মালদহ থেকে আলিপুরদুয়ার এই জেলাগুলির সমষ্টি হল উত্তরবঙ্গ। ২০২৬-এর বিধানসভার নির্বাচনী ফলাফল দেখলে প্রায় সবেতেই বিজেপির জয়জয়কার। এর মধ্যে কোচবিহার রাজার দেশ। রাজতন্ত্র থেকে জেলায় পরিণত হওয়ার ইতিহাস কোচবিহারকে এক স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে। এই জেলার দিকে এক বার তাকানো যেতে পারে।
কোচবিহার এক দিকে আঞ্চলিক রাজনীতি ও অন্য দিকে জাতি-ভিত্তিক রাজনীতির বাহক। জাতীয় তথা রাজ্য রাজনীতির নেতাদের এই ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়েই ভিন্ন ভিন্ন আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা যায়। আনুমানিক ৫০% মানুষই রাজবংশী, মুসলিম ২৫-২৬%। ২০২৬-এর বিধানসভায় রাজবংশীদের প্রায় সব ভোটই পড়েছে বিজেপির ঝোলায়, ন’টি বিধানসভার আটটি বিজেপির দখলে। সিতাই বিধানসভা কেন্দ্রে টিএমসি মাত্র ২৭২১ ভোটের ব্যবধানে জিতেছে। তবে এ তো নতুন নয়, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকেই উত্তরবঙ্গে বিজেপির পাল্লাটা হেলে রয়েছে।
ইতিহাস যেন ফিরে ফিরে আসে। বামপন্থীদেরও উত্থানের পিছনে ছিল উত্তরবঙ্গের বিশিষ্ট ভূমিকা। তেভাগা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এর শুরু হয়েছিল। যার পিছনে ছিল রাজবংশী ও স্থানীয় মুসলমানদের যৌথ সমর্থন। কিন্তু বামেদের ৩৪ বছরের রাজত্ব না সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল রাজবংশীদের, না পেরেছিল উত্তরবঙ্গবাসীকে। বরং রাজবংশীরা পেয়েছিল জঙ্গি তকমা। তারা হারিয়েছিল জমি, হারিয়েছিল মানমর্যাদাও। সেখানে জন্ম নিয়েছে জাতিগত আন্দোলন। উঠেছে আলাদা রাজ্যের দাবি, উঠেছে ভাষার স্বীকৃতির দাবি।
সেই পর্ব থেকেই রাজবংশী জাতি আন্দোলনের নেতৃত্বদের অভিযোগ শোনা যায়, উত্তরবঙ্গ উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। কলকাতার উপনিবেশ। উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গের মানুষের কাছে আমোদপ্রমোদের জায়গা। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নের প্রশ্নে বঞ্চিত, জাতের প্রশ্নে অবমানিত। তাই কি ক্রমে কলকাতার শাসকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া?
‘আলাদা রাজ্যের দাবি’র ধারাটি রাজবংশী জাতি আন্দোলনের জায়গা থেকে এত দিন ধরে শোনা গেলেও, বর্তমানে তার পরিসরটা বদলে গেছে। আজ তা আঞ্চলিক রাজনীতির রূপ নিয়েছে। বার বার শোনা যায় ক্ষোভ, কোনও কিছু করতে গেলেই কেন কলকাতা যেতে হবে! এই অপবাদ ঘোচানোর প্রচেষ্টা যে হয়নি, তা-ও নয়। উত্তরকন্যা তৈরি হয়েছে, পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, আলিপুরদুয়ারে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় তো আগের থেকেই ছিল। বিগত সরকারের আমলে জলপাইগুড়িতে হাই কোর্টের একটি শাখা খোলা হয়েছে। কিন্তু সেই হাই কোর্টের সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায় না কলকাতায় আছি, না জলপাইগুড়িতে। এমন ভাবে কোর্টের বিল্ডিং ডিজ়াইন করা হয়েছে, তাতে স্থানীয় সংস্কৃতির কোনও ছোঁয়াই নেই। এ জন্য কি উত্তরবঙ্গের স্থানীয় মানুষের ‘মনগোসা’ (অভিমান) হয়েছে?
উত্তরবঙ্গের স্কুলের শিক্ষকরা অভিযোগ করে আসছেন কলকাতায় গরম পড়লে সারা রাজ্যের স্কুলে ছুটি হয়, কিন্তু তখনও উত্তরবঙ্গের আবহাওয়া ঠান্ডা থাকে। মানদণ্ডটা যে-হেতু কলকাতা নিয়ন্ত্রণ করে, উত্তরবঙ্গের শিক্ষকরা ছুটির ব্যবস্থাটাকেও ভাল ভাবে মেনে নেন না।
ভাষার প্রশ্নটি আরও মারাত্মক। রাজবংশী বা কামতাপুরি নামে যে ভাষা রাজবংশী মানুষজনের মাতৃভাষা, তা উত্তরবঙ্গের অনেক স্থানীয় মানুষেরও মৌখিক ভাষা। এই ভাষার উচ্চারণ, ভাব ও ব্যঞ্জন অনেকটা বাংলা ভাষার কাছাকাছি, তবে বাংলা ভাষা নয়। রাজবংশী বা কামতাপুরি ভাষা উচ্চারণে ‘স’ ‘শ’ ‘ষ’ উচ্চারণ নেই বললে চলে। তাই ‘স’ যুক্ত বাংলা ভাষার উচ্চারণ অনেক উত্তরবঙ্গবাসীর সে ভাবে আসে না। ‘স’ এর জায়গায় ‘চ’ বা ‘ছ’ টান দিয়ে উচ্চারণ করেন। সেটা নিয়েও আবার হাসি তামাশার একটা সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গে আছে। রাজবংশীরা কখনও ‘তুমি’ বা ‘আপনি’ দিয়ে সম্বোধন করেন না, ‘তুই’ কিংবা ‘তোমরা’ বলতে তাঁরা অভ্যস্ত। বুঝুন কী অপরাধটা তাঁরা করেন, বাবুদের কাছে!
উত্তর ও দক্ষিণের এই দূরত্ব দীর্ঘ দিনের ও অনেক প্রকারের। বিভিন্ন রাজনৈতিক জমানায় এই দূরত্বের পরিধি অনেকটা বেড়েছে কিংবা প্রশমিত হয়েছে, কিন্তু মানসিকতার খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। আজকাল সব কিছুর হিসাব উন্নয়নের প্রশ্নে ভাবার অভ্যাস শুরু হয়েছে। টাকা দিয়ে উন্নয়ন হতে পারে, কিন্তু রূপান্তর ঘটে কি? উন্নয়ন হল লোকদেখানো ব্যাপার, রূপান্তর হল ভিতরের জিনিস। এক জন লোক শিক্ষিত হলে তাঁর আচরণে, ভাব ও ভঙ্গিমায় যে বদল আসে, সেটাই রূপান্তর।
অমুক পার্টি ক্ষমতায় গেলে ১০ টাকা ভাতা দেবে। কাল তমুক পার্টি এসে বলবে আমরা ক্ষমতায় থাকলে ১৫ টাকা মাথাপিছু দেব। সাধারণ মানুষ কি আবার সেই খেলাটাই খেলবে? ভাতা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলি ভিন্ন ভিন্ন ন্যারেটিভ তৈরি করে। তা কতটা বাস্তবকে প্রতিফলিত করে? এক একটি পরিবারের মাসিক আয়ের সঙ্গে এখন ভাতা যোগ করে কি সংসার চলছে? এ কি শুধু উত্তরবঙ্গের কথা, না কি সকলের কথা?
ভোটের পর জয়-পরাজয়ের উল্লাস ও নিস্তব্ধতা, সবই ক্ষণস্থায়ী। মাঝখান থেকে চলে হিংসা, লুটপাট, সুযোগসন্ধান। মনে হয় ভোটের জয়কে চিরস্থায়ী করার ব্যবস্থা চলছে। মানুষ জানেন, সে ভাবনা অর্থহীন, অলীক।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)