলতে হবে— এই নীতি পাওয়ার গ্রিড কর্পোরেশন নিজেই তৈরি করেছে!

আমাকে এক গ্রামবাসী বলেছিলেন, ‘থানায় যাই। বিডিও, এসডিও, ডিএম সবার অফিসে যাই। কলকাতায় গেলাম রাজ্যপালের কাছে। তিনি তো সকলের চেয়ে বড়। কেউ আমাদের কথাটাই শোনে না কেন? আমাদের অপরাধটা ঠিক কী?’ কাগজে শাসক দলের স্থানীয় নেতার হুংকার পড়লাম, ‘পার্টি নির্দেশ দিলে দু’দিনে আন্দোলন ঠান্ডা করে দেব।’ শাসক আর শাসিতের মধ্যে গণতান্ত্রিক সম্পর্ক থাকলে কি এই অবস্থা দাঁড়ায়?

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement