মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন— দু’জন যেন কুম্ভমেলায় হারিয়ে যাওয়া যমজ ভাই। তবে কেবল কি চেহারাতেই তাঁরা এক রকম? এত গভীর অর্থে ওঁরা ‘যমজ’ যে ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়। এই নাড়ির মিলটা আমাদের বর্তমান পৃথিবীর জন্য যে কত বড় দুঃসংবাদ! বড় বড় তত্ত্ব বা তথ্যে যাওয়ার দরকার নেই। গল্পেই বুঝে নেওয়া যায় তাঁরা কী ভাবেন, কী করেন, কোথায় পৌঁছতে চান।

এই যেমন, গত মাসের শেষে লন্ডনে যখন বরিস জনসন হঠাৎ করে পার্লামেন্ট অধিবেশনের পালা পাঁচ সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দিতে চেয়ে ইংল্যান্ডের রানিকে চিঠি লিখলেন, আর ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা বললেন যে তা সম্পূর্ণত বেআইনি, প্রথাবিরুদ্ধ— তখন জনসন কী ভাবে তার মোকাবিলা করলেন, সেটাই দেখা যাক। যথেষ্ট কড়া ভাষায় রায় দিলেন বিচারপতিরা। বললেন, সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে মনে রাখতে হবে ‘সরকার’ বস্তুটির অস্তিত্ব আছে এই জন্যই যে তার পিছনে হাউস অব কমনস-এর, অর্থাৎ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের, সম্মতি আছে। তা না থাকলে কিন্তু সরকারের কোনও বৈধতাই থাকতে পারে না। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী হাউস অব কমনস-এর কাজকর্মই নিজের মর্জি অনুযায়ী বন্ধ করে দিতে চাইছেন কি না, এটাই প্রকৃত বিচার্য। এবং সেই বিচারে স্পষ্ট যে, প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টকে চালাতে পারেন না, বরং উল্টোটাই হওয়ার কথা। যদি প্রধানমন্ত্রী অকারণে পার্লামেন্টের কাজে হস্তক্ষেপ করেন, তা হলে সুপ্রিম কোর্টকে কিন্তু বাধ্য হয়েই পদক্ষেপ করতে হবে— উপায় নেই।

অত্যন্ত কড়া কথা। প্রবল তাৎপর্যপূর্ণও বটে। এমন একটা রায় যখন বার হল, দেশের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তখন কোথায়? অতলান্তিক মহাসাগরের ও-পারে তিনি তখন তাঁর মার্কিন বন্ধুটির পাশে বসে। নিউ ইয়র্কে চলছে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার অধিবেশন। রিপোর্টারদের প্রশ্নের সামনে ডোনাল্ড ট্রাম্প রীতিমতো অর্থপূর্ণ ভাবে বরিস জনসনের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলেন। জনসন অবশ্য সে দিন সুপ্রিম কোর্ট বিষয়ে ভদ্র ভাবেই দু’একটা বাক্য বললেন। কিন্তু আশ্চর্য, পর দিন জনসন লন্ডনে ফিরে এলেন যখন, হাউস অব কমনস-এ দাঁড়িয়ে গলা তুলে কাটাকাটা ভাষায় তাঁকে যা বলতে শোনা গেল, তাকে কোনও ভাবেই ভদ্রতাসম্মত বলা চলে না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বৈধ অধিকারের সীমার মধ্যে সে সব কথা পড়ে কি না, তাও বলা মুশকিল। তিনি বললেন, সুপ্রিম কোর্ট যা বলছে, তা একদম ভুল, 'wrong'— কারণ এটা ছিল একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বিচারবিভাগের এখানে নাক গলানোর কোনও জায়গাই নেই। সঙ্গে সঙ্গে নিজের সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বী এবং সমালোচকদের দিকে অভিযোগ ছুড়ে দিলেন তিনি যে, তাঁরা যা করছেন, জনগণকে যা বোঝাচ্ছেন, সে সবই হল ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে নিজেদের দেশকে ‘সারেন্ডার’ করানোর চেষ্টা। অন্য এমপি’রা এমন মিথ্যা ভিত্তিহীন অভিযোগ শুনে অধৈর্য হয়ে পড়লে জনসন সোজাসুজি অপমান করতে আরম্ভ করলেন। বললেন, ওঁরা সবাই আসলে একটা কল্পনাজগতে (ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ড-এ) আছেন, দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। প্রতিপক্ষ এমপি’রা (যাঁদের মধ্যে অনেকেই মহিলা) স্বভাবতই ক্ষিপ্ত। এমন ভিত্তিহীন শব্দ— ‘সারেন্ডার’, ‘বিট্রেয়াল’, ‘ট্রেচারি’— এই সব ব্যবহার না করাই ভাল: প্রধানমন্ত্রীকে তাঁরা মনে করিয়ে দিলেন। পাত্তাই দিলেন না জনসন। প্রতিপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে অনবরত বলে চললেন, সারেন্ডার! সারেন্ডার! সারেন্ডার! আর সহ্য করতে পারলেন না পলা শেরিফ নামে এক লেবার এমপি। উঠে দাঁড়ালেন তিনি, রাগে উত্তেজনায় হতাশায় তাঁর সর্বাঙ্গ কাঁপছে, বললেন, প্রধানমন্ত্রী যে ভাবে যে ভাষায় কথা বলছেন, তাতে প্রধানমন্ত্রীর এখনই মাথা লজ্জায় নিচু হয়ে যাওয়া উচিত! শুনে জনসন হাসতে হাসতে বললেন, ‘আই হ্যাভ টু সে, মিস্টার স্পিকার, জীবনে এত বড় হামবাগ আমি দেখিনি!’ গোটা হাউস অব কমনস তখন ফেটে পড়ছে নিন্দাধ্বনিতে। দুই সপ্তাহ পুরল সবে এই সব দৃশ্য ঘটে গিয়েছে সেই ব্রিটেনে, যেখানে জন্ম নিয়েছিল সাংবিধানিক গণতন্ত্র, জন্ম হয়েছিল প্রথম পার্লামেন্টের।    

আমেরিকার পত্রপত্রিকাতেই পড়া যাচ্ছে একটা অনুমান। আগের দিন নিউ ইয়র্কে জনসন মোটামুটি ভদ্র ছিলেন, পরের দিন লন্ডনে ছিলেন না। তার অর্থ কি, ট্রাম্পই জনসনকে এমন কিছু বলেছিলেন যাতে তাঁর মেজাজটা পাল্টে যায়, কিংবা সুপ্রিম কোর্টের প্রতি তাঁর বিরোধিতার অবস্থানটা শক্তপোক্ত হয়? খুবই সম্ভাব্য অনুমান। ট্রাম্প নিজে এখন ঠিক এই মেজাজেই আছেন, তাঁদের পারস্পরিক আলাপচারিতায় সেটা উঠে আসারই কথা। জনসনকে তিনি প্রধানমন্ত্রী বলেন না, বলেন ‘ফ্রেন্ড’। বলেন, ‘আই টেল ইউ, আই নো হিম ভেরি ওয়েল’। 

গত কয়েক মাস ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ভাবে একধারসে তাঁর দেশের সমস্ত শাসনবিভাগ আর বিচারবিভাগের নজরদারিকে প্রতিহত করে চলেছেন, তাতে তাঁর এই আত্মবিশ্বাস যে ‘বন্ধু’র মধ্যে প্রবাহিত হতেই পারে, বুঝতে অসুবিধে কই। কয়েক দিন আগে, সরকারের জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট কোর্টকে জানাল যে ডেমোক্র্যাট সেনেটর এলিজ়াবেথ ওয়ারেন-এর আনা চাকরির নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রস্তাবকে সরাসরি খারিজ করে দিতে হবে (কেননা সেগুলি জনপ্রিয় হওয়ার ঘোর সম্ভাবনা)। হলও বটে। স্পষ্টতই শাসনবিভাগ আর বিচারবিভাগের সীমারেখা লঙ্ঘন করল এই পদক্ষেপ, প্রেসিডেন্টের নির্দেশে— তাতে কী-ই বা এসে গেল। 

কেবল সিস্টেমকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেপে দেওয়া নয়, সরাসরি নিজের ক্ষমতা জারি রাখতেও সিস্টেম পিষে ফেলার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে চলেছেন ট্রাম্প। গত বারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় তাঁর সঙ্গে রাশিয়ার গোপন আঁতাঁত বিষয়ক যে ‘মুয়েলার রিপোর্ট’ ইতিমধ্যে সামনে এসেছিল, তা বড় মাপের সমর্থন পেলেও ট্রাম্পের অতি বিশ্বস্ত অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার বারংবার ভুল তথ্য দিয়ে, প্রকাশ্যত ভিত্তিহীন দাবি দিয়ে তাকে দিব্যি বিপদরেখার ওপারে পাঠিয়ে দিতে পেরেছিলেন। অবশ্য প্রশ্ন উঠবে, বিরোধীরা অর্থাৎ কংগ্রেস-এর ডেমোক্র্যাটরা কী করছিলেন তখন? তাঁরাও খেল দেখাচ্ছিলেন— কখন কী ভাবে প্রেসিডেন্টের ইমপিচমেন্ট হওয়া উচিত, তার কঠিন-জটিল খুঁটিনাটি তর্কে তাঁরা এতই মত্ত হয়ে গিয়েছিলেন যে প্রেসিডেন্টের পক্ষে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়া হয়েছিল জলের মতো সহজ। 

তার পর এল ইউক্রেন-কাণ্ড। অন্যতম বড় ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী নেতা জো বাইডেন ও তাঁর ছেলে হান্টার বাইডেনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনে একটি তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প— আর তাতেই ঢাকা পড়তে শুরু করল তাঁর নিজের জাতীয় স্বার্থবিরোধী নানা কুকীর্তি-কুমতলব। আবারও উঠে-আসা ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবকে এই ঢাল দিয়েই ঠেকিয়ে গেলেন তিনি। মনে রাখতে হবে, নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজ়েন্টেটিভস-এ যা-ই হোক না কেন, উচ্চকক্ষ সেনেট-এ কিন্তু ট্রাম্পের পার্টিই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তা ছাড়া, বাইডেন পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ যদি সমর্থিত না-ও হয়, যে ব্যবসায়িক চুক্তিটি তাঁরা করেছেন সেটা অন্য অনেক চুক্তিরই মতো সঙ্কীর্ণ স্বার্থদুর্গন্ধময়। ফলে অনেকেই হয়তো আবারও বুঝবেন না যে, বাজে ব্যবসায়িক চুক্তি যতই অন্যায় হোক, তার আড়াল ব্যবহার করে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেন যে প্রেসিডেন্ট, তাঁর অন্যায় আরও অনেক ভয়াবহ। ট্রাম্প এ কথা জেনেই ঢালটি বেছে নিয়েছেন। এক হুইসল-ব্লোয়ারের সৌজন্যে ইতিমধ্যেই ফাঁস হয়ে গিয়েছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে ফোন করে ট্রাম্প ‘ফেভর’ চেয়েছেন, ব্ল্যাকমেল করেছেন— বাইডেন-এর নামে নেতিবাচক তথ্য জোগাড় করে দিলে তবেই তাদের অর্থসাহায্য দেওয়া হবে (যা আসলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা নয়, দেশের কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত)। অর্থাৎ, রাশিয়া ও ইউক্রেন একই গল্পের দু’টি পর্ব। বিদেশি শক্তির সাহায্য নিয়ে— দেশের নয়— ট্রাম্প নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করছেন। এতটা আমেরিকা কখনও দেখেনি। যে দেশের সংবিধানপ্রণেতারা প্রেসিডেন্ট পদটির চার পাশে হাজারো সীমানা দিয়ে ঘিরে রেখেছিলেন ক্ষমতার অপপ্রয়োগের ভয়ে, সেই দেশে আজ একনায়ক প্রেসিডেন্টের উত্থান শুধু সময়ের অপেক্ষা। 

না, দুই হুজুরের তাণ্ডব ভাবলে ভুল হবে। এই সবই গণতন্ত্রের গল্প। আজকের গণতন্ত্রের।