ঘোষণার মাত্র এক দিনের মধ্যেই রাজ্যে চালু হয়ে গেল ‘হোল্ডিং সেন্টার’। রাজ্যের শাসকরা বলতেই পারেন, তাঁরা অক্ষরে অক্ষরে নিজেদের শপথ রাখছেন— ‘ডিটেক্ট-ডিটেন-ডিপোর্ট’ বা ‘শনাক্তকরণ-আটক-বহিষ্কার’ নীতির প্রথম দু’টি ধাপ চালু করে দিয়েছেন। যে দু’টি জেলায় আটক শিবির চালু হয়েছে, ঘটনাচক্রে সে দু’টি জেলায় জনসংখ্যায় মুসলমানদের অনুপাত সর্বোচ্চ— মুর্শিদাবাদে ৬৬ শতাংশ, মালদহে ৫১ শতাংশ। নির্বাচনী প্রচারপর্বের প্রতিশ্রুতি থেকে যদি ইঙ্গিত পেতে হয়, তবে অনুমান করা চলে যে, জেলাগুলির নির্বাচন নিছক যদৃশ নয়। অবৈধ ভাবে ভারতে বসবাস করছে, এমন যে কোনও ব্যক্তিকেই দেশ থেকে বহিষ্কার করা বিধেয়, তা তর্কাতীত। কিন্তু, কে অবৈধ আর কে বৈধ, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সম্পূর্ণত পুলিশের উপরে ন্যস্ত হতে পারে কি? কোনও ব্যক্তিকে একেবারে প্রথমেই আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে আটক করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হিসাবে গণ্য হওয়া মুশকিল— বজ্রকঠিন রাষ্ট্রশাসনের এ-হেন উদাহরণ সর্বাধিপত্যকামী একতান্ত্রিক শাসনের অভিজ্ঞান। এসআইআর তালিকায় নাম থাকা অথবা না-থাকা নাগরিকত্বের বিচারে প্রভাব ফেলবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তরও স্পষ্ট নয়। কিন্তু গোটা প্রক্রিয়ায় যে বিষম তাড়া লক্ষ করা যাচ্ছে, তাতে রাজ্যবাসীর সংশয় হতে পারে। প্রশ্ন করা প্রয়োজন, ভারতের অন্যান্য রাজ্যে যাঁরা এসআইআর তালিকা থেকে বাদ পড়লেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও কি সরকার একই অবস্থান গ্রহণ করছে? তেমন কোনও নিদর্শন এখনও মেলেনি। ফলে, আশঙ্কা থেকেই যায় যে, পশ্চিমবঙ্গে যা ঘটছে এবং ঘটতে চলেছে, তার উদ্দেশ্য ভিন্নতর।
প্রতিবেশী রাজ্য অসমে এখন আর ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ কথাটি ব্যবহৃত হয় না, কিন্তু প্রক্রিয়া কঠোরতর হয়েছে। ১৯৫০-এর ইমিগ্র্যান্ট (এক্সপালশন ফ্রম অসম) আইন অনুসারে জেলা প্রশাসনের ক্ষমতা রয়েছে যে কোনও সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বহিষ্কার করার। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে প্রশাসন ঠিক কোন পথে হাঁটবে, তা এখনও স্পষ্ট না হলেও মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে, এক জন বৈধ নাগরিককেও যাতে হেনস্থা না করা হয়। অসমের ডি-ভোটার শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় অন্তত বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপের অবকাশ ছিল। ফরেনার্স ট্রাইবুনালের ফয়সালায় সন্তুষ্ট না হলে হাই কোর্ট, এবং সুপ্রিম কোর্ট অবধি যাওয়ার সুযোগ ছিল। পশ্চিমবঙ্গে যে ভঙ্গিতে পুলিশের হাতে প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও আটক করার অধিকার দেওয়া হচ্ছে, তাতে মানুষের এই সুযোগও থাকবে না বলেই আশঙ্কা। প্রক্রিয়ায় বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ দাবি করার সুযোগ ও অধিকার মানুষের থাকা প্রয়োজন।
এসআইআর-এর যৌক্তিক অসঙ্গতি সংক্রান্ত অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট যে, এ রাজ্যে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা বহু প্রজন্ম ভারতের নাগরিক হলেও তাঁদের নথিপত্রে বিবিধ অসঙ্গতি থেকে গিয়েছে। দরিদ্র, স্বল্পশিক্ষিত মানুষের পক্ষে রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে লড়ে যাওয়ার কাজটি কতখানি কঠিন, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনের প্রক্রিয়া তা প্রমাণ করেছে। আটক শিবির চরিত্রগত ভাবেই কঠিনতর লড়াই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাছে প্রতিটি মানুষের যা ন্যূনতম প্রত্যাশা, সেই মানবাধিকার থেকে কাউকে যেন বঞ্চিত না করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অসমে দু’বছর আটক থাকার পর যাঁরা জামিন পাচ্ছেন, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেই সেই মুক্তি বন্দিদশারই বর্ধিত রূপ, কারণ তত দিনে তাঁদের জীবন, জীবিকা সবই বিপর্যস্ত। যে মরে মরুক, আর যারা বেঁচে থাকে তাদের অবশিষ্ট জীবন শোক করেই কেটে যাক— রাষ্ট্র এমন অবস্থান নিতে পারে না। সরকার মনে রাখুক, সংবিধান অনুসারে ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে সব মানুষের প্রতি সমান দায়িত্ব পালনে তারা দায়বদ্ধ। রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া যেন কোনও বিশেষ জনগোষ্ঠীর হয়রানির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)