E-Paper

শিক্ষা মানে ভাবতে শেখা

ডিগ্রি ও জীবিকার মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে যে সামাজিক চুক্তি ছিল, সেটা ক্রমে ভেঙে পড়ছে। “ভাল বিষয় পড়ো, ভাল ফল করো, ভাল চাকরি পাবে”— মধ্যবিত্ত সমাজের এই সরল বিশ্বাস এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়।

রোহন

শেষ আপডেট: ২৬ মে ২০২৬ ০৫:০২

কৃত্রিম মেধার হাতেই ক্রমশ সব কাজ চলে যাবে, ফলে উচ্চশিক্ষাও গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে, এমন একটি কার্যত সর্বজনীন বিশ্বাসের একেবারে গোড়ায় একটা ভুল থেকে গিয়েছে। যে শিক্ষা তথ্য মুখস্থ করায়, কিন্তু বিশ্লেষণ শেখায় না; ভাষা শেখায়, কিন্তু যুক্তি শেখায় না; ডিগ্রি দেয়, কিন্তু বাস্তব সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা দেয় না— সেই শিক্ষা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আরও দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। যন্ত্র তথ্য সাজাতে পারে, ভাষা নকল করতে পারে, এমনকি উত্তরও তৈরি করতে পারে। কিন্তু মানুষকে এখনও শিখতে হবে কোন প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, কোন সিদ্ধান্ত নৈতিক, এবং জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে কী ভাবে যুক্ত করতে হয়। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষার গুরুত্ব কমছে না; বরং শিক্ষার কাজ আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

ডিগ্রি ও জীবিকার মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে যে সামাজিক চুক্তি ছিল, সেটা ক্রমে ভেঙে পড়ছে। “ভাল বিষয় পড়ো, ভাল ফল করো, ভাল চাকরি পাবে”— মধ্যবিত্ত সমাজের এই সরল বিশ্বাস এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়। ইউরোপের বহু দেশে কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল হলেও, ডিগ্রি থেকে কাজের জগতে প্রবেশের পথ সমান নয়। এই কারণেই জার্মানির বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও শিক্ষানবিশি-ভিত্তিক দ্বৈত ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে শিক্ষা এবং কাজ পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার জন্য শেখে না; বাস্তব কাজের ভিতর দিয়েই শেখে। ফলে সার্টিফিকেট কেবল একটি কাগজ হয়ে থাকে না; তা সামাজিক ভাবে স্বীকৃত অভিজ্ঞতার রূপ পায়।

পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের দীর্ঘ অনুপস্থিতি, গবেষণায় নামমাত্র বিনিয়োগ, সরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবক্ষয়, এবং শিক্ষাকে দীর্ঘ দিন দলীয় প্রভাবের মধ্যে আটকে রাখার সংস্কৃতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কিন্তু এর থেকেও বড় সত্য হল— একটি ডিগ্রি প্রায়শই পরিবারের বেঁচে থাকার কৌশল। এক জন ছাত্র ব্যর্থ হলে, বহু ক্ষেত্রে একটি পরিবারও ব্যর্থতার অভিঘাত বহন করে। ফলে বেকারত্ব এখানে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; তা সামাজিক ও মানসিক সঙ্কটও।

এই সঙ্কটের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপর আস্থাহীনতা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তির হার কমে আসা এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে ঝোঁক বাড়া সেই প্রবণতারই লক্ষণ। উচ্চবিত্ত পরিবার কোনও না কোনও ভাবে বিকল্প কিনে নিতে পারে। কিন্তু প্রান্তিক ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে সরকারি কলেজই সামাজিক গতিশীলতার প্রধান পথ। ফলে রাষ্ট্রীয় উচ্চশিক্ষার দুর্বলতা শুধু শিক্ষার সঙ্কট নয়; তা সামাজিক সমতার সঙ্কটও। কারণ শিক্ষার দরজা দুর্বল হলে সমাজের ভিতর শ্রেণিগত বিভাজন আরও স্থায়ী হয়।

পাওলো ফ্রেইরি পেডাগজি অব দি অপ্রেসড বইয়ে যে ‘ব্যাঙ্কিং মডেল’-এর কথা বলেছিলেন, আমাদের শিক্ষা এখনও অনেকাংশে সেই মডেলেই আবদ্ধ। শিক্ষক তথ্য জমা রাখেন, ছাত্র তা গ্রহণ করে, পরীক্ষা সেই জমা তোলার কাজ করে। কিন্তু জ্ঞান কোনও জমা-খাতা নয়। জ্ঞান আসলে প্রশ্ন, অভিজ্ঞতা, ভাষা এবং সন্দেহের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। যে শিক্ষা শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে শেখায় না, সে তাকে নীরব নাগরিকে পরিণত করে।

এই ব্যবস্থাগত সমস্যার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে আরও একটি প্রবণতা যুক্ত হয়েছে— শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে দলীয় ক্ষমতার সম্প্রসারণ হিসেবে দেখার দীর্ঘ অভ্যাস। শাসক দল বদলেছে, ভাষা বদলেছে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্মান করার রাজনৈতিক সংস্কৃতি খুব বেশি তৈরি হয়নি। শিক্ষা কখনও পুরোপুরি অরাজনৈতিক নয়। কিন্তু রাজনৈতিকতা এবং দলীয় দখলদারি এক নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র শিক্ষার জবাবদিহি চাইতে পারে; দলীয় রাষ্ট্র চায় আনুগত্য।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ এই সঙ্কটের কিছু দিক চিহ্নিত করেছে— বহুবিষয়ক শিক্ষা, নমনীয় স্নাতক কাঠামো, বৃত্তিমূলক অভিজ্ঞতা, শিক্ষানবিশি, গবেষণামুখী শিক্ষা, সমালোচনামূলক চিন্তার উপর জোর। ধারণাগুলি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নীতির ভাষা এবং বাস্তব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার মধ্যে ফারাক বিশাল। পর্যাপ্ত শিক্ষক, গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, শিক্ষাগত স্বাধীনতা এবং স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সংযোগ ছাড়া বহুবিষয়কতা সহজেই কাগুজে শব্দে পরিণত হয়। শিক্ষানবিশিও তখন বাস্তব দক্ষতার বদলে আর এক ধরনের সনদ-সংগ্রহে নেমে আসে।

‘উৎকর্ষ’-এর ভাষা প্রায়ই বৈষম্যের বাস্তবতাকে আড়াল করে। কিছু প্রতিষ্ঠান ক্রমশ উজ্জ্বল হয়, আর অসংখ্য সরকারি কলেজ অন্ধকারে থেকে যায়। কলকাতার নামী প্রতিষ্ঠান এবং জেলার বহু সরকারি কলেজ যেন একই রাজ্যের মধ্যেও আলাদা বাস্তবের অংশ। এই বৈষম্য আকস্মিক নয়; এটি দীর্ঘ দিনের নীতিগত অবহেলা, সম্পদ-বণ্টনের অসাম্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতার ফল।

অতএব, শিক্ষাকে দলীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে এনে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ভিতরে ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, কলেজকে সমাজের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে ভাষা, যুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সচেতন দক্ষতা আজ অপরিহার্য। বিশেষ করে প্রথম প্রজন্মের স্নাতকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, ফেলোশিপ এবং শিক্ষানবিশি-ভাতা জরুরি। কারণ দরিদ্র ছাত্রের ব্যর্থতার মূল্য অনেক বেশি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Education system Indian Education System Artificial Intelligence Artificial Intelligence Impact

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy