E-Paper

ভারত কোন পথে হাঁটবে

বেজিংয়ে শীর্ষ বৈঠক শেষে ট্রাম্প-জিনপিং, উভয় পক্ষই আলোচনাকে ‘অত্যন্ত সফল’ বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু, বাস্তব সাফল্য তুলনায় সীমিত।

শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৯ মে ২০২৬ ০৯:৩১

বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এক দিকে রয়েছে আমেরিকা ও চিনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা; আর, অন্য দিকে ভারত ও রাশিয়ার মতো মধ্যম ও বৃহৎ শক্তিগুলি এমন এক দ্বিমেরু-প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বিশ্বে তাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পরিসর বজায় রাখার চেষ্টা করছে। আমেরিকা ও চিনের অর্থনীতি এখনও বাণিজ্য, প্রযুক্তি, আর্থিক প্রবাহ এবং বৈশ্বিক উৎপাদন শৃঙ্খলের মাধ্যমে গভীর ভাবে সংযুক্ত। ফলে ভূ-অর্থনীতি এক দিকে প্রতিযোগিতার উৎস, অন্য দিকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতের বিরুদ্ধে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণমূলক শক্তিও। অর্থাৎ, দুই রাষ্ট্র একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী এবং পরস্পর-নির্ভর।

বেজিংয়ে শীর্ষ বৈঠক শেষে ট্রাম্প-জিনপিং, উভয় পক্ষই আলোচনাকে ‘অত্যন্ত সফল’ বলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু, বাস্তব সাফল্য তুলনায় সীমিত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্ভাব্য বাণিজ্যিক লাভ এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার দিকটি তুলে ধরেছেন। অন্য দিকে, চিন জোর দিয়েছে স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত আত্মবিশ্বাসের উপরে। আলোচনায় এসেছে বহু বিষয়, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট সমঝোতা ঘোষিত হয়েছে। এই শীর্ষ বৈঠককে দুই মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের সম্পর্কে কোনও মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা হিসাবে না দেখে, বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা হিসাবে দেখাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

ট্রাম্প শি জিনপিংকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকার শীর্ষ কর্পোরেট নেতাদের বেজিংয়ে নিয়ে গিয়েছেন এবং অর্থনৈতিক চুক্তি ও উৎপাদন বৃদ্ধির প্রশ্নে জোর দিয়েছেন। অন্য দিকে, শি অনেক বেশি সংযত, এবং অনমনীয়, বিশেষত তাইওয়ান ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রশ্নে। এই বৈসাদৃশ্য কেবল ব্যক্তিত্বের নয়, বৃহত্তর রাজনৈতিক দর্শনেরও প্রতিফলন। ট্রাম্পের রাজনীতি মূলত দেশীয় অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের উপরে দাঁড়িয়ে। তাঁর কাছে উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ মুখ্য নয়, বরং আমেরিকার শিল্পশক্তি ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারই অগ্রাধিকার। বিপরীতে, চিন বৃহত্তর এক কৌশলগত প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী— আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ক্ষমতার কাঠামো এমন ভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে বেজিংকে একটি সমমর্যাদাসম্পন্ন, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রভাবশালী শক্তিকেন্দ্র হিসাবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

শিল্পহীনতা, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের পতন এবং বৈষম্য বৃদ্ধির ফলে আমেরিকার বহু অঞ্চলে আজ অর্থনৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থার পক্ষে জনসমর্থন বেড়েছে। ট্রাম্প সেই উদ্বেগকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করে চিনকে ‘অন্যায্য বিশ্বায়ন’-এর প্রধান সুবিধাভোগী হিসাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর নীতি হল ‘নির্বাচিত বাণিজ্যিক সংরক্ষণবাদ’— অর্থাৎ চিনা উৎপাদনের উপরে নির্ভরতা কমানো, কিন্তু এমন মাত্রায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা যাতে সামগ্রিক ব্যবস্থার ভাঙন না ঘটে। চিনও তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। আমেরিকা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেছে যে, প্রযুক্তি ও উৎপাদনের বহু ক্ষেত্রে তার একক কৌশলগত সুবিধা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। বিরল খনিজ সম্পদের প্রশ্নে চিন কিছু সীমিত শিথিলতা দেখালেও, অধিকাংশ বিতর্কিত ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটনকে আপস করতে হয়েছে।

অন্য দিকে, মন্থর আর্থিক বৃদ্ধি, ঋণের চাপ এবং জনসংখ্যা-সঙ্কট বেজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভাবনায় উদ্বেগ তৈরি করেছে। শি-এর ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণ কেবল আদর্শগত অবস্থানের ফল নয়, বরং অর্থনৈতিক রূপান্তরের সময় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার প্রচেষ্টাও। সমাজ, প্রযুক্তি সংস্থা এবং মতপ্রকাশের উপরে দৃঢ়তর দলীয় নিয়ন্ত্রণে স্পষ্ট যে, চিনের নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক অস্থিরতাকেই বড় বিপদ হিসাবে দেখছে। তাইওয়ানের প্রশ্নও এই কারণেই আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি শুধু ভূরাজনৈতিক নয়, চিনের কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয়তাবাদী বৈধতার সঙ্গেও জড়িত। চিন তাইওয়ানের প্রশ্নে অনড়। অন্য দিকে, চিনের কঠোর পদক্ষেপের মুখে ট্রাম্প তাইওয়ান প্রসঙ্গে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও তথ্যের স্বাধীনতাকে কতটা গুরুত্ব দেবেন, তা অনিশ্চিত। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত প্রশমিত হলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ট্রাম্পের কৌশলই বা কী হবে, তাও অস্পষ্ট।

তবে, এই চাপগুলি পরস্পরবিরোধী ফলও আনতে পারে। অর্থনৈতিক দুর্বলতা চিনের আগ্রাসী আচরণ সীমিত করতে পারে, কারণ পুনরুদ্ধারের জন্য স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। আবার অভ্যন্তরীণ চাপ জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং বহির্মুখী দৃঢ়তাও বাড়াতে পারে। একই ভাবে ট্রাম্পের অনিশ্চিত রাজনৈতিক শৈলী এক দিকে কৌশলগত নমনীয়তা তৈরি করে, অন্য দিকে মিত্র সম্পর্কের ভিত দুর্বল করে আমেরিকার বিদেশনীতির প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ক্রমশ স্থিতিশীল উদার প্রাতিষ্ঠানিকতা থেকে সরে এসে প্রতিযোগিতামূলক লেনদেন-নির্ভরতার দিকে এগোচ্ছে। অর্থনৈতিক আন্তর্নির্ভরতা আর রাজনৈতিক সুসম্পর্কের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। বরং সরবরাহ শৃঙ্খল, প্রযুক্তি, অর্থ এবং বাণিজ্য ক্রমশ কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এখন ভূ-অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতারও কেন্দ্রীয় ক্ষেত্র।

ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের প্রতিযোগিতা ভারতের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নিশ্চিত ভাবেই বাড়িয়েছে। আমেরিকা ভারতকে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনের ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসাবে দেখে। অন্য দিকে, বিশেষত লাদাখ সীমান্ত সংঘর্ষের পর, চিনের উত্থান ভারতের নিরাপত্তা-উদ্বেগ বহু গুণ বাড়িয়েছে। তবু ভারত আমেরিকার জোটে যোগ দিতে অনিচ্ছুক। কারণ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এখনও তার বিদেশনীতির কেন্দ্রীয় ভিত্তি। তা ছাড়া, চিনের সঙ্গে সরাসরি সামরিক প্রতিযোগিতা ভারতের অর্থনীতির উপরে প্রবল চাপ তৈরি করবে। এক দিকে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রায় স্থায়ী যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, অন্য দিকে ট্রাম্পের অনিশ্চয়তা— এই দুইয়ের ফলে ভারতের নিরাপত্তা-প্রশ্ন আরও জটিল হয়েছে। এই অবস্থায় চিনকে অহেতুক উত্তেজিত করা ভারতের পক্ষে মোটেই কাম্য নয়।

এই কারণেই ভারত মধ্য-শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে বোঝাপড়া বাড়াতে আগ্রহী। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ভারতের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ট্রাম্পের পাকিস্তান-সম্পর্কিত অবস্থান এবং সামগ্রিক কূটনৈতিক অস্থিরতা দিল্লির নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ফলে ভারত এক দিকে আমেরিকার সঙ্গে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করছে, অন্য দিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহ্যগত অংশীদারি বজায় রাখছে। সাম্প্রতিক ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা কৌশলগত ভাবে প্রয়োজনীয়। শক্তি নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইউরেশীয় সংযোগ— এই তিন ক্ষেত্রেই রাশিয়া ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়াও, ভারত-রাশিয়া সম্পর্কে একটি ঐতিহাসিক পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বিশ্বাসের ভিত্তি রয়েছে। সাময়িক ওঠানামা থাকলেও, সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা এখনও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নটিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। ভারতের অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নির্ভর করে সুলভ জ্বালানি এবং নিরাপদ বাণিজ্যপথের উপরে। ফলে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা নিঃসন্দেহে বড় ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে।

তীব্রতর দ্বিমেরু প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ না করে ভারত কী ভাবে পথ চলবে? সম্পূর্ণ ভাবে আমেরিকামুখী হলে চিনের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে পারে। আবার রাশিয়ার উপরে অতিরিক্ত নির্ভরতা প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। এই অনিশ্চিত সময়ে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে ভারতের উত্থানও মন্থর হয়ে পড়তে পারে। ফলে ভারতের সম্ভাব্য পথ বহুমাত্রিক কৌশলগত সমীকরণের মধ্যেই নিহিত। ভারত আমেরিকা ও পশ্চিমি শক্তির সঙ্গে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াবে, রাশিয়ার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখবে, চিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে কিন্তু সরাসরি সংঘর্ষ এড়াবে। একই সঙ্গে নিজেকে ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর মুখপাত্র হিসাবেও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।

তবে, ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের প্রকৃত ভিত্তি অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং রাষ্ট্রের কার্যকারিতা। এগুলির অভাবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকার ঝুঁকি বহন করে। উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থা সম্পূর্ণ দ্বিমেরুবিশিষ্ট নয়, প্রকৃত অর্থে বহুমেরুও নয়। এটি এমন এক অস্থির কাঠামো, যেখানে প্রতিযোগিতা, সীমিত অংশীদারি, পারস্পরিক নির্ভরতা একই সঙ্গে সক্রিয়। এই বিশ্বে ভারতের চ্যালেঞ্জ শুধু দুই মহাশক্তির মাঝে টিকে থাকা নয়, এমন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা অর্জন করা, যা তাকে নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়ম নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে সক্ষম করবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

america China Xi Jinping Donald Trump

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy