E-Paper

দেশে সরকারি স্কুলশিক্ষার হাল

সংস্কার অর্থনীতি চালু হওয়ার পর থেকে ভারতে শিক্ষার বেসরকারিকরণের গতি দ্রুত হলেও এখনও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী স্কুল স্তরে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার উপরই নির্ভরশীল।

সুমন কল্যাণ মৌলিক

সুমন কল্যাণ মৌলিক

শেষ আপডেট: ২৫ মে ২০২৬ ০৫:২৩

এ যেন এক নেই-রাজ্যের খতিয়ান। সরকারি স্কুল শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক, ল্যাব, শৌচালয়, পানীয় জল, বিদ্যুৎ, এমনকি পড়ুয়ার সংখ্যা কম। এগুলো বিরোধী দলের অভিযোগ নয়, স্বয়ং সরকারই এমন কথা বলছে। সম্প্রতি ভারতের স্কুলশিক্ষার এই হতশ্রী চেহারা উঠে এসেছে নীতি আয়োগ কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে, যার শিরোনাম— ‘স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া— টেম্পোরাল অ্যানালিসিস অ্যান্ড পলিসি রোডম্যাপ ফর কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট’।

সংস্কার অর্থনীতি চালু হওয়ার পর থেকে ভারতে শিক্ষার বেসরকারিকরণের গতি দ্রুত হলেও এখনও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থী স্কুল স্তরে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার উপরই নির্ভরশীল। নীতি আয়োগের পরিসংখ্যান অনুসারে দেশে স্কুল স্তরে পড়ুয়ার সংখ্যা ২৪.৬৯ কোটি, স্কুলের সংখ্যা ১৪.৭১ লক্ষ। কিন্তু সমস্যা হল, প্রাথমিক স্তরে যেখানে ৭.৩ লক্ষ স্কুল রয়েছে, সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে স্কুলের সংখ্যা ১.৬৪ লক্ষ। দেশের ৫.৪% স্কুলে প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একটানা পড়ার সুযোগ রয়েছে।

কাছাকাছি স্কুল না-থাকাও ভারতের স্কুল শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ড্রপ-আউটের অন্যতম কারণ। আবার অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল শিক্ষা প্রায় সারা দেশেই অবৈতনিক, কিন্তু পরবর্তী সময়ে আর্থিক অসঙ্গতির কারণে শিক্ষার্থী আর শিক্ষাঙ্গনে থাকে না। বিষয়টি প্রতিবেদনে স্পষ্ট। দেশে প্রাথমিক স্তরে গ্রোস এনরোলমেন্টের (স্কুলে ভর্তি) পরিমাণ ৯০.৯%, কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে ৭৮.৭% এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ৫৮.৪%। এই ড্রপ-আউটের চেহারা কতটা উদ্বেগজনক, তা বোঝা যায় যখন দেখি প্রতি দশ জনের মধ্যে চার জনই উচ্চমাধ্যমিকের আগে পড়া ছেড়ে দেয়। আর এই ড্রপ-আউটের ক্ষেত্রে মাধ্যমিক স্তরে সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হল পশ্চিমবঙ্গ (২০%), অরুণাচল প্রদেশ (১৮.৩%), কর্নাটক (১৮.৩%) এবং অসম (১৭.৫%)।

সরকারি স্কুলে আজ সারা দেশ জুড়েই শিক্ষকের সঙ্কট। দেশে এক লক্ষ চার হাজার একশো পঁচিশটি স্কুল এক শিক্ষকচালিত, যার বেশিটাই গ্রামীণ ভারতে। মাধ্যমিক স্তরে প্রতি সাতচল্লিশ জন শিক্ষার্থী পিছু এক জন শিক্ষক, যা শ্রেণিকক্ষে পঠনপাঠনের প্রকৃত অবস্থাটা আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে। আর কম শিক্ষকের সমস্যায় সবচেয়ে জেরবার যে রাজ্য, তার নাম বিহার। এখানে দুই লক্ষ আট হাজার সাতশো চুরাশিটি শিক্ষকের পদ ফাঁকা পড়ে আছে। এ ছাড়া আছে ভূতুড়ে স্কুল, যেখানে স্কুলবাড়ি আছে, চেয়ার বেঞ্চ আছে, শিক্ষক আছে, কিন্তু শিক্ষার্থী নেই। এই মাপকাঠিতে প্রথম পশ্চিমবঙ্গ (৩৮১২) এবং দ্বিতীয় তেলঙ্গানা (২২৪৫)। এমনকি শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়ে ঘুরিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে নীতি আয়োগের প্রতিবেদনে। সরকারি স্কুলে পড়াশোনা নিয়মিত হয় না, এমন অভিযোগও মান্যতা পেয়েছে। পাঠ দিবসের ১৪% নষ্ট হয় সার্ভে, নির্বাচন, প্রশাসনিক কাজের মতো নন-অ্যাকাডেমিক কাজকর্মের জন্য।

এই প্রতিবেদন দেখায় যে, স্বাধীনতার এত বছর পরেও স্কুলগুলোর পরিকাঠামো এখনও কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছতে পারেনি। সারা দেশে ৯৮,৫৯২টি স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচালয়ের ব্যবস্থা নেই। ৬১,৫৪০টি স্কুলে শৌচালয় ব্যবহারযোগ্য নয়। যদিও আগের চেয়ে অবস্থা কিছুটা উন্নত হয়েছে, কিন্তু দেশের ১.১৯ লাখ স্কুলে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে অধিকাংশ স্কুলে আজও কোনও পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। স্কুলে মিড-ডে মিল নিয়ে অজস্র অভিযোগ, এমনকি ১৪,৫০৫টি স্কুলে পর্যাপ্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। পরিকাঠামো সংক্রান্ত আলোচনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় গত বছর রাজস্থানের ঝালওয়ার জেলার সেই মর্মান্তিক ঘটনার কথা, যাতে স্কুলের ছাদ ভেঙে পড়ে সাতটি শিশুর মৃত্যু হয়। আদালতের নির্দেশে সেই রাজ্যে স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে এক সমীক্ষায় উঠে আসে ৫৫০০টি স্কুল (মোট স্কুলের ৯ শতাংশ) শিশুদের জন্য বিপজ্জনক। ব্যবহারিক পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকলে শিক্ষা আকর্ষণীয় ও কার্যকর হতে পারে না, অথচ দেশের ৫১.৭% সরকারি স্কুলে সায়েন্স ল্যাবরেটরি নেই। ২০২৫-২৬ সালের ইকনমিক সার্ভে-তে বলা হয়েছিল, মাধ্যমিক স্তরে অর্থাৎ ১৪-১৮ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশে ২ কোটি পড়ুয়া স্কুল ছেড়েছে। এদের ভবিষ্যৎ কী কেউ জানে না, কাজের বাজারে এরা ব্রাত্য থাকবে, কারণ এক শতাংশের কম এই ধরনের পড়ুয়াদের কোনও দক্ষতা অর্জিত নেই।

নীতি আয়োগের প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, সে সম্পর্কিত তথ্য। শিক্ষার অধিকার আইন চালু হওয়ার পর থেকে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সরকারি স্কুলে পাশ-ফেল নেই। তাই শিক্ষার্থী কত দিন স্কুলে থাকল বা তার বার্ষিক মূল্যায়নপত্রের চেয়ে দরকারি হল তারা মাতৃভাষা, গণিতে কতটা দক্ষতা অর্জন করেছে। এ ক্ষেত্রে ছবিটা খুবই অনুজ্জ্বল। গ্রামীণ ভারতে ৪২% ষষ্ঠ শ্রেণির, ৩৬% সপ্তম শ্রেণির এবং অষ্টম শ্রেণির ২৯% শিক্ষার্থী দ্বিতীয় শ্রেণির জন্য নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তক পড়তে পারে না। অঙ্ক করার দক্ষতাও প্রশ্নের মুখে। ষষ্ঠ শ্রেণির ৬৪%, সপ্তম শ্রেণির ৫৯% এবং অষ্টম শ্রেণির ৫৪% শিক্ষার্থী ভাগ করতে পারে না। এই পড়া বা গণিতের দক্ষতা অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, তেলঙ্গানা, ছত্তীসগঢ়, মেঘালয়, বিহার, অসম, উত্তরপ্রদেশ ও কর্নাটকে নিম্নগামী। একমাত্র চমক পঞ্জাব, যে বিভিন্ন সূচকে কেরলকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে।

বছরের শুরুর দিকে রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছিল, গত পাঁচ বছরে দেশে ১৮,৭২৭টি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, এবং গত এক বছরে নতুন বেসরকারি স্কুল তৈরি হয়েছে ৮,৪৭৫টি। সরকারি স্কুল ডুবছে আর বেসরকারি স্কুল সাম্রাজ্য বিস্তার করছে, নীতি আয়োগের প্রতিবেদন দেখাল। ভারতের মতো দেশে যেখানে সরকারি সাহায্য ছাড়া মানুষের জীবনধারণ অসম্ভব, সেখানে সরকারি স্কুলশিক্ষার এই অধোগমন গভীর দুঃসংবাদ।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Schools Education system

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy