অর্থনীতি বেশ সঙ্কটে, তাতে সন্দেহের বিশেষ অবকাশ নেই। নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান রাজীব কুমার বর্তমান অর্থনৈতিক শ্লথতাকে বর্ণনা করেছেন এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি হিসেবে, গত ৭০ বছরে দেশ যার সম্মুখীন হয়নি। ও দিকে আশ্বিনের মাঝামাঝি এল বলে। আর বাঙালি-জীবন পুজোকে ঘিরে বাঁচে-মরে। ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি ঠিক কতটা প্রভাবিত করতে পারে বাঙালির শারদ-উৎসবকে?

আনন্দমঠে ভবানন্দের গানের মধ্যে ছিল, “ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী”। আসলে মা যাহা হইবেন, তা-ই তো দুর্গার রূপ। সে কালে বিবেকানন্দ, অরবিন্দ, বিপিনচন্দ্র সামাজিক এবং দেশাত্মবোধের প্রেক্ষিতে নতুন রূপ দিলেন দুর্গার। অবন ঠাকুর আঁকলেন ‘ভারতমাতা’-র ছবি। আর বাঙালি মননে দুর্গা সম্পৃক্ত হয়েছেন প্রতিটা সুখ-দুঃখের ছন্দে আর তালে। ভয়াবহ মন্দা আর টালমাটাল অবস্থাতেও দুর্গাপুজো থেকে যায় বঙ্গজীবনের অঙ্গ হয়ে।

কেবলমাত্র বাড়ির পুজো, এই তকমা থেকে সরে এসে দুর্গাপুজোর সর্বজনীন পুজোয় উত্তরণের ইতিবৃত্ত মোটামুটি প্রায় একশো বছরের পুরনো। গত শতকের বিশের দশকের গোড়ার দিকে এই বিবর্তনের শুরু। কিন্তু তার পূর্ণতা বোধ করি ১৯৩৯-৪৭ এই অশান্ত সময়সীমায়। বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের এক রিপোর্টে দেখছি, এ সময়ে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, মন্বন্তর, এবং বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষিতে যৌথ পরিবারগুলি ভেঙে যাওয়ার মধ্য দিয়েই কমে আসে বাড়ির পুজোর সংখ্যা, আর ম্লান হয় তার জৌলুস। সামাজিক, ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক রূপরেখার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে সর্বজনীন পুজো এ সময়ে পায় পূর্ণতা।

ভয়াবহ মন্বন্তরের প্রেক্ষিতে ১৯৪৩-এর শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, “যিনি অন্নপূর্ণা, কুবের যাঁহার ভাণ্ডারী, তিনি কাঙ্গালিনীর বেশে ভিক্ষাপাত্র করে লইয়া তোমার দ্বারে আসিয়া দাঁড়াইয়াছেন।” মধ্যবিত্ত বাঙালির ক্রয়ক্ষমতায় চিড় ধরে, জামাকাপড় আর খাদ্যদ্রব্যের দাম হয় আকাশছোঁয়া। এমনকি ধাক্কা লাগে বাঙালির বেড়াতে যাওয়ার চিরন্তন অভ্যাসেও। দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রামের তীব্রতা পুজোর জাঁকজমককে খানিকটা ম্লান করলেও, উৎসারিত হয় মাতৃবন্দনার এক নতুন স্টাইল। সর্বজনীন পুজো হিসেবে দুর্গাপুজোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির সঙ্গে এক নতুন উদ্দীপনা আর সামাজিক বন্ধন সংজ্ঞায়িত হয় এ সময়ে। বদলে যাওয়া সেই উৎসবের আদলটা ভেঙেচুরে দেয় সামাজিক স্থবিরতাকেও। নিম্নবর্গীয় হিন্দুরাও শুরু করেন সর্বজনীন পুজোর আয়োজন। আবার অভিজাত পরিবারের মহিলারা সর্বজনীন পুজোর উৎসবের শরিক হতে বার হন দলে দলে।

দর্শক টানতে বিভিন্ন পুজোর উদ্যোক্তাদের মধ্যে রেষারেষিও একটা সুস্পষ্ট রূপ পায় এ সময়ে। তার প্রভাব পড়ে প্রতিমা তৈরি, প্যান্ডেল, সাজসজ্জা ইত্যাদিতে বিভিন্ন অভিনবত্ব আমদানির মধ্য দিয়ে। তিন রাত্রি ধরে সিনেমা, নাটক, জলসার আয়োজনও জনগণকে আকর্ষণ করার উপায় হিসেবেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে চল্লিশের দশকে। পায় একটা সার্বিক চরিত্র। দুর্গাপুজো নিয়ে আজকের বাঁধনছাড়া পাগলামিকে তাই ‘নতুন’ বলার উপায় নেই।

১৯৪৭-এর স্বাধীনতা আর দেশভাগের পর পুজো আরও বদলে যায়। সামাজিক পরিস্থিতির কারণেই। ১৯৫৪ সালে ‘ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি’-তে একটা প্রবন্ধ ছাপা হয় দুর্গাপুজোর অর্থনীতি নিয়ে। সেও এক টালমাটাল সময়কাল। উত্তরবঙ্গে বন্যা, আর দক্ষিণবঙ্গে খরা সে বছর। কর্মীরা সেপ্টেম্বরের মাইনে পাননি। প্রতিবাদ, স্লোগান। পুজোর বোনাসের জন্য রাস্তায় চলছে আন্দোলন। সে প্রেক্ষিতেই জামাকাপড়, জুতো, উপহার সামগ্রী ইত্যাদির বিক্রি এবং ছাড়, এমনকি পুজোসংখ্যা বিক্রিকেই ধরা হয়েছে অর্থনীতির সূচক, জনগণের অর্থনৈতিক ক্ষমতার নির্দেশক, আর ব্যবসায়ের ব্যারোমিটার। তাই পুজো যে ইতিমধ্যেই বঙ্গজীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে, সে বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই। এবং তা এতটাই যে, পরবর্তী কালে সাড়ে তিন দশকের বাম-শাসনেও তাতে চিড় ধরেনি এতটুকু। বরং পুজোর জৌলুস বেড়েছে উত্তরোত্তর।

পুজো তাই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে বিবর্তনের পথ ধরে নব নব রূপে বিকশিত হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ঝড়-ঝঞ্ঝাকে সামাল দিয়েছে অক্লেশে। এ পথে তার রূপরেখা বদলেছে নিশ্চয়ই। আজকের থিম পুজো, তাকে ঘিরে প্রতিযোগিতা, উন্মাদনা সবই আমাদের সমাজ-জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুর্গাপুজোর উৎসবকে ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি কী ভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠছে, তা নিয়ে ২০১৩ সালে অ্যাসোসিয়েটেড চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অব ইন্ডিয়া বা ‘অ্যাসোচ্যাম’ একটা রিপোর্ট বার করেছিল। তাতে পশ্চিমবঙ্গের পুজোর অর্থনীতির বহরটাকে হিসেব করা হয়েছিল ২৫ হাজার কোটি টাকা। মনে রাখতে হবে, সে কিন্তু বিশ্বজুড়ে এক সার্বিক মন্দার বা তার ঠিক পরের সময়কাল। যার আঁচ থেকে বাঁচতে পারেনি ভারতের অর্থনীতিও। তাই সার্বিক ভাবে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কমেছিল নিশ্চয়ই। অবশ্য ইতিমধ্যেই জনগণের চাঁদায় পুজোর দিন ফুরিয়েছে। আজকের পুজোর ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি খরচ আসে বিজ্ঞাপনদাতাদের ঘর থেকে। অ্যাসোচ্যামের রিপোর্টে বলা হয়েছিল, দুর্গাপুজোর অর্থনীতির বার্ষিক বৃদ্ধির হার নাকি ৩৫ শতাংশ। বিস্ময়কর বৃদ্ধির হার। গত ছ’বছরে যদি তা অপরিবর্তিত থেকে থাকে, তবে এই হিসেবে দুর্গাপুজোর অর্থনীতিটা ২০১৯-এ প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা, যা পশ্চিমবঙ্গের জিডিপি-র ১০ শতাংশেরও বেশি। প্যান্ডেল, প্রতিমা, আলো, সাজসজ্জাতেই খরচ হাজার হাজার কোটি। আর রয়েছে কেনাকাটা, খাবার-দাবার, বেড়ানো, কী নয়!

অবশ্য পুজো আমাদের জীবনযাত্রার প্রতি স্তরে এমন ভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছে যে, তার অর্থনীতির বহর কিংবা বৃদ্ধির হার হিসেব করা বেশ কঠিন। পুজো ইতিমধ্যে চার-পাঁচ দিনের উৎসব থেকে পুরোদস্তুর ১০-১২ দিনের জাঁকজমকে পরিণত হয়েছে। আমরা জানুয়ারিতেও পুজোর বাজার করি। মাঝে মাঝেই হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ পাই, ‘পুজোর আর ৩০০ দিন বাকি’! তাই পুজোর অর্থনীতির যথাযথ হিসেব কে করবে?

পৃথিবীর আর কোথাও বিচ্ছিন্ন ভাবে কোনও একটা উৎসব কোনও দেশ, রাজ্য, কিংবা জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক জীবন-স্পন্দনকে এতটা গভীর ভাবে প্রভাবিত করতে পারেনি। এমনকি রিয়ো ডি জেনেইরো-র অর্থনীতিতে ‘রিয়োকার্নিভাল’-এর মতো জগদ্বিখ্যাত চাকচিক্যের অবদানও ২ শতাংশের কম। প্রতি বসন্তে চেরি ফোটার উৎসব ‘হানামি’ জাপানকে জুগিয়ে চলেছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। প্রধানত টুরিজ়ম থেকে। তবু তার পরিমাণটা জাপানের জিডিপি-র সোয়া দুই শতাংশের আশেপাশে। মিউনিখের জিডিপি-তে তাদের বিশ্ববিখ্যাত ‘অক্টোবরফেস্ট’-এর অবদান মোটামুটি ১.৩৫ শতাংশের মতো। আর নিউ অরলিয়েন্স-এর ‘মারডি গ্রাস’ উৎসব সে শহরের জিডিপি-তে জোগান দেয় দেড় শতাংশের মতো। তাই শুধুমাত্র সামাজিক ব্যাপ্তিই নয়, পশ্চিমবঙ্গের পুজোর অর্থনীতিটাও রাজ্যের কাছে অবিশ্বাস্য রকমের বেশি। বাংলার পুজোর তুলনা চলতে পারে পশ্চিমি দেশের ক্রিসমাস বা চাইনিজ় নিউ ইয়ারের সঙ্গে।

কিন্তু এ বছর তো অর্থনীতিতে ঝিমুনি। তার ফল পড়বেই পুজোর আয়োজনে, কেনাকাটায়। কোনও না কোনও ভাবে। দোকানে বাজারে পুজোর ভিড় কমতেই পারে। অবশ্য কতটা, বলা কঠিন। লোকজনের কেনাকাটার স্টাইলেও যে বদল ঘটে চলেছে দুর্বার গতিতে। কয়েক বছর ধরেই অনলাইন কেনাকাটায় বিপ্লব এসেছে। যেমন, গত বছরই উৎসব সেলের প্রথম আড়াই দিনে অ্যামাজ়ন, ফ্লিপকার্ট, স্ন্যাপডিলের মতো ই-কমার্স কোম্পানি বিক্রি করেছে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর অর্ধেকের বেশি আবার বিকিয়েছে স্মার্টফোনের ব্যবসায়। তাই অর্থনীতি বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে ক্রেতার ক্ষমতা ও আকাঙ্ক্ষা। বদলাচ্ছে তার প্রকাশভঙ্গি।

সেই সঙ্গে অর্থনীতির টানাপড়েনের সময়কালে পুজো বদলে ফেলে তার চরিত্র, এক বৃহত্তর অভিযোজনের উদ্দেশ্যে। ২০১৩-তে অ্যাসোচ্যামের আঞ্চলিক অধিকর্তা যেমন বলেছিলেন, অর্থনৈতিক মন্দা পুজোর চেতনা আর উদ্দীপনাকে কমিয়ে দেয়নি। আমি নিশ্চিত, পুজো এতটাই ওতপ্রোত জড়িয়ে আছে বাঙালি জীবনকে যে, অর্থনীতিতে মন্দা আসুক বা ঝিমুনি, আজ হোক বা আগামী দিন, বাঙালির পুজোর উদ্দীপনা আর ঐশ্বর্য থাকবে অনির্বাণ। প্রয়োজনে পুজোর রূপরেখাকে আর গতিপথকে বদলে নিয়েও।

 

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট, কলকাতা। মতামত ব্যক্তিগত