একটা অভিযোগ প্রায়ই শুনি— বইয়ের দাম নাকি এখন আকাশছোঁয়া। সত্যিই কি বাংলা বইয়ের দাম অস্বাভাবিক ভাবে বেড়েছে? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে আবেগ নয়, কিছুটা অর্থনীতির সাহায্য নিতে হয়। প্রথমেই একটা ভুল ধারণা সরিয়ে রাখা দরকার। ত্রিশ বছর আগের বইয়ের গায়ে লেখা দাম আর আজকের দাম সরাসরি তুলনা করা চলে না। কারণ এই সময়ে টাকার ক্রয়ক্ষমতা বদলেছে, মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বিমল করের খড়কুটো বা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাগজের বউ-এর দাম ছিল ২০ টাকা। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের সোফা-কাম-বেড ২৫ টাকা। কিন্তু সেই ২০ টাকা আজকের ২০ টাকা নয়। গড় মূল্যস্ফীতির হিসাব ধরলে, নব্বইয়ের দশকের ২০ টাকা আজ প্রায় ১২৮ টাকার সমান; সে দিনের ২৫ টাকার মূল্য আজ প্রায় ১৬০ টাকা। কাজেই, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে যে বইয়ের দাম ২৫ টাকা ছিল, আজ যদি তার দাম হয় ১৬০ টাকা, তবে বলতে হবে যে, গত তিন দশকে বইটির প্রকৃত মূল্য অপরিবর্তিত থেকেছে।
কিন্তু, বইয়ের বাজারে খোঁজ করে দেখছি, এই বইগুলির বর্তমান দাম ২৭৫ টাকা থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ, বাজারদরের সাধারণ বৃদ্ধির তুলনায় এই বইগুলোর দাম বেড়েছে বেশি হারে। অবশ্যই তিনটি বই দিয়ে গোটা বাংলা বইবাজারের ছবি আঁকা যায় না। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের লেখকদের বইয়েও একই প্রবণতা স্পষ্ট। বড় প্রকাশনা হোক বা ছোট— বাংলা গল্প-উপন্যাসের সাধারণ দাম এখন ৩০০-৪০০ টাকার ঘরে।
তবে, বইকে সাধারণ ভোগ্যপণ্যের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়। ভোগ্যপণ্যের মূল্যসূচক দিয়ে বইয়ের দাম বিচার করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। বাজারে এমন বহু পণ্য আছে, এই একই সময়কালে যাদের দাম বেড়েছে গড় মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় অনেক বেশি হারে। নামী দোকানের মিষ্টি থেকে উচ্চ মার্গের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের টিকিট— বহু ক্ষেত্রেই একই প্রবণতা দেখা যায়। দ্বিতীয়ত, গত তিন দশকে বহু মানুষের উপার্জনও উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। এমন বহু পেশা রয়েছে, যেখানে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বেতন ছিল মাসে হাজার ছয়েক টাকা— এখন তা এক লক্ষ টাকারও বেশি। অর্থাৎ, বইয়ের দাম যে অনুপাতে বেড়েছে, বহু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে তার চেয়ে বেশি হারে।
বিভিন্ন প্রকাশনার পুস্তকতালিকায় দেখছি, ২০২০ সালে যে বইগুলির দাম ছিল ১২৫ বা ২০০ টাকা, সেগুলিই পাঁচ বছরের মধ্যে ৩০০-৩৫০ টাকায় পৌঁছে গিয়েছে। প্রকাশকদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কাগজ, ছাপা, বাঁধাই, পরিবহণ— সব ক্ষেত্রেই অতিমারির পরে খরচ বেড়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনও বাজারের চরিত্র বদলে দিয়েছে। এক সময় একটি বই প্রথম মুদ্রণে তিন হাজারের বেশি কপি ছাপা হত। এখন অনেক ক্ষেত্রেই ২০০-৩০০ কপি ছাপলেই প্রকাশক সন্তুষ্ট। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে কম সংখ্যক কপি ছাপাও সম্ভব হয়েছে। অতএব, আগে বইয়ের দাম বাড়ানোর জন্য যেখানে কমপক্ষে ১১০০ কপির সংস্করণ ফুরোনোর অপেক্ষা করতে হত, এখন ৩০০ কপি ফুরোনোর জন্য অপেক্ষা করলেই চলে।
অন্য দিকে, প্রকাশকদের দীর্ঘ দিনের অভিযোগ, বইয়ের চাহিদা কমছে। পাঠক কমে গিয়েছে, নিয়মিত বই কেনার অভ্যাস কমেছে, সমাজমাধ্যম ও ডিজিটাল বিনোদন পড়ার অভ্যাসের ক্ষতি করেছে। ফলে জনপ্রিয় লেখকের বইও এখন খুব বেশি ছাপা হয় না। খরচ বাড়ছে, চাহিদা কমছে— এই অবস্থায় দাম না বাড়িয়ে উপায় কী? তবে, এটাও ঘটনা যে, অন্তত কিছু লেখকের বইয়ের ক্ষেত্রে কিন্তু দাম বাড়লেও চাহিদা যথেষ্ট বজায় থাকে। প্রিয় লেখকের বই পাঠক কেনেনই— গজগজ করতে করতে হলেও, কেনেন!
কিন্তু, দাম বাড়ার ফলে কোন বইয়ের চাহিদা কেমন ভাবে পাল্টাবে, এই বাজারে তা অনুমান করা চিরকালই কঠিন, ইদানীং কঠিনতর। এই কারণেই বর্তমানের প্রকাশকেরা সম্ভবত পুরনো অর্থে প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ়েশন বা সর্বাধিক সম্ভাব্য মুনাফা অর্জনের হিসাব কষছেন না। বরং, আগে থেকে একটি নির্দিষ্ট লাভের অঙ্ক ঠিক করছেন, তার পর তুলনায় কম সংখ্যক বই ছাপিয়েও যাতে সেই টাকাটা উঠে আসে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বইয়ের দাম স্থির করছেন। অর্থনীতির ভাষায় এটি অনেকটা ‘গোল প্রোগ্রামিং’-এর মতো। অর্থাৎ বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা–দামের সম্পর্কের উপর নির্ভর না করে, নির্দিষ্ট আয় নিশ্চিত করার জন্য দাম স্থির করা হচ্ছে।
বইয়ের দাম নিয়ে পাঠকের অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়। আবার প্রকাশকদের যুক্তিও সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা যায় না। বই এখানে শুধু পণ্য নয়; তা সাংস্কৃতিক পুঁজি, সামাজিক পরিচয় এবং সীমিত চাহিদার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। তাই বইয়ের দাম নিয়ে বিতর্ক শেষ পর্যন্ত শুধু বাজারের বিতর্ক নয়; বাংলা পাঠসংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)