অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, তৃতীয় সন্তান ধারণ করলে ৩০ হাজার টাকা, এবং চতুর্থ সন্তান ধারণ করলে ৪০ হাজার টাকা দেবে সরকার। সত্তর-আশির দশকে বন্ধ্যাত্বকরণের শিবিরে যেতে মেয়েদের নানা ভাবে জোর করত সরকার, যার অন্যতম ছিল টাকার টোপ। এখন ছবিটা বিপরীত: আরও গর্ভধারণের জন্য অনুদান দেবে সরকার। সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাট যথার্থই বলেছেন, দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা শুধু টাকার জন্য বধূকে বাধ্য করতে পারে আরও একটি সন্তান গ্রহণে; মেয়েটির ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাম সেখানে থাকবে না। রাষ্ট্র, পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে ক’জন মেয়ে? এমন এক নীতি গ্রহণের আগে মেয়েদের সঙ্গে, চিকিৎসকদের সঙ্গে মতামত আদানপ্রদানের কোনও প্রয়োজনই অনুভব করলেন না মুখ্যমন্ত্রী। শাসক দল বা প্রশাসন, কারও তরফেই নারী ও মানবাধিকার সংগঠন, নাগরিক সমাজের সঙ্গে কথা বলা হয়নি। অথচ শাসক এ সত্য উপেক্ষা করতে পারেন না, অগণিত দরিদ্র পরিবারে সন্তান পালনের আর্থিক দায় পূর্ণত বা আংশিক ভাবে বহনে বাধ্য হন মেয়েরাই। তিন-চারটি সন্তান মায়ের রোজগার ক্ষমতা ব্যাহত করবে, তাঁকে শ্রমবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করবে, স্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি করবে। কিছু টাকা দিয়ে সেই ক্ষতিপূরণ করতে পারবে না সরকার, বিশেষত যেখানে সেই টাকার উপর মেয়েটির নিয়ন্ত্রণ না-থাকার সম্ভাবনা যথেষ্ট।
সর্বোপরি, এই সিদ্ধান্তে মেয়েদের নিজস্ব মতামত-বিশিষ্ট পূর্ণ নাগরিক বলে না দেখে কেবল একটি ‘গর্ভ’ বলে গণ্য করার দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এই ভঙ্গিতেই অভ্যস্ত ও স্বচ্ছন্দ। এই অন্যায় বৈষম্যে আরও একটি অশুভ মাত্রা যোগ করে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ দাবি করেছে, শুধু হিন্দুদের এই টাকা দেওয়া হোক, কারণ দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে মুসলিমরা পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্পে অংশগ্রহণ করেননি। বাস্তব এই যে, ভারতে মুসলিমদের মধ্যে সন্তানদের জন্মহারে হ্রাস ঘটছে হিন্দুদের তুলনায় দ্রুত। বেশ কিছু রাজ্যে মুসলিমদের গড় সন্তানসংখ্যা দুইয়ের কম, ছত্তীসগঢ়ের মতো কিছু রাজ্যে মুসলিমদের গড় সন্তানসংখ্যা হিন্দুদের চেয়ে কম। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সন্তানসংখ্যা সর্বাধিক নির্ভর করে মায়ের শিক্ষা ও সক্ষমতার উপরে, পরিবারের আর্থিক অবস্থার উপরে। এই বিজ্ঞানসিদ্ধ ফলাফল সরিয়ে রেখে ফের মেয়েদের শরীরকে রাজনীতির ময়দান করে তোলা হচ্ছে কেন?
অতিরিক্ত সন্তানের জন্য সরকারের এই আকুতির মূলে রয়েছে ভারতীয় রাজনীতিতে দক্ষিণের রাজ্যগুলির শক্তি হারানো, অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। কেন্দ্র লোকসভার নির্বাচনক্ষেত্রের পুনর্বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’-এর যে নীতি নিতে চলেছে, তাতে জনসংখ্যা অনুসারে প্রতিনিধি-সংখ্যা নির্ধারিত হবে, এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তেমন ঘটলে উত্তর ভারতের জনবহুল রাজ্যগুলি থেকে অনেক বেশি জনপ্রতিনিধি যাবেন সংসদে। উত্তরপ্রদেশ, বিহারের মতো কয়েকটি রাজ্যের সাংসদরাই কার্যত সংসদের দখল নেবেন। আইন প্রণয়নে, রাজনৈতিক বিতর্কে দক্ষিণের রাজ্যগুলি প্রভাব হারাবে। ডিলিমিটেশন-এর পদ্ধতির বিকল্প নানা প্রস্তাব এসেছে। যেমন, লোকসভার মোট আসনে বর্তমানে যে রাজ্যের যত শতাংশ প্রতিনিধিত্ব আছে, বর্ধিত লোকসভাতেও তা অপরিবর্তিত রাখা। প্রধানমন্ত্রী সংসদে মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, রাজ্য-প্রতি আসনসংখ্যা ৫০% বাড়বে। কিন্তু ১৬ এপ্রিল সংসদে যে ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ করা হয়, সেখানে সেই প্রস্তাব রাখা হয়নি। বিরোধী ঐক্য সেই সংশোধনীকে পরাজিত করেছে, কিন্তু কেন্দ্রের প্রতি রাজ্যগুলির আস্থায় ঘাটতি বেড়েছে। ফলে চন্দ্রবাবুর মতো নেতারা জনসংখ্যা বাড়ানোকেই জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্ব পাওয়ার একমাত্র পথ বলে মনে করছেন। এমন চটজলদি সমাধান মেয়েদের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, ব্যাহত করতে পারে দেশের উন্নয়ন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)