E-Paper

রাষ্ট্রের হিংসাকে চেনার উপায়

উমেন বুঝেছিলেন যে, এক ধরনের রাজনৈতিক হিংসা সব সময় নিজেকে ‘অনিবার্য প্রয়োজন’ বলে উপস্থাপন করে— জাতীয় নিরাপত্তার নামে, সংস্কৃতি রক্ষার নামে। জনগণের উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে।

হিমাদ্রি শেখর মিস্ত্রি

শেষ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ ০৬:০৮

২৬ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত হলেন সমাজতত্ত্ববিদ অধ্যাপক তরাইলাত কোশি (টি কে) উমেন (১৯৩৭–২০২৬)। জন্ম কেরলে; দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়েছিলেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়— সেখানে গড়ে তুলেছিলেন ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব সোশ্যাল সিস্টেমস’। নাগরিকত্ব, জাতিসত্তা, জাতীয়তাবাদ, সামাজিক আন্দোলন, এই বিষয়গুলি নিয়ে তাঁর গবেষণা তাঁকে জাতীয় পুরস্কার, সম্মানসূচক ডক্টরেট এনে দিয়েছিল। পেয়েছিলেন ইন্টারন্যাশনাল সোশিয়োলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতির পদ। এশিয়া থেকে একমাত্র তিনিই এই সম্মান পেয়েছেন। যে সময়ে ভারত-সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী জাতীয়তাবাদের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ছে, সে সময়ে টি কে উমেনের তাত্ত্বিক গুরুত্ব বিপুল।

উমেন বুঝেছিলেন যে, এক ধরনের রাজনৈতিক হিংসা সব সময় নিজেকে ‘অনিবার্য প্রয়োজন’ বলে উপস্থাপন করে— জাতীয় নিরাপত্তার নামে, সংস্কৃতি রক্ষার নামে। জনগণের উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। এই হিংসা কখনও আদালতের নির্দেশের আবরণ নিয়ে আসে, প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে কার্যকর হয়। রাষ্ট্র (স্টেট), জাতি (নেশন) আর জাতীয়তা (ন্যাশনালিটি)-র ধারণাকে এক করে দেখানোর চেষ্টা করে ফ্যাসিবাদী রাজনীতি। সমাজতত্ত্বের কাজ হল এগুলিকে পৃথক করে দেখা। তখনই উন্মোচিত হয় জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র-প্রকল্পের ভিতরকার হিংসার চেহারা।

১৯৯৭-এ প্রকাশিত তাঁর সিটিজ়েনশিপ, ন্যাশনালিটি অ্যান্ড এথনিসিটি বইয়ে দেখান যে, রাষ্ট্র ও জাতিকে এক করে দেখাটা একটি মতাদর্শগত প্রকল্প। কারণ, এই দর্শন দাবি করে যে, জাতি মানে একটিমাত্র জনগোষ্ঠী। ফলে যে সব জনগোষ্ঠীর মানুষকে সেই জাতির ছাঁচে ফেলা যায় না, তারা হয়ে পড়ে ‘অপর’, ‘অবৈধ’, ‘সংখ্যালঘু’। এক বার যখন রাষ্ট্র কোনও একক জনগোষ্ঠীর অভিভাবক হয়ে ওঠে, তখন দেশের সীমানার মধ্যে থাকা বাকি সকলকেই সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়।

এই তত্ত্ব আজকের ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবকে বুঝতে সরাসরি কাজে আসে। অসমের বাংলাভাষী মুসলমান বা ‘মিঁয়া’ সম্প্রদায় সম্পর্কে সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলি সেই একই রাজনৈতিক নকশার ফল। যেখানে রাষ্ট্র আইনি নাগরিকত্বকে সাংস্কৃতিক আনুগত্যের শর্তে বাঁধতে চায়, সেখানে একটি সম্প্রদায়কে রক্ষার ছলে অন্য একটি সম্প্রদায়কে ‘অপর’ করে তোলাই ‘কর্তব্য’ বলে মনে করে। উমেনের সমাজবিজ্ঞান রাষ্ট্রের এই বিচারধারার ভয়াবহতাকে উন্মোচন করে।

‘স্বদেশভূমি’ সম্পর্কে ধারণার রাজনৈতিক অপব্যবহার নিয়েও সাবধান করে গিয়েছেন উমেন। তাঁর কাছে ‘স্বদেশভূমি’ ছিল সমষ্টিগত স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কেন্দ্রভূমি। সমাজবিজ্ঞান কখনও ভূমির সঙ্গে মানুষের এই গভীর সম্পর্ককে অস্বীকার করতে পারে না। বিপদটা তখনই শুরু হয় যখন রাষ্ট্র ঘোষণা করে যে, এই ভূমি শুধু একটি জনগোষ্ঠীর, বাকিদের হাতে উচ্ছেদের নোটিস ধরিয়ে দেয়। আজ ‘অনুপ্রবেশকারী’ বাছাইয়ের তাণ্ডব ফের মনে করিয়ে দেয় যে, উচ্ছেদের নোটিস থেকে বন্দিশিবির, বিতাড়ন এবং হত্যা— এই দূরত্ব যতটা মনে হয় ততটা নয়।

‘অপর’ করে তোলার প্রক্রিয়া এবং নাগরিকত্বের ক্রম-অবনতির বিশ্লেষণেও উমেনের দূরদৃষ্টি ছিল তীক্ষ্ণ। তিনি দেখিয়েছিলেন যে, এই অবনমন ঘটে ধাপে ধাপে— প্রথমে আইনি, তার পর নাগরিক, তার পর সামাজিক, এবং শেষে শারীরিক। তিনি যাকে বলেছিলেন ‘নাগরিকত্বের উচ্চাবচতা’— যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক ভাবে কাউকে ‘পূর্ণ নাগরিক’ আর কাউকে ‘সন্দেহভাজন জনগোষ্ঠী’ চিহ্নিত করা হয়— তা নিজেই এক কাঠামোগত হিংসা।

সাম্প্রদায়িক হিংসা বিষয়ে উমেন বলেছিলেন, দাঙ্গা যতই ভয়াবহ হোক, সেটা শৃঙ্খলা ভেঙে যাওয়ার ফল। কিন্তু পরিকল্পিত গণহত্যা (পগ্রম) হল আইনের শাসন থেকে রাষ্ট্রের ইচ্ছাকৃত প্রত্যাহার। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে যে সব সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ডে রাষ্ট্র বার বার অভিযুক্ত হয়েছে, উমেনের মতে সেখানে রাষ্ট্রের নীরবতাই আসলে হিংসায় অংশগ্রহণ। “গণহত্যা আর দাঙ্গার মধ্যে পার্থক্য শুধু মাত্রার নয়— পার্থক্যটা হল রাষ্ট্র সেখানে উপস্থিত ছিল, না কি ইচ্ছাকৃত ভাবে অনুপস্থিত ছিল,” লিখেছেন উমেন।

নাগরিকত্ব আইন নিয়ে বিতর্ক, নাগরিকপঞ্জি নিয়ে উদ্বেগ, বা ‘জনসংখ্যার নকশায় পরিবর্তন’ নিয়ে রাজনৈতিক প্রচার— উমেনের তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখলে বিষয়গুলি স্পষ্টতর হয়। উমেনের সমাজবিজ্ঞান বলে, মনোযোগ দিয়ে দেখো, এখানে কিসের নির্মাণ হচ্ছে। দেখো কারা দুর্বল হয়ে পড়ছে, এবং প্রশ্ন করো— কেন?

যেখানে একাধিক পরিচয় সহাবস্থান করতে পারে, উমেন সেই বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতেন। তিনি বলেছেন, সমাজবিজ্ঞানের কাজ কেবল রাষ্ট্রের বিচ্যুতি বর্ণনা করা নয়, রাষ্ট্রকে তার মানদণ্ডের কাছে জবাবদিহি করানো। এই তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত উত্তরাধিকার।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sociologist

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy