Advertisement
E-Paper

বোধ ও রসবোধ

হার্দিক পটেল ব্যতিক্রমী নহেন। বর্তমান ভারতে অ-শরীরী আক্রমণের সর্বাপেক্ষা বড় হাতিয়ার এই বিদ্রুপ। আশ্চর্য হইতে হয়। যে দেশ হইতে প্রকৃত রসবোধ ডেরাডান্ডা গুটাইয়া বিদায় লইয়াছে, যেখানে পান হইতে সুপারি খসিবার পূর্বেই ভাবাবেগ আহত হইয়া পড়ে, সেই দেশে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিদ্রুপের কী আশ্চর্য রমরমা

শেষ আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০০:০০
অনশনরত হার্দিক পটেল। ছবি এএফপি।

অনশনরত হার্দিক পটেল। ছবি এএফপি।

অনশনে থাকিয়া কী ভাবে ওজন বাড়ে? হার্দিক পটেলের ওজন হ্রাস ও ওজন বৃদ্ধির সংবাদ ক্রমানুসারে পাইবার পরই সহনাগরিকদের কৌতূহল মাথাচাড়া দিল। যে সংবাদপত্রে ওজনবৃদ্ধির সংবাদটি প্রকাশিত হইয়াছে, তাহারই পাতা উল্টাইলে চোখে পড়িত, পূর্বের হিসাবটি ভুল ছিল। ওজনযন্ত্রের ভুল। অনশনরত হার্দিকের ওজন বাড়ে নাই, বরং উদ্বেগজনক হারে কমিয়াছে। কিন্তু, সেই অনুসন্ধানে সহনাগরিকদের আগ্রহ ছিল না। তাঁহারা রসিকতার বান বহাইয়া দিয়াছেন— অধুনা যাহার নাম ‘ট্রোলিং’। বিচিত্র সব ‘মিম’ তৈরি হইয়াছে। হার্দিক পটেল ব্যতিক্রমী নহেন। বর্তমান ভারতে অ-শরীরী আক্রমণের সর্বাপেক্ষা বড় হাতিয়ার এই বিদ্রুপ। আশ্চর্য হইতে হয়। যে দেশ হইতে প্রকৃত রসবোধ ডেরাডান্ডা গুটাইয়া বিদায় লইয়াছে, যেখানে পান হইতে সুপারি খসিবার পূর্বেই ভাবাবেগ আহত হইয়া পড়ে, সেই দেশে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিদ্রুপের কী আশ্চর্য রমরমা। প্রকৃত প্রস্তাবে, এই বিদ্রুপের সহিত রসবোধের যোগ যতখানি, তাহার ঢের বেশি যোগ রাজনৈতিক শত্রুতার সহিত। এবং, বর্তমান সময়ের গায়ে যতগুলি ঘা দগদগ করিতেছে, তাহার অধিকাংশের পিছনেই যে রাজনীতির অনপনেয় প্রভাব রহিয়াছে, হাস্যরসকেও চূড়ান্ততম ব্যক্তি-আক্রমণের অস্ত্র বানাইয়া তুলিবার পিছনেও সেই রাজনীতিরই ছাপ। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিদ্রুপের, পরিহাসের পাত্র বানাইয়া তুলিবার জন্য রুচিবোধের অভাব থাকা জরুরি। সেই অভাবটুকু থাকিলে, ইহার অধিক সহজ অস্ত্র আর নাই। যুক্তির প্রয়োজন নাই, চর্চা বা শিক্ষার দরকার নাই, এমনকি ভাবিবারও প্রয়োজন নাই। রাজনীতির সার্কাসে জোকার খুঁজিয়া লইলেই চলে। তাহার পর, হাসি। সে হাসি নির্মল নহে অবশ্যই।

সুকুমার রায় থাকিলে মুগ্ধ হইতেন। চাঁদের কলা, জোলার মাকু, জেলের দাঁড়, নৌকা, ফানুস, পিঁপড়ে, মানুষ, রেলের গাড়ি, তেলের ভাঁড় তো বটেই— মানুষ এখন অপরের মর্মান্তিক মৃত্যু লইয়াও হাসে। রসিকতার এমনই তোড় যে মাঝেরহাট ব্রিজ ভাঙা ইস্তক ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ হইতে চায়ের দোকানের আড্ডা, সবই ভাসিয়া যাইতেছে হরেক ‘জোকস’-এর প্রবল স্রোতে। আবার, দেড়শত বৎসরের ঐতিহাসিক অন্যায় বন্ধ করা সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও সেই রসিকতার তরঙ্গ। ৩৭৭ ধারা লইয়া অবশ্য রসিকতা করাই যায়। এই রায় যাঁহাদেরকে অবিচার হইতে ‘মুক্তি’ দিল, তাঁহারা তো ‘স্বাভাবিক’ মানুষ নহেন— যৌন সংখ্যালঘুমাত্র। আশৈশব যাঁহাদের খেপাইয়া, বিরক্ত করিয়া, কার্যত বাঁচিয়া থাকিবার পরিসরটুকু কাড়িয়া লইয়া প্রবল আমোদ পাইয়া থাকে সংখ্যাগুরুর দল। ‘মুক্তি’র বিনিময়ে এইটুকু আমোদ দিতে কি সংখ্যালঘুরা আপত্তি করিবেন? অথবা, মাঝেরহাট ব্রিজের দুর্ঘটনায় সন্তান হারানো অভিভাবক কি ভাবিবেন না, এই মারাত্মক শোক সহ্য করিতে হইলে একটু হাসিয়া লওয়া ভাল?

হাসিতে জানা সমাজের পক্ষে উপকারী। তবে, সেই সমাজের পক্ষে, যে নিজেকে লইয়া হাসিতে জানে। ‘অপর’-কে লইয়া রসিকতার মধ্যে হাস্যরস নাই, হিংস্রতা আছে। ভারতের সমাজ প্রতি মুহূর্তে সেই হিংস্রতার সাক্ষী হইতেছে। যে সমাজের ক্রোধ, দুঃখ, প্রেম, উদ্বেগ, সব অনুভূতিই শেষ অবধি বিদ্রুপের আকার লইয়া প্রকাশিত হয়, সেই সমাজের সমস্যা অতি গভীরে। লঘুতা আসিয়া তাহার সব বোধ, সব অনুভূতি লইয়া গিয়াছে। রাখিয়া গিয়াছে শুধু সস্তা ব্যঙ্গ। তাহাতে ব্যঙ্গেরও উপকার হয় নাই— সমাজদর্শনের আয়ুধ হিসাবে তাহার ধার গিয়াছে। সেই ক্ষতি তবু সহনীয়। আসল ক্ষতি অন্যত্র। ভারতীয় সমাজ বুঝাইয়া দিতেছে, তাহার পচন অতি গভীরে। বোধ না থাকিলে রসবোধ থাকিতেই পারে না— এইটুকুও বুঝিবার সামর্থ্য সমাজের আর নাই।

Social Media Trolling Meme Hardik Patel Hunger Strike
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy