সলিল চৌধুরী এবং লতা মঙ্গেশকরের রেখে যাওয়া সম্পদ আমরা ভুলি কী করে! কখনও অপেক্ষায়, কখনও বিরহে, হর্ষে, প্রেমে বা কখনও ঋতুবদলে এই জুটির সম্মোহন আজও অটুট। সম্প্রতি একেবারেই ভিন্ন এক প্রসঙ্গে তাঁদের একটি জনপ্রিয় গানের চরণ মনে ফিরে ফিরে আসছে বারংবার। যে কোনও মহৎ সৃষ্টির ব্যাখ্যাতেই উদ্বৃত্ত অর্থ পাওয়া যায়। অর্থাৎ লেখক, কবি বা গীতিকার যে প্রেক্ষাপটে তা রচনা করেছেন, শ্রোতা পাঠক দর্শক সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর কোনও পরিস্থিতিতেও আবিষ্কার করেন তার দ্যোতনাকে।
এ ক্ষেত্রে যে গানটির কথা বলতে চাইছি সেটি আদতে রোমান্টিক। অন্তত সেই ভাবনা থেকেই লেখা এবং গাওয়া। এত বছর পরেও বাঙালি যা গুনগুন করে— ‘কেন কিছু কথা বলো না?/ শুধু চোখে চোখে চেয়ে/ যা কিছু চাওয়ার আমার,/ নিলে সবই চেয়ে।/ এ কী ছলনা।’
অবশ্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কথা বলেন না, এমনটা তাঁর চরম রাজনৈতিক বৈরীও ক’বে না। বলেন, এবং বেশিই বলেন। বস্তুত, তিনি যে অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক আধিপত্য বছরের পর বছর ধরে রেখেছেন সরকার, দল এবং বিজেপির ভোটার ও সমর্থকদের মধ্যে, গ্রামেগঞ্জে সদর-মফস্সলে— এর পিছনে তাঁর বাক্কৌশল বা বাচনভঙ্গি অনেকটাই সহায়তা করেছে। নিজের বক্তব্যকে আকর্ষণীয় এবং বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারেন তিনি, সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্মোহন বুনে দিতে পারেন। মনে হয়, ভারত দ্রুতগতিতে জগৎসভায় সেরার আসনটির দিকে ধাবমান; সামনের শ্রোতারা (এবং ডিজিটাল মাধ্যমে লাখো লাখো দেশি ও অনাবাসীরা) ভুলে যান নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর দশা এই দেশে ভয়াবহ বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, অনটন, কৃষক আত্মহত্যা, সারের দাম না পাওয়া, রুগ্ণ থেকে রুগ্ণ হয়ে যাওয়া ছোট ও মাঝারি শিল্পে লালবাতি জ্বলার দৃশ্য। বিপজ্জনক ভাবে ভুলে যান এই দেশকে উপপ্লবেও টিকিয়ে রেখেছে বৈচিত্রের, বহুত্ববাদের, বহুস্বরের কলতান। তার কারণ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারেন তাঁর প্রত্যয়ী দেহভাষা এবং বাগ্ভঙ্গিমায়। অন্তত এক বিরাট সংখ্যক মানুষের কাছে তো বটেই।
তাঁর পূর্বসূরি অটলবিহারী বাজপেয়ীও ছিলেন এক অসামান্য বাগ্মী। কিন্তু তাঁর বক্তৃতা ছিল ভাষাঋদ্ধ, এক জন কবির মতোই। তিনি সমস্যার মূলে গিয়ে কথা বলতেন, ভারসাম্য রাখতেন, অতিশয়োক্তি জোর গলায় করতেন না। নরেন্দ্র মোদী গদ্যে কথা বলেন, এমন ভাবে বলেন যা সরাসরি শ্রোতার মরমে পশে। এ রকম হাটে মাঠে বাটে বাজার গরম করা বক্তৃতা দিতে অন্তত হিন্দি ভাষায় আমি কখনও শুনিনি।
কিন্তু তবু কেন সলিল-লতার ওই যুগলবন্দি মনে পড়ছে ইদানীং মোদী প্রসঙ্গে? কথা তো তিনি বলেন, ছলনা না করেই। মনে পড়ছে, কারণ তিনি যা বলেন তা লাউডস্পিকার-ধর্মী। বিনিময় নেই, প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া নেই। অর্থাৎ বিষ্ণু দে-র কাব্যগ্রন্থের নাম অনুসরণে— ‘উত্তরে থাকো মৌন’। যে জনতার ভোটে জিতে আসা, সেই জনতার আশঙ্কা, ইচ্ছা, সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি গত ষোলো বছরে নিশ্চুপ। বা আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায়, তিনি সেই প্রশ্নের উত্তরেই স্বচ্ছন্দ যা তাঁর ভাবমূর্তিকে নাড়া দেবে না, অস্বস্তিতে ফেলবে না। ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত ভাবেই নাগরিকদের পাঠানো চিঠির উত্তর দেন, সেই চিঠিও পড়ে শোনান। কিন্তু সেই চিঠি আলটপকা তাঁর সামনে ধেয়ে আসে না। নির্দিষ্ট মাধ্যমে ঝাড়াই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসে। তা নিরাপদ, তাতে ক্ষোভের কথা থাকে না। বিভিন্ন সরকারি যোজনা-প্রাপকদের ভিডিয়ো সংযোগেও তিনি যাঁদের সঙ্গে কথা বলেন তা পূর্বনির্ধারিত, মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের স্তুতিই যার ভূষণ। এগুলিতে সমালোচনার গন্ধ নেই।
সংবাদমাধ্যমের প্রধান এবং অন্যতম কাজ প্রশ্ন করা। গণতন্ত্রে প্রশ্ন করার অধিকারকে নস্যাৎ করে দিলে, তাকে আর গণতন্ত্র বলে উল্লেখ করা যায় কি? নিশীথ সূর্যের দেশ নরওয়েতে সম্প্রতি ঝুলি থেকে একটি বেড়াল বেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিবেশিত হল। এই তথ্যটি অনেকেরই জানা ছিল না যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সূচকে ভারতের স্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে তলানিতে।
প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করেন না, এই তথ্য দেশের সাংবাদিকরা জানতেন, এ বার তা আন্তর্জাতিক আতশকাচের তলায় এল নরওয়ের সংবাদপত্র দাক্সতাভিস-এর সাংবাদিক হেলে লিং-এর কারণে। নিছক এক জন সাংবাদিকের মৌলিক অধিকার অর্থাৎ প্রশ্ন করার অধিকার নিয়ে যিনি সরব হওয়ায় বিদেশ মন্ত্রককে ভারতের সাংবিধানিক মূল্যবোধ, বহুত্ববাদ, মানবাধিকারের রেকর্ড, গণতন্ত্রের দীর্ঘ ভাষ্য তুলে ধরতে হয়েছে।
একুশ বছর আগে ইংল্যান্ডের নোবেলজয়ী নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টার তাঁর নোবেল-বক্তৃতার শুরুতেই বলেছিলেন, এক জন লেখক হিসাবে তিনি এই মতামতের সপক্ষে: যে কোনও বিষয়কেই হয় সত্য অথবা মিথ্যা হতে হবে, এমনটা নয়। এমনও হতে পারে, তা একই সঙ্গে মিথ্যা ও সত্য। তিনি এই মতামতের সপক্ষে কারণ সে ক্ষেত্রে শিল্পের মাধ্যমে সত্যকে খনন করার সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা যায়। কিন্তু পাশাপাশি এটাও তিনি বলেছিলেন, এক জন নাগরিক হিসাবে এই তত্ত্বকে মোটেই সমর্থন করার কোনও জায়গা নেই। এক জন নাগরিককে অবশ্যই প্রতি পদে প্রশ্ন করতে হবে, কোনটা সত্য আর কোনটা নির্জলা মিথ্যে। সাংবাদিকের কাজ বা অনুসন্ধান এক জন সাহিত্যিক বা শিল্পীর নয়। সরাসরি এক জন নাগরিকের হয়ে না হলেও, নাগরিকের স্বার্থ, অসুবিধা, আকাঙ্ক্ষা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও সমস্যা নিয়ে তাঁর চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করার কথা শাসককে।
ভারত-নর্ডিক দেশগুলির সম্মেলনের খবর ছাপিয়ে তাই ‘কথা না বলা’র এই খবর মানুষকে আলোড়িত করেছে। অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু সর্বদা মুখ খোলেন, এমন নয়। তিনি বলছেন, “ভারতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও অর্থনীতি ধাক্কা খাচ্ছে সরকারের সমালোচনা সহ্য করতে না পারার কারণে। যদি কারও সমালোচনা হজম করার মতো আত্মবিশ্বাস না থাকে, নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে কোনও সংশোধনী পদক্ষেপ না করে যদি স্লোগান দেওয়া হয়, তা হলে অর্থনীতিতে তার বিরাট নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।” এর পাশেই বিজেপির আইটি শাখার প্রধান অমিত মালবীয়র বক্তব্য— নরওয়ের ওই ঘটনা এক তুচ্ছ সাংবাদিকের অসংলগ্ন বাচালতা মাত্র।
পনেরো বছর শাসন করা একটি সরকারকে সরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সদ্য ক্ষমতায় এল অমিত মালবীয়র দল। তাঁদের কিন্তু মাথায় রাখা উচিত, সমালোচনা সহ্য করতে না পারা, যে কোনও অস্বস্তিকর প্রশ্ন বা প্রসঙ্গকে (তা শুধু সাংবাদিকের তরফে আসা নয়, দলের ভিতরেও) তাচ্ছিল্য করা এবং ঔদ্ধত্য, তৃণমূলের পনেরো বছরের সাম্রাজ্যকে রাতারাতি তাসের প্রাসাদে পরিণত করেছে।
সমাজের, সীমান্তের, শেষতম মানুষটির কাছে সরকারি যোজনার সুফল পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সরকার। এটাও সঙ্গে মনে রাখলে ভাল, একেবারে শেষের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি শুধুই গ্রহীতা নন, তাঁরও প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার অধিকার এবং আকাঙ্ক্ষা রয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)