টুইটার নামক গণমাধ্যমটি ইদানীং রাজনীতির ক্ষেত্রে এমন অস্ত্র হইয়া উঠিয়াছে, যে তাহাকে শাস্ত্র বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। উহাকে কে কত দূর অস্ত্র রূপে ব্যবহার করিতে সক্ষম, তাহার উপর নেতার ভবিষ্যৎ বহুলাংশে নির্ভর করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাহার শরিক, অন্যতম পথিকৃৎ বলিলেও ভ্রম হয় না, তবে স্বকীয় ভঙ্গিতে। প্রায় তিন বৎসর পূর্বে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হইবার দিন হইতে আজ অবধি প্রায় ১১ হাজার টুইট করিয়াছেন তিনি। শুনা যায়, সংখ্যাধিক্যে বিব্রত প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা নাকি দুইটি টুইটের ভিতরে ১৫ মিনিটের বিরতি বাধ্যতামূলক করিবার কথা ভাবিয়াছিলেন। কেবল সংখ্যার প্লাবনে নহে, বিষয় বাছিতেও ট্রাম্পের নির্লজ্জতা ও স্পর্ধার জুড়ি নাই। মোট টুইটের পঞ্চাশ শতাংশেই উপস্থিত অ্যামাজ়ন-কর্তা জেফ বেজ়োস এবং রুশ তদন্তের প্রসঙ্গ। দুই হাজারের অধিক টুইটে সগর্বে নিজের পিঠ চাপড়াইয়াছেন তিনি। কার্যক্ষেত্রে শুভ হউক কিংবা অশুভ, রাজনীতিতে এই গণমাধ্যম যে অপরিহার্য হইয়া উঠিয়াছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টুইট-রাশির পর তাহা লইয়া আর সন্দেহ থাকে না।

নিজের রাজনীতিকে জনতার ভিতর পৌঁছাইয়া দিবার এবং জনতার স্বরকে নিজের দরবারে তুলিয়া ধরিবার জন্য নেতারা নানা পথে জনসংযোগ ঘটাইয়া থাকেন। পদযাত্রা, জনসভা, পোস্টার ইত্যাকার নানা মাধ্যম যুগে যুগে জনপ্রিয় হইয়াছে। ইন্টারনেটের জমানায় প্রবেশ করিয়া ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছে গণমাধ্যমও, যাহার একটি হইল টুইটার। সর্বাপেক্ষা গুরুতর সুবিধাটি হইল, মাধ্যমটির সময় এবং অঞ্চলের গণ্ডি নাই। একসঙ্গে সকল প্রান্তের নাগরিকদের নিকট পৌঁছানো সম্ভব। ট্রাম্প কিংবা অন্য রাষ্ট্রনেতারা তাহাই করেন। সমস্যার সৃষ্টি হয় নেতা অসাধু (এবং তাঁহার অনুগামীরা ততোধিক অসাধু) হইলে। ইদানীং মাঝে মধ্যেই জানা যায়, এই মাধ্যমটিকে ব্যবহার করিয়া ধুরন্ধর রাজনীতিকগণ ভুয়া খবর ছড়াইতেছেন। যেমন, ভারতে টুইট-রাজনীতির অন্যতম অগ্রপথিক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অনুগামীরা বহু সময় এই উপায়ে হিংসা ছড়াইতেও দ্বিধা করেন না। সমরূপে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমটিকে অসাধু উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিবার অভিযোগ উঠিয়াছে।

রাশিবিজ্ঞানের তথ্য বিশ্লেষণ করিয়া একটি মার্কিন দৈনিক দেখাইয়াছে, ট্রাম্প অবাঞ্ছিত বহু বিষয় টুইট করিয়া থাকেন। যেমন, যাচাই না করা ১৪৫টি অ্যাকাউন্টের টুইট রিটুইট করিয়াছেন তিনি। সেই সব অ্যাকাউন্টের সহিত বিদ্বেষমূলক বা ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপের যোগসাজশের অভিযোগ আছে। তবে অস্বীকার করিলে চলিবে না, অস্ত্রকে কার্যকর অর্থেও ব্যবহার করা সম্ভব, এবং জনমানসে ট্রাম্পের বিরোধী আখ্যানটিও সেই পথে ছড়াইয়া দেওয়া যাইতে পারে। সতীদাহ প্রথা রদ করিতে বা বিধবাবিবাহ প্রচলন করিবার জন্য শাস্ত্রের শরণাপন্ন হইয়াছিলেন রামমোহন রায় কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। শাস্ত্রের দোহাই পাড়িয়া সমাজে যে কুপ্রথাগুলি চালু ছিল, সেইগুলিকে পুঁথির বিধান দিয়াই বধ করিয়াছিলেন এই শাস্ত্রীয় পণ্ডিতেরা। টুইটার-অস্ত্রকে যদি যথাযথ ভাবে শান দিয়া প্রয়োজন মতো ব্যবহার করা যায়, তাহা হইলে এই ভুয়া সংবাদ এবং অনৈতিক কার্যকলাপের বন্যাও এক দিন ঠেকানো সম্ভব হইবে।